প্রশান্ত পাল, বান্দোয়ান
মোটরবাইকের সামনে লাগানো লালঝান্ডা। গলায় কাস্তে-হাতুড়ি-তারা ছাপ মারা লাল উত্তরীয়। পরনে আটপৌরে পাঞ্জাবি-পাজামা। পায়ে ধুলোমাখা চামড়ার চটি। বয়স ষাট ছুঁয়েছে। তিনি জঙ্গলমহলের বান্দোয়ান আসনের সিপিএম প্রার্থী রথু সিং। নিজের মোটরবাইকে সওয়ার হয়েই প্রচারে চষে ফেলছেন এ গাঁ থেকে সে গাঁ।
বান্দোয়ানেরই সারগা গ্রামের বাসিন্দা রথু সিপিএমের সর্বক্ষণের কর্মী ও পুরুলিয়া জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য। সারা ভারত খেতমজুর সংগঠনের রাজ্য কাউন্সিলেরও সদস্য তিনি। পার্টির সর্বক্ষণের কর্মী বলে মাসে সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা ভাতা পান। রথুর কথায়, 'আমি তেমন লেখাপড়া শিখতে পারিনি। ছেলে স্নাতক হলেও কাজ জোটেনি। অন্যের জমি লিজ নিয়ে আনাজ চাষ করে। বৌমা ছেলেকে সঙ্গ দেয়। সেই আয়ে সংসার চলে।'
রথুর কথায়, 'আমার ছোটবেলায় বাবা মাটি কেটে মজুরি হিসেবে পেত দুই পাই ধান। সপ্তাহে একদিন বা দু'দিন ভাত জুটত। মাইলো, কোদো সেদ্ধ খেয়েই দিন কাটত।' সিপিএমে কী ভাবে? বললেন, 'বর্গা ও মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলনে যোগ দিয়ে আমার পার্টিতে আসা। সেই আন্দোলন করতে গিয়ে পুলিশের খাতায় নাম উঠে যায়। তবে জেলে যেতে হয়নি।' ১৯৯৩-এ বান্দোয়ানের কুমড়া পঞ্চায়েতে প্রার্থী হওয়ার মধ্য দিয়ে নির্বাচনী ময়দানে হাতেখড়ি রথুর। সামলেছেন পঞ্চায়েতের উপপ্রধান, পঞ্চায়েত সমিতির কর্মাধ্যক্ষের দায়িত্ব। বিধানসভার লড়াইয়ে এই প্রথম।
জঙ্গলমহলে মাওবাদী তৎপরতার দিনগুলিতে রথু কাটিয়েছেন ঝোড়ো সময়, ২০০৩-এর অক্টোবরে যার সূত্রপাত। রথু বললেন, 'তখন আমি সবে উপপ্রধান হয়েছি। সে সময়ে রক্তস্নাত বান্দোয়ান দেখেছি।' কেমন ছিল সেই দিনগুলো? প্রশ্ন শুনে একটু যেন আনমনা হয়ে পড়লেন রথু।
তার পরে বললেন, 'জেলা পরিষদের প্রাক্তন সভাধিপতি রবীন্দ্রনাথ কর, তাঁর স্ত্রী আনন্দময়ী কর থেকে গণপতি ভদ্র, মহেন্দ্র মাহাতো-সহ আমাদের ১২ জন নেতা-কর্মী মাওবাদীদের হাতে একের পর এক খুন হয়েছেন।' ভয় পেয়েছিলেন? শুনেই দৃপ্ত হয়ে উঠল চোখ। বললেন, 'মাওবাদীদের বিরুদ্ধে পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তুলি। রাতে তির-ধনুক, টাঙ্গি-বল্লম নিয়ে গ্রাম পাহারা দিতাম। পাল্টা আঘাত আসতেই পিছু হটল মাওবাদীরা।' রথু জানালেন, একদিন বাড়ি ফেরার পথে তাঁকে লক্ষ্য করেও গুলি ছুঁড়েছিল মাওবাদীরা। তবে সেই গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়।
দল তাঁকে প্রার্থী করার পর থেকে রোজ ৫০-৬০ কিলোমিটার নিজের মোটরবাইকে ঘুরছেন। তেলের টাকা পার্টি দিচ্ছে। সাড়া পাচ্ছেন কেমন? রথু বললেন, 'নতুন করে আমার পরিচিতির দরকার পড়ে না। তবে দল প্রার্থী করায় গাঁয়ে গাঁয়ে মানুষের কাছে তো পৌঁছতে হচ্ছে। সকালে এককাপ লিকার চা খেয়ে বেরোই। কোনও দিন দলীয় কর্মীর বাড়িতে, কোনও দিন পার্টি অফিসেই দুটো সেদ্ধ ভাত জুটে যায়।' কী বলছেন প্রচারে? রথু বললেন, 'যা দেখছি, সেটাই বলছি। সরকারি স্কুল ধুঁকছে, স্বাস্থ্যের পরিকাঠামো বেহাল, কাজও নেই। যুবকরা দলে দলে ভিনরাজ্যে ছুটছে। তৃণমূল-বিজেপি কেউই তো কিছু করেনি। সে কথাই বলছি মানুষের কাছে।'