• প্রতি ৪৮ ঘণ্টায় এ দেশে পুলিশ হেফাজতে একটি মৃত্যু, নামমাত্র বিভাগীয় ব্যবস্থা
    এই সময় | ২৬ মার্চ ২০২৬
  • এই সময়: তিন বছর ধরে কমার লক্ষণ দেখিয়ে ফের বেড়ে গেল ভারতে পুলিশ হেফাজতে মৃত্যুর সংখ্যা। ২০২৫–এর ১ এপ্রিল থেকে এ বছর ১৫ মার্চ পর্যন্ত এক বছরেরও কম সময়ে ১৭০ জন মারা গিয়েছেন পুলিশ হেফাজতে। মানে প্রায় প্রতি দু’দিন বা ৪৮ ঘণ্টায় ভারতে পুলিশ হেফজাতে মারা যাচ্ছেন অন্তত এক জন। যে পরিসংখ্যান শিউরে ওঠার মতোই।

    এর আগে ২০২১–২২–এ পুলিশ হেফাজতে মৃতের সংখ্যা ছিল ১৭৬। তার পরে ২০২২–২৩, ২০২৩–২৪, ২০২৪–২৫–এ এই সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ১৬৩, ১৫৭ এবং ১৪০। সভ্য সমাজে যা অপরিসীম লজ্জার নজির বলেই গণ্য হয়—পুলিশ হেফাজতে মৃত্যুর সেই ঘটনা ফের বেড়ে যাওয়ায় দুনিয়ার সর্ববৃহৎ গণতন্ত্রে আইনরক্ষকদের আদৌ আইনের প্রতি সমীহ আছে কি না, সে প্রশ্ন বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে।

    হেফাজতকারীরই দায়িত্ব হেফাজতে থাকা ব্যক্তির সুরক্ষা নিশ্চিত করা। তার বদলে রক্ষকই যে ভক্ষক হয়ে দাঁড়াচ্ছে, পুলিশ হেফাজতে মৃত্যুর পরিসংখ্যা‍‍ন সে দিকেই ইঙ্গিত করছে। আইনের শাসনের ধারণাও প্রশ্নের মুখে পড়ছে। আরও আশ্চর্যের বিষয় হলো, গত পাঁচ বছরে পুলিশ হেফাজতে এত অগুন্তি মৃত্যুর ঘটনায় পুলিশের বিরুদ্ধে মোটে একটি ক্ষেত্রে নামমাত্র বিভাগীয় পদক্ষেপ করা হয়েছে। মঙ্গলবার লোকসভায় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী নিত্যানন্দ রাই এই সব পরিসংখ্যান পেশ করেছেন। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের নিয়মিত সংগ্রহ করা তথ্যের ভিত্তিতেই সরকার সার্বিক এই পরিসংখ্যা‍ন পেশ করেছে।

    ২০২৫–২৬–এ পুলিশ হেফাজতে মৃত্যুর পরিসংখ্যানে শীর্ষে রয়েছে বিহার। সেখানে আগের বছর মারা গিয়েছিলেন ১০ জন, এ বার তা বেড়ে হয়েছে ১৯। রাজস্থানে আগের বারের ৯ থেকে বেড়ে পুলিশ হেফাজতে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৮। উত্তরপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, গুজরাট ও পাঞ্জাব—এই চার রাজ্যের প্রতিটিতে ২০২৫–২৬–এ পুলিশ হেফাজতে মৃত্যুর সংখ্যা ১৫। ওডিশায় পুলিশ হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা লক্ষণীয় ভাবে বেড়েছে। ২০২১–২২–এ যেখানে মাত্র ২টি এ রকম ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছিল, ২০২৫–২৬–এ এসে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯। ছত্তীশগড়, হরিয়ানা, নাগাল্যান্ড, পাঞ্জাব, রাজস্থান, উত্তরপ্রদেশ, উত্তরাখণ্ড, দিল্লি, পুদুচেরি, কর্নাটক, তামিলনাড়ু—প্রায় সর্বত্রই হেফাজতে মৃত্যু বেড়েছে।

    অন্য দিকে, ২০২১–২২–এ মহারাষ্ট্রে ৩০ জন মারা গিয়েছিলেন পুলিশ হেফাজতে, তা ২০২৫–২৬–এ কমে হয়েছে ১৪। অসম, ঝাড়খণ্ড, কেরালা, পশ্চিমবঙ্গ, চণ্ডীগড়েও পুলিশ হেফাজতে মৃত্যু কমেছে। গোয়া, মণিপুর, মেঘালয়, মিজোরাম, সিকিম, ত্রিপুরা এবং জম্মু–কাশ্মীরে ২০২৫–২৬–এ পুলিশ হেফাজতে মৃত্যুর একটিও ঘটনা নথিভুক্ত হয়নি। এক সাংসদের নির্দিষ্ট প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মঙ্গলবার লোকসভায় বিশদ এই তথ্য–পরিসংখ্যান পেশ করেছেন। সেই সঙ্গে তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন, আইনশৃঙ্খলার বিষয়টি রাজ্যের এক্তিয়ারভুক্ত।

    একই সঙ্গে জেলখানার অবর্ণনীয় অবস্থার ছবিও উঠে এসেছে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর পেশ করা পরিসংখ্যানে। ২০২৩–এর ৩১ ডিসেম্বরের হিসেব—জেল হেফাজতে বিচারাধীন বন্দি ছিলেন ৩,৮৯,৯১০ জন। আর সাজাপ্রাপ্তের সংখ্যা ছিল ১,৩৫,৫৩৬ জন। সব মিলিয়ে বন্দি ছিলেন ৫,২৫,৪৪৬ জন। যা ১৩০০–র কিছু বেশি জেলখানার সর্বমোট ধারণক্ষমতার ঢের বেশিই। এই উপচে পড়া ভিড়ের পরিসংখ্যান ‘সংশোধনাগার’ ধারণাটিকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে। মন্ত্রী জানিয়েছেন, সবচেয়ে বেশি বিচারাধীন বন্দি রয়েছেন উত্তরপ্রদেশ, বিহার ও মহারাষ্ট্রে—যথাক্রমে ৭৩,৪৯১ জন, ৪৬,৫২৯ জন এবং ৩২,৪৩৮ জন। ‘বিচারাধীন’ মানে বিচারে অভিযোগ প্রমাণই হয়নি। তার আগেই লক্ষ লক্ষ মানুষের সুদীর্ঘ কারাবাস বিচারব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে।

  • Link to this news (এই সময়)