সুমন ঘোষ, খড়্গপুর
নারায়ণগড়ের রাজনীতির আকাশ কি 'অংশত মেঘলা'? কারণ, সূর্য যে (পড়ুন সূর্যকান্ত অট্ট) এ বার 'বিশ্রামে'! আর সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে পদ্ম ফোটাতে মরিয়া হয়ে উঠেছে কমল-শিবির। অট্টহাসি হেসেও বিজেপি প্রার্থীর আক্ষেপ, '২০২১-এ সূর্যকে তো প্রায় অস্তাচলে পাঠিয়েই দিয়েছিলাম। একটুর জন্য হয়নি। কিন্তু এ বার আর ওই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে না।' অন্যদিকে, তৃণমূলও প্রতিভার বিকাশ ঘটিয়ে জয় ধরে রাখতে কোনও খামতি রাখছে না। উল্টে তাদের লক্ষ্য, মার্জিন বাড়ানো। সব মিলিয়ে নারায়ণগড় এখন 'বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সূচ্যগ্র মেদিনী' মেজাজে। তবে, সূর্যকান্ত অট্টর 'বিশ্রাম'-এ থাকার বিষয়টি নিয়ে অস্বস্তি বাড়ছে তৃণমূলে। কারণ, প্রতিভার প্রচারে দেখা নেই সূর্যের। ফলে সূর্যের অনুগামীরা কতটা সাহায্যের হাত বাড়াবেন, প্রতিভা এই অল্প জয়ের ব্যবধানকে কী ভাবে বড় মার্জিনে নিয়ে যাবে, তা নিয়ে সংশয়ে দলের অনেকেই।
যদিও আত্মবিশ্বাসী প্রতিভা বলছেন, 'আমি সব নেতাদের সঙ্গেই বসেছি। বিক্ষুব্ধদের ক্ষোভ বুঝে দলের স্বার্থে সাহায্য চেয়েছি। সবাই আমার সঙ্গে প্রচারে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন।' সোমবার প্রতিভা সটান হাজির হয়েছিলেন সূর্যকান্তের বাড়িতে। সেখান থেকে বেরিয়ে প্রতিভা বলেন, 'আমি ওঁকে বলেছি, আপনি দীর্ঘদিনের রাজনীতিবিদ। এখনও আপনিই দলের কান্ডারি। সেই জায়গায় আমাকে প্রার্থী করা হয়েছে। আমি চাইব, আপনি আমার পাশে থেকে দলের হাত শক্ত করুন। উনি সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন।' যদিও অভিমানী সূর্য বলছেন, 'শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত প্রার্থী-বদলের কোনও ইঙ্গিত দেয়নি দল। জয়ের জন্য ৮০ শতাংশ কাজ এগিয়েই রেখেছিলাম। কিন্তু শেষে আমায় টিকিটই দিল না। তা-ও প্রতিভাকে বলেছি, আপনারাই দলের কাছে অভিযোগ জানিয়েছিলেন যে, আমার ভাবমূর্তি খারাপ। আমি ভোটে দাঁড়ালে হারতে পারি। যাঁর ভাবমূর্তি খারাপ তাঁকে নিয়ে ঘুরলে কি আদৌ কি আপনার লাভ হবে? উল্টে ক্ষতি হতে পারে। তবে আপনি চাইলে আমি পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করব।' পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার নারায়ণগড় বিধানসভা দুই সূর্যের উদয় দেখেছে। এক জন সিপিএমের সূর্যকান্ত মিশ্র।
তিনি নারায়ণগড় থেকে টানা পাঁচ বারের বিধায়ক ছিলেন। সে সূর্যকে অস্তাচলে পাঠাতেও কম কসুর করতে হয়নি তৃণমূলকে। ২০১১-য় তৃণমূল ক্ষমতায় এলেও সূর্যকান্ত সে বার জয়ী হন। নারায়ণগড় বিধানসভা ধরে রাখতে প্রথা ভেঙে ২০১৬-য় দল আবারও তাঁকে প্রার্থী করেছিল। অথচ, তখন তিনি সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক। তৃণমূলও মধ্যগগনে। সূর্যকান্তকে হারতে হয়েছিল তৃণমূল প্রার্থী প্রদ্যোৎ ঘোষের কাছে। সেই প্রথম নারায়ণগড় ভোটের ময়দানে সূর্যাস্ত দেখেছিল। নারায়ণগড়ের মাটিতে পদ্মের চাষ শুরু হলো ২০১৬-র পরে। বিজেপির বাড়বাড়ন্ত রুখতে ২০২১-এ প্রদ্যোৎকে সরিয়ে ভূমিপুত্র সূর্যকান্ত অট্টকে প্রার্থী করে তৃণমূল। মাত্র ২৪২১ ভোটে বিজেপির রমাপ্রসাদ গিরিকে হারিয়ে জয়ী হন সূর্যকান্ত অট্ট। এ বার তৃণমূল প্রার্থী করেছে পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা পরিষদের সভাধিপতি প্রতিভারানি মাইতিকে। যে প্রতিভার সঙ্গে সূর্যকান্তের দূরত্ব সহস্র যোজন। আর সেই দূরত্বকেই কাজে লাগাতে মরিয়া বিজেপি। তৃণমূলের মতো বিজেপির গোষ্ঠীকোন্দলও এখন প্রকাশ্যে। যে বিজেপি ২০১১-য় নারায়ণগড়ে মাত্র ৫৩৪৫ ভোট পেয়েছিল, ২০১৬-য় তা বেড়ে দাঁড়ায় ১০ হাজার ২৬২।
সব সময়ে তৃতীয় স্থানে থাকা বিজেপি হঠাৎ ২০২১-এ বিধানসভা নির্বাচনে ভোট পায় ৯৮ হাজার ৪৭৩। তৃণমূলের ঝুলিতে গিয়েছিল ১ লক্ষ ৮৯৪ ভোট। আর সিপিএম ১৩ হাজার ২২৯ ভোট পেয়ে চলে যায় তিন নম্বরে। সেই কারণে বিজেপি এ বারও প্রার্থী বদল করেনি। গত বারের প্রার্থী রমাপ্রসাদ গিরি এ বারও নির্বাচনের ময়দানে। কিন্তু রমাপ্রসাদকে প্রার্থী হিসেবে মানতে রাজি নন দলের অনেকে। প্রকাশ্যে বিক্ষোভ হয়েছে, পার্টি অফিস ভাঙচুর হয়েছে। যদিও রমাপ্রসাদ বলছেন, 'প্রচারে দারুণ সাড়া পাচ্ছি। এ বার জয় নিশ্চিত।' কিন্তু গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব? তাঁর জবাব, 'দু'-এক জায়গায় সামান্য ক্ষোভরয়েছে। আলোচনায় বসে তা মিটিয়ে নেব। কিন্তু তৃণমূলে অট্ট-প্রতিভা দ্বন্দ্ব আমাদের আরও সুবিধা করে দেবে।'