এই সময়: ‘সন্ধ্যা হবামাত্রই সহরে আর এক প্রকার আমোদ আরম্ভ হলো। ... স্থানে স্থানে তেলে ভাজা ফুলুরি, বেগুনি ও জিলিপির দোকানদারেরা খরিদদারের অপেক্ষায় বসিয়া রহিয়াছে। ঝি ও বামুনরা জলখাবারের থালা ও ভাঁড় হাতে করে দোকানের সামনে ভিড় করছে...’।
এও এক কলকাতার গল্প। সে ১৮৬২’র কলকাতা। সেই কলকাতার রোজনামচাকে দুই মলাটে বন্দি করেছিলেন কালীপ্রসন্ন সিংহ। জন্ম নিয়েছিল — হুতোম প্যাঁচার নকশা। পরের ১৬৪ বছরে কলকাতার কলেবরে বদল এসেছে ঢের। কিন্তু যা বদলায়নি তা হলো কলকাতার স্ট্রিট ফুড। কালীপ্রসন্নর দেখা রাস্তায় বরফ-মালাই ফিরি করে বেড়ানোর কলকাতা থেকে হালফিলের পকেট পরোটা। ফুড হিস্টোরিয়ানরা বলেন, সেই কলকাতায় ফুটপাথের খাবারে ভেজাল ছিল না। আর ছিল না তেমন পরিচ্ছন্নতার অভাব। হালফিলের কলকাতায় বহু মানুষ এই স্ট্রিট ফুডের উপরেই নির্ভরশীল। এ কথা কেউ অস্বীকার করেন না যে, স্ট্রিট ফুডের স্টলগুলির অধিকাংশের সঙ্গে হাইজিন-এর বিশেষ সম্পর্ক নেই। সেই জন্যই এ বার কলকাতার স্ট্রিট ফুড বিক্রেতাদের জন্য এবার হাইজিন-এর কর্মশালার আয়োজন করছে ভারত চেম্বার্স অফ কমার্স। তাঁদের সহযোগী পার্টনার একটি ভোজ্য তেল সংস্থা।
মঙ্গলবার কলকাতা প্রেস ক্লাবে সেই কর্মসূচির সূচনা হলো। অনুষ্ঠানে আয়োজকদের তরফ থেকে সম্মান জানানো হয় কয়েক জনকে। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ডেকার্স লেনের চিত্তবাবুর দোকানের কর্ণধার, বিখ্যাত চিনে সস এবং মসলা সংস্থার কর্ণধার ডমিনিক পৌ চং, ৫০ বছর ধরে শহরের ফুচকা বিক্রি করা রাজেন্দ্রপ্রসাদ চৌহান। রাজেন্দ্রপ্রসাদের মুগডালের ভিক্টোরিয়া বড়া খেয়েছেন ইংল্যান্ডের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন। এ দিনের অনুষ্ঠানে ছিলেন ফুড হিস্টোরিয়ান হরিপদ ভৌমিক, তিনটি রেস্তোরাঁ চেনের অন্যতম কর্ণধার শিলাদিত্য চৌধুরী, আয়োজক ভোজ্য তেল সংস্থার চিফ বিজনেস অফিসার ধিমল ব্রক্ষ্মভাট, এবং ওই সংস্থারই মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজি হেড শিবম আগরওয়াল।
শিলাদিত্যর কথায়, ‘সবাই কলকাতাকে দেশের সাংস্কৃতিক রাজধানী বলেই জানেন। কিন্তু কলকাতা স্ট্রিট ফুডেরও রাজধানী। কারণ, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ে চিনারা প্রথম কলকাতাতেই আশ্রয় নেয়। দেশের মধ্যে প্রথম চিনে খাবারের শুরু এই কলকাতাতেই। আবার ইংরেজরা লখনউ-এর নবাব ওয়াজেদ আলি শাহ-কে তাঁর নিজের রাজ্য থেকে বিতারণ করলে তিনি কলকাতাতেই বসত গড়েন। তার পর থেকে মোগলাই খানার শুরু এই শহরে। আর ব্রিটিশ তথা কন্টিনেন্টাল খাবারের তো কথাই নেই।’ এর সঙ্গেই তিনি যোগ করেন, ‘টেরিটি বাজারে চিনে ব্রেকফাস্ট করেননি এমন মানুষ কলকাতাতে খুব কম। কিন্তু এ কথা বলতে দ্বিধা নেই যে, সেখানে হাইজিন একেবারেই মানা হয় না। ফলে এই কর্মশালা টেরিটি বাজার এবং ডেকার্স লেনের বিক্রেতাদের দিয়েই শুরু করা হোক। কারণ এই দু’টি এলাকা হলো কলকাতার স্ট্রিট ফুডের হাব।’
ভারত চেম্বার্স অফ কমার্স-এর অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি রুদ্রানী মিত্র বলেন, ‘আগামী ছ’মাস ধরে চলবে এই কর্মশালা। বিভিন্ন এলাকার স্ট্রিট ফুড বিক্রেতাদের একটি হাতেকলমে পরিচ্ছন্নতার প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। বিখ্যাত রেস্তোরাঁর কর্মীরা তাঁদের প্রশিক্ষণ দেবেন। কীভাবে রেস্তোরাঁগুলিতে পরিচ্ছন্নতা মেনে চলা হয়, তাই দেখানো হবে। প্রশিক্ষণ শেষে তাঁরা একটি সার্টিফিকেট পাবেন। তা তাঁরা দোকানে টাঙাতে পারবেন। উপকৃত হবেন ক্রেতারা।’ শিবম ও ধীমল জানান, এই কর্মসূচির স্লোগান— ‘পরিষ্কার হাত, পরিষ্কার পাত।’