সুখেন্দু পাল, বর্ধমান: দিদি দেখছেন তো হেঁশেলের কী অবস্থা? ছেলেমেয়েদের একটু ভাল খাওয়াবেন, তার জো নেই। গ্যাস সিলিন্ডার কিনতেই অর্ধেক টাকা বেরিয়ে যাচ্ছে। এর প্রতিবাদ হওয়া দরকার তো বলুন? রান্নাঘরে ঢুকে এক মহিলাকে কথাগুলি বলছিলেন গলসির সিপিএম প্রার্থী মণিমালা দাস। গৃহিণী সম্মতি জানিয়ে বললেন, আপনারা প্রতিবাদ করুন। এতেই সাফল্য দেখছে সিপিএম। একসময় সিপিএমের প্রয়াত নেতা জ্যোতি বসু নিবিড় জনসম্পর্ক করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। মানুষের আরও কাছে যাওয়ার কথা বলেছিলেন। কিন্তু তা হয়নি। নিজেদের ত্রুটির কারণেই একসময় জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল লালপার্টি। প্রয়াত প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে তা নিয়ে আক্ষেপ করতেও শোনা যায়। নেতাদের তারপরও মানুষের দরজায় পৌঁছতে দেখা যায়নি। সেটাই নবীনরা করে দেখাচ্ছে। সিপিএমের মহিলা প্রার্থীরা মূল্যবৃদ্ধির পরিণাম বোঝাতে মানুষের হেঁশেলে পৌঁছে যাচ্ছেন। আর যুব নেতারা মানুষের কাছে গিয়ে ফাঁস করছে বিজেপির জুমলা। তাতেই ‘হাইজ্যাক’ হয়ে যাওয়া ভোট আবার ঘরে ফেরার আশা করছেন বামেরা। জেলার খণ্ডঘোষ, আউশগ্রাম, রায়না, ভাতার, কেতুগ্রাম, জামালপুর মন্তেশ্বর, ভাতার বিধানসভা কেন্দ্রে তাদের এই কৌশল দারুণভাবে কাজে লাগছে। রায়নায় সভা করতে এসে সিপিএমের তরুণ নেতা শতরূপ ঘোষ বলছিলেন, আমরা চাই ছেলেমেয়েদের কর্মসংস্থান। মানুষে মানুষে বিভেদ তৈরি করে লাভ নেই। উন্নতির স্বার্থে বামপন্থী প্রার্থীদের জেতাতে হবে।
সিপিএমের দাবি, মানুষ এবার ভুল বুঝতে পেরেছে। সেই কারণে তাঁরা বামপন্থীদের কথা শুনছেন। দলের প্রার্থীরা পৌঁছে বাস্তব অভিজ্ঞতা তুলে ধরছেন। গলসির সিপিএম প্রার্থী মণিমালা দাস বলেন, বাড়ি বাড়ি পৌঁছে যাচ্ছি। এখন মহিলাদের হেঁশেল সামলাতেই নাভিঃশ্বাস উঠেছে। গ্যাস সিলিন্ডারের দাম ঊর্ধ্বমুখী। ভোজ্য তেলের দামও বেড়ে গিয়েছে। আসলে সাধারণ মানুষের কথা বিজেপি বা তৃণমূল ভাবে না। একমাত্র বামপন্থীরাই মানুষের দাবি নিয়ে আন্দোলন করে।
আউশগ্রামের সিপিএম প্রার্থী চঞ্চল মাঝি বলেন, বিজেপি মানুষকে অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তারা কোনোটাই রাখতে পারেনি। সেসব কথাই আমরা যুবকদের কাছে গিয়ে তুলে ধরছি। তার সুফলও পাওয়া যাচ্ছে। মিটিং মিছিলে তরুণ-তরুণীদের ভিড় বেড়েছে। কেন্দ্রীয় সরকার ১০০ দিনের কাজ বন্ধ রেখে মানুষকে সমস্যা ফেলেছে। ওই সমস্ত মানুষের পাশেও আমরা দাঁড়িয়েছি। সিপিএম কর্মীদের অনেকেই বলছেন, দলের নেতারা প্রথম থেকে যদি এই মনোভাব দেখাতেন, তাহলে এরাজ্যে বিজেপির এত বাড়বাড়ন্ত হতো না। প্রতিটি বিধানসভা কেন্দ্রেই বামেদের ভোট পেয়েই বিজেপি ফুলে ফেঁপে উঠেছে। একসময় সিপিএম নেতারা ভেবেই নিয়েছিলেন, তাঁদের মানুষের প্রয়োজন নেই। মানুষেরই প্রয়োজন সিপিএমকে। এই ভ্রান্ত ধারণার জন্যই বামেরা জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
তৃণমূল নেতা দেবু টুডু বলেন, সিপিএমের নেতা কর্মীরাই এখন বিজেপি করে। ওদের দুই দলের মধ্যে সমঝোতা রয়েছে। এখন আর মানুষের বাড়িতে গিয়ে কোনো লাভ হবে না। সিপিএম নেতাদের ঔদ্ধত্য, অহংকার মানুষ দেখেছে। তাদের অত্যাচারের কথা মানুষ এত সহজে ভুলে যাবে না। বাংলার সাধারণ মানুষ জানে তৃণমূল ছাড়া তাদের পাশে কেউ নেই। বিজেপি নেতা মৃত্যুঞ্জয় চন্দ্র বলেন, অনেক সিপিএমের নেতাকর্মী তৃণমূলে গিয়েছে। মানুষ সিপিএম এবং তৃণমূল দুই দলেরই স্বরূপ দেখেছে। তাই তারা এখন বিজেপিকেই ভরসা করছে। তবে, রাজনৈতিক মহল মনে করছে, বামেদের চেষ্টা সফল হলে পূর্ব বর্ধমানের অনেক বিধানসভা কেন্দ্রে বিজেপির তৃতীয় শক্তিতে পরিণত হবে। বর্ধমান উত্তরের সিপিএম প্রার্থী মামণি মণ্ডল রায়।-নিজস্ব চিত্র