চুঁচুড়ায় কমিশনের বিশেষ কর্মসূচি, কিন্তু ধন্দে মানুষ
আজকাল | ২৬ মার্চ ২০২৬
মিল্টন সেন, হুগলি: একদিকে নির্বাচন কমিশন ভোটারদের ভোটপর্বে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে। ঢাকঢোল পিটিয়ে প্রচার করছে ‘কোনও ভোটার যেন বাদ না পড়ে’। অপরদিকে, প্রকাশিত তালিকায় থেকে বাদ পড়ছে একাধিক বৈধ ভোটারের নাম। আজব দ্বিচারিতা। সাধারণ মানুষের অনিশ্চয়তা অব্যাহত। এসআইআরের হয়রানি পিছু ছাড়ছে না।
খসরা ভোটার তালিকা প্রকাশের পর প্রথম দফার অতিরিক্ত তালিকা প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে ভোটার তালিকায় বহু মানুষের নামে এখনও অ্যাজুডিকেশনের স্ট্যাম্প আজও রয়ে গিয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, একাধিক মানুষের নাম অ্যাজুডিকেশনে ছিল। বর্তমানে সেই নাম তালিকা থেকে সম্পূর্ণই বাদ দিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাঁদের বলা হয়েছে, আপত্তি থাকলে ট্রাইব্যুনালে যেতে। কোথায় ট্রাইব্যুনাল? কোথায় যাবেন? আদৌ ভোট দিতে পারবেন তো? নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠবে না তো? ইত্যাদি নানান প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে সাধারণ মানুষের মনে।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই নির্বাচন কমিশনের তরফে অনুষ্ঠিত হল ‘সিস্টেমেটিক ভোটার্স এডুকেশন অ্যান্ড ইলেক্টোরাল পার্টিসিপেশন’। কমিশনের তরফে জানানো হয়েছে, এটি জাতীয় নির্বাচন কমিশনের একটি ফ্ল্যাগশিপ প্রোগ্রাম। এর মূল উদ্দেশ্য হল ভারতের সকল যোগ্য নাগরিককে ভোটদানে উৎসাহিত করা। বুধবার এই লক্ষ্যে জেলাশাসকের দপ্তর থেকে ট্যাবলো সহযোগে একটি শোভাযাত্রা চুঁচুড়া শহর প্রদক্ষিণ করে। ভোটদানে উৎসাহ প্রদান করবে এমন শ্লোগান লেখা প্ল্যাকার্ড হাতে স্কুলের ছাত্র ছাত্রীরা এই শোভাযাত্রায় অংশ নেয়। শোভাযাত্রা শেষ হয় জেলাশাসকের দপ্তরে। সেখানে ভোটারদের নিবন্ধন থেকে শুরু করে ভোট দেওয়ার প্রক্রিয়া এবং ইভিএম ও ভিভিপ্যাট সম্পর্কে জানানো হয়।
কমিশনের মূল লক্ষ্য তরুণ প্রজন্ম, নারী, প্রতিবন্ধী এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভোটাধিকার প্রয়োগের গুরুত্ব ছড়িয়ে দেওয়া। নাগরিকদের এটি বোঝানো প্রতিটি ভোটই মূল্যবান। স্বচ্ছ ও অবাধ নির্বাচনী পরিবেশ তৈরি করা। এক কথায় বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে নির্বাচন কমিশনের লক্ষ্য ‘কোনও ভোটার যেন বাদ না পড়ে’। যে কথা রাজ্যের মুখ্য মন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি বার বার বলে চলেছেন। এখন জাতীয় নির্বাচন কমিশনের তরফেও সেই একই তথ্য প্রচার করা হচ্ছে। রাজ্যের শাসকদলের অভিযোগ নির্বাচন কমিশনের কথায় কাজে বিস্তর ফারাক। প্রচারে বলা হচ্ছে প্রত্যেক মানুষকে সঙ্গে নিয়ে নির্বাচন সংগঠিত করার কথা।
কার্যত দেখা যাচ্ছে তার উল্টোটাই। বৈধ ভোটারদের নাম তালিকা থেকে বাদ দিয়ে হয়রান করা হচ্ছে। ইদের পর সম্প্রতি কমিশনের সাইটে তালিকা প্রকাশিত হয়েছে। সেই তালিকার সুবাদে নতুন করে হয়রানি বেড়েছে বহু বৈধ ভোটারের। এমনই অভিযোগ চুঁচুড়ার ব্যবসায়ী শেখ নাসিরুদ্দিনের। তাঁর স্ত্রী শর্মিষ্ঠা ঘোষ চুঁচুড়া শহরের বাসিন্দা। তিনি ২০০২ সালে ভোট দিয়েছেন। বাবা মা দু’জনই জীবিত। তাঁদের নাম রয়েছে তালিকায়। চুঁচুড়া জেলা হাসপাতালে শর্মিষ্ঠার জন্ম। ২০০৭ সালে রেজিস্ট্রি করে নাসিরুদ্দিনের সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়। বিয়ের পরে তাঁর নাম পরিবর্তন হয়ে হয় শর্মিষ্ঠা বেগম ঘোষ। যথারীতি শুনানিতে ডাকা হয় শর্মিষ্ঠাকে। তিনি মাধ্যমিকের সার্টিফিকেট, জন্ম শংসাপত্র, ম্যারেজ সার্টিফিকেট, পাসপোর্ট-সহ যাবতীয় তথ্য শুনানিতে গিয়ে দেখান। তারপরেও খসরা তালিকায় তাঁর নাম অ্যাজুডিকেশন বা বিবেচনাধীন দেখায়। অপেক্ষা করতে বলা হয়।
অবশেষে সদ্য প্রকাশিত তালিকায় দেখা গিয়েছে তাঁর নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। আপত্তি থাকলে আগামী ১৫ দিনের মধ্যে তাঁকে ট্রাইব্যুনালে আবেদন জানানোর কথা বলা হয়েছে। নাসিরুদ্দিনের বক্তব্য, যাঁর জন্ম সার্টিফিকেট, ম্যারেজ সার্টিফিকেট থেকে শুরু করে শিক্ষাগত শংসাপত্র, পাসপোর্ট-সহ যাবতীয় তথ্য রয়েছে। সবই শুনানিতে গিয়ে দেখান হয়েছে। জেরক্স কপিও দেওয়া হয়েছে। তারপরেও নাম বাদ গেল।
একই অবস্থা নাসিরুদ্দিনের বৌদি সুরাইয়া বেগমের। নাম বাদ চলে গিয়েছে তাঁরই অফিসের কর্মী কুদ্দুস ইসলামের। এনারা সকলেই ২০০২ সালের আগে থেকে ভোট দিয়ে আসছেন। ২০০২ সালের তালিকায় সকলেরই নাম রয়েছে। তাও এই অবস্থা। চরম অনিশ্চয়তা। কী হচ্ছে তিনি কিছুই বুঝতে পারছেন না। দিশেহারা তিনি এখন ট্রাইব্যুনাল কোথায়, খুঁজে বেড়াচ্ছেন। তাঁর মতো জেলায় এখনও অনেকেই জানেন না এর পর তাঁদের কি করণীয়। আদৌ তাঁরা ভোট দিতে পারবেন কিনা।