মেয়ের জন্য ন্যায়বিচার চাইতে ভোট ময়দানে নির্যাতিতার বাবা-মা। পানিহাটি কেন্দ্র থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন আরজি করের নিহত তরুণী চিকিৎসকের মা। বুধবার সন্ধ্যায় বিজেপির তৃতীয় প্রার্থী তালিকায় তাঁর নাম ঘোষণা হতেই চাঞ্চল্য সর্বস্তরে। মুখ খুললেন নির্যাতিতার জন্য ন্যায় চেয়ে সোচ্চার হওয়া দুই আন্দোলনকারী চিকিৎসক। ডঃ অনিকেত মাহাত ‘মতের মিল না হওয়ার’ কথা স্পষ্ট জানিয়েও সোশ্যাল মিডিয়া বুলিং নিয়ে নির্যাতিতার বাবা-মায়ের পাশেই দাঁড়ালেন। কটাক্ষ করতে ছাড়লেন না বাম প্রার্থীদের আরজি কর নিয়ে প্রচারকেও। অন্যদিকে, আরজি কর আন্দোলনের অন্য মুখ, চিকিৎসক আসরাফুল্লা নাইয়ার মতে, ন্যায়বিচার কোনও একটি বিধানসভায় আটকে থাকতে পারে না।
নির্যাতিতার মায়ের ভোটে দাঁড়ানো প্রসঙ্গে আরজি কর আন্দোলনের অন্যতম মুখ চিকিৎসক অনিকেত মাহাত এইসময় লাইভকে বলেন,‘এটা তাঁদের একেবারেই ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। আমি মনে করি না যে অভয়া বা ন্যায়বিচারের দাবির সঙ্গে এই মতামতের কোনও সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। তাই আমি এই অবস্থানের সঙ্গে একমত নই।’
ক্ষমতায় এলে ন্যায়বিচার পাওয়ার যে সুবিধার কথা নির্যাতিতার মা ব্যাখ্যা করেছেন সেই মতামতেরও বিরোধিতা করে অনিকেত বলেন, ‘অনেকে বলছেন, ক্ষমতার মধ্যে না গেলে ন্যায়বিচার পাওয়া যায় না। কিন্তু যদি সেটাই সত্যি হয়, তাহলে বর্তমান রাজ্য সরকার এবং কেন্দ্র সরকার—যারা মানুষের ভোটে ক্ষমতায় এসেছে—তাঁদের পক্ষেই তো ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব ছিল। তাহলে নতুন করে ক্ষমতায় যাওয়ার প্রয়োজন কেন?’
এখানেই শেষ নয়, আরজি কর আন্দোলনের অন্যতম মুখ অনিকেতের কথায় মেলে বামেদের উদ্দেশেও কটাক্ষের সুর। তিনি বলেন, ‘সোশ্যাল মিডিয়ায় এই আন্দোলন নিয়ে অনেক ছোট ছোট ঘটনা, আংশিক তথ্য এবং ভুল ব্যাখ্যা ছড়িয়ে পড়ছে। কিন্তু প্রকৃত ঘটনা কী ছিল, তা আমরা জানি। আরজি কর মেডিক্যাল কলেজে জুনিয়র ডাক্তাররা, নার্সিং ও প্যারা মেডিক্যাল কর্মীরা যে প্রতিবাদ গড়ে তুলেছিলেন এবং প্রশাসনের ভূমিকা, তদন্ত প্রক্রিয়া, ময়নাতদন্ত—সব মিলিয়ে ঘটনাটি আজ স্পষ্টভাবে সামনে এসেছে। কারও গাড়ি আটকানোর জন্য এই আন্দোলনের গতিপথ নির্ধারিত হয়েছিল তা ঠিক নয়।’ এ ছাড়া, সোশ্যাল মিডিয়ায় নির্যাতিতার বাবা-মাকে বুলিং বন্ধ করতেও আর্জি জানিয়েছেন এই চিকিৎসক।
আন্দোলনের অন্য মুখ চিকিৎসক আসরাফুল্লা নাইয়াও নির্যাতিতার বাবা মায়ের বিজেপিতে যোগের সিদ্ধান্তে খুশি নন। এদিন এইসময় লাইভ-কে তিনি বলেন,‘আমাদের দেশের সংবিধান প্রত্যেক নাগরিককে এই স্বাধীনতা দেয় যে, তিনি যে কোনও রাজনৈতিক দলকে বেছে নিয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন। সেই দিক থেকে দেখলে, অভয়ার মায়ের এই সিদ্ধান্ত খুব অস্বাভাবিক বা চমকপ্রদ কিছু নয়। তিনি একজন সাধারণ নাগরিক, এবং তাঁর এই অধিকার রয়েছে।’ বিস্তারিত ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, ‘অভয়া আন্দোলন নিয়ে যদি প্রশ্ন ওঠে, আমি মনে করি না যে, এই আন্দোলন কোনও একটি জায়গা, কোনও একটি রাজনৈতিক দল, বা কারও নির্বাচনে জয়-পরাজয়ের উপর নির্ভর করে। এই আন্দোলনে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, রাজনৈতিকভাবে সচেতন মানুষ, এমনকি যারা রাজনীতি বোঝেন না—এমন সাধারণ মানুষও একসঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। সচেতন ও বিবেকবান মানুষের কাছে এই আন্দোলন কখনওই কোনও একটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না।’
আরজি করের নির্যাতিতার মায়ের বিজেপির প্রার্থী হওয়া প্রসঙ্গে এইসময় লাইভ-কে তৃণমূল কংগ্রেসের মুখপাত্র অরূপ চক্রবর্তী বলেন,‘বাংলার মানুষ বুঝে গিয়েছেন যে এই পুরো ঘটনাকে একটি রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। সরকারের বিরুদ্ধে প্রচার চালাতে এবং রাজনৈতিক ফায়দা তুলতে এই বিষয়টিকে কাজে লাগানো হয়েছে। অভয়ার মায়ের প্রসঙ্গে বলতে গেলে, তিনি যদি কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে দেখা করতে চান, তা হলে তাঁর সেই সুযোগ রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী Narendra Modi বা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী Amit Shah—যাঁদের সঙ্গেই তিনি কথা বলতে চান, সেটি তাঁর ব্যক্তিগত বিষয়। তবে আরজি কর-এর প্রেক্ষাপটেই বিজেপির প্রার্থী হিসেবে তাঁকে দেখা যাচ্ছে, তখন এটি স্পষ্ট যে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যই এখানে প্রধান ছিল।’
বাম নেতা এবং SFI-এর সাধারণ সম্পাদক সৃজন ভট্টাচার্য এই প্রসঙ্গে বিজেপির উদ্দেশেই তোপ দাগলেন। এইসময় লাইভে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, এ বার রাজনৈতিক ভাবেই লড়াই হবে। সৃজন বলেন,‘সন্তানহারা মায়ের কোনও অভিযোগ নিয়েই প্রশ্ন করার ধৃষ্টতা নেই। ওঁর প্রতি সম্পূর্ণ সমবেদনা আছে। কিন্তু যাঁরা ওঁকে বুঝিয়ে শুনিয়ে ভোটে দাঁড় করালেন তাঁদের কলতানরা প্রশ্ন করবে কেন এতদিন ধরে প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাহের সঙ্গে দেখা করিয়ে দিল না।’ একইসঙ্গে তাঁর কথায়, কেউ বিজেপির হয়ে ভোটে দাঁড়ালে সেই দলেরই তো দোষের ভাগীদার হতে হয়।