সমস্ত নথিপত্র জমা দেওয়া সত্ত্বেও বিচারাধীন বহু ভোটারের নাম বাদ
বর্তমান | ২৫ মার্চ ২০২৬
পিনাকী ধোলে, সিউড়ি: বাবা-মায়ের মুখের দিকে তাকাতে পারছেন না দুবরাজপুর ব্লকের হেতমপুর পঞ্চায়েতের কেন্দুলা গ্রামের বাসিন্দা শেখ সিরাজুল। বিজেপির দুর্গ বলে পরিচিত নলহাটি বিধানসভার রুদ্রনগর গ্রাম। সেখানে পবিত্র রাজবংশী সহ বহু ভোটার সাপ্লিমেন্টারি তালিকায় ঠাঁই পাননি। সেখানকার বিজেপি নেতার হুঙ্কার—‘আমি এর শেষ দেখে ছাড়ব।’
সিরাজুলের বাবা শেখ নুরুল ইসলাম পঁচাত্তর বছরের বৃদ্ধ। ছেষট্টি বছরের মা অনিশা বিবি। যাঁদের হাত ধরে এই বাংলার মাটিতে হাঁটতে শিখেছিলেন সিরাজুল। এসআইআরের সৌজন্যে এই বৃদ্ধ দম্পতি আজ যেন নিজভূমে পরবাসী। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে ভোট দিয়ে আসছেন তাঁরা। তা সত্ত্বেও ভোটার তালিকায় ‘সন্দেহভাজন’ তকমা দিয়ে শুনানিতে ডেকেছিল কমিশন। সিরাজুল হন্যে হয়ে নথিপত্র জোগাড় করেছিলেন। জমাও দিয়েছিলেন। কিন্তু মঙ্গলবার কমিশনের তরফে প্রকাশিত সাপ্লিমেন্টারি তালিকা দেখার পর সিরাজুলের মাথায় হাত! তালিকায় বাবার নাম ফিরলেও বৃদ্ধা মায়ের নাম নেই। অতঃপর, শেষ ভরসা ট্রাইবুনাল। সিরাজুল এদিন আক্ষেপের সুরে বলছিলেন, ‘মা কি তবে এই দেশের কেউ নয়? ট্রাইব্যনালে যাব টাকা কোথায়?’ সিরাজুল একটা উদাহরণ। তাঁর মতো অনেকেরই হাহাকার অবস্থা গোটা বীরভূম জেলায়। রাতারাতি পরিচয়হীন হওয়ার আতঙ্ক চতুর্দিকে। কেন্দুলা গ্রামেই অন্তত ৯ জনের নাম এভাবে মুছে ফেলা হয়েছে। বাদের তালিকায় রয়েছেন টোটো চালক শেখ হায়দার থেকে শুরু করে হানুফা বিবি। হানুফাদের বুকফাটা আর্তনাদ— ‘নাম নাম বাদ গেল, এরপর কি করব ভেবে পাচ্ছি না। ট্রাইবুনালটাই বা কি জিনিস, তাও বুঝতে পারছি না। আদৌ এ দেশে থাকতে পারব তো?’ নলহাটি বিধানসভার রুদ্রনগর গ্রাম। সেখানেও ১২ নম্বর সংসদের ৩৮ জনের নাম ছিল বিচারাধীন তালিকায় ছিল। ১৯৯৫ সালে ইস্যু হওয়া ভোটার কার্ড, পর্যাপ্ত নথি, এমনকি ১৯৫৬ সালের বৈধ দলিল বগলদাবা করে নিয়ে গিয়েও কমিশনের কর্তাদের মন গলাতে পারেননি পবিত্র রাজবংশী, সিধু কোনাইরা। ওই সংসদের বিচারাধীন ৩৮ জনের মধ্যে মাত্র ২ জনের নাম চূড়ান্ত তালিকায় ফিরেছে। বাকি ৩৬ জনের নাম বাদ। ওই সংসদের নির্বাচিত সদস্য তথা নলহাটি-১ মণ্ডলের বিজেপির সাধারণ সম্পাদক মানস চক্রবর্তীর অভিযোগ, ‘পবিত্রবাবুর মতো অনেকের কাছেই ১৯৫৬ সালের দলিল থেকে পর্যাপ্ত নথি রয়েছে। সেসব জমা দেওয়ার পরেও কেন নাম বাদ গেল? বিজেপি করার অপরাধেই সমর্থকদের নাম কাটা হয়েছে। আমরা এর শেষ দেখে ছাড়ব।’ পাল্টা তৃণমূলের জেলা সহ-সভাপতি মলয় মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘কমিশনের বিনা অঙ্গুলিহেলনে গাছে পাতাও নড়ে না। ওঁরা কমিশনের কাছে জানতে চান। রাজ্য সরকারের উপর দায় ঠেলে লাভ নেই।’ প্রশাসন সূত্রের খবর, নাম বাদ যাওয়া এই অসহায় মানুষদের আগামী ১৫ দিনের মধ্যে ট্রাইবুনালে আবেদন করতে বলা হয়েছে। কিন্তু সেই ট্রাইবুনাল কোথায়, কিভাবে হবে, তা নিয়ে কোনো দিশা নেই কারও কাছে। এমনকি জেলা প্রশাসনের এক পদস্থ স্বীকার করে নিয়েছেন, এব্যাপারে এখনও কোনো নির্দেশিকা আসেনি আমাদের কাছে। বীরভূমের কয়েক হাজার মানুষের ভোট-ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা মুখে।