• ভোট-বাজারে যুদ্ধের আঁচ, কাঁচামালে টান পড়তেই ফ্লেক্সের দাম দ্বিগুণ
    এই সময় | ২৬ মার্চ ২০২৬
  • এই সময়: প্রচার–যুদ্ধের সরঞ্জামে বাধ সেধেছে আর এক যুদ্ধ। শুধু দেওয়াল লিখন বা পোস্টারের মধ্যে এখন আর নির্বাচনের প্রচার সীমাবদ্ধ নেই। ডিজিটাল প্রিন্টিং পদ্ধতিতে ছাপানো ফ্লেক্স ও ব্যানার রাজনৈতিক প্রচারের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। হাতে দেওয়াল লেখার চেয়ে খরচ কম, সময় বাঁচায় এবং প্রার্থীর ছবি ও দলের প্রতীক সমেত যে কোনও বার্তা সহজে ফুটিয়ে তোলা যায় ফ্লেক্সে। কিন্তু এ বার ফ্লেক্সের এই জনপ্রিয়তার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি।

    পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের প্রভাবে ক্রুড তেলের সরবরাহ অনিয়মিত হয়ে পড়েছে। ফ্লেক্স ও ব্যানারগুলো ক্রুড ওয়েলের বাজার দ্বারা ব্যাপক ভাবে প্রভাবিত হয়, কারণ এগুলো প্রধানত পলিভিনাইল ক্লোরাইড (পিভিসি) থেকে তৈরি করা হয়, যা ইথিলিন ও ক্লোরিন থেকে পাওয়া একটি প্লাস্টিক। পিভিসি–র সরবরাহ কমে যাওয়ায় এর দাম দ্বিগুণের কাছাকাছি বেড়েছে।

    পূর্ব বর্ধমানের কালনা শহরের স্টেশন রোড এলাকায় একটি ডিজিটাল ফ্লেক্স কারখানা চালাান গৌর সাহা। তিনি বলেন, 'ফ্লেক্স তৈরিতে ব্যবহার হওয়া পেট্রোলিয়ামজাত উপকরণের সরবরাহ এখন প্রায় শূন্যের কাছাকাছি। আগে একটি ফ্লেক্স তৈরি করতে ১৮০ টাকা খরচ হতো, এখন সেটি সাড়ে তিনশো থেকে চারশো টাকার মধ্যে। মনোনয়ন পর্বের পর চাহিদা আরও বাড়বে। দাম কোথায় পৌঁছাবে তা বলা মুশকিল।'

    ফ্লেক্স উৎপাদনকারীরা এখন রাজনৈতিক দলগুলোকে পরামর্শ দিচ্ছেন—সাইজ় ছোট করে এবং সংখ্যায় কিছুটা কম নেওয়ার মাধ্যমে বাজেট ঠিক রাখা সম্ভব। তবে এতে তাদের নিজস্ব ক্ষতিও হচ্ছে। কালনায় ফ্লেক্স তৈরির কাজে যুক্ত থাকা এসব মুখোপাধ্যায় বলেন, 'রায়না, নদিয়ার শান্তিপুর, হুগলির বলাগড়, পাণ্ডুয়া সমেত আশপাশের এলাকা থেকে ফ্লেক্স তৈরির জন্য ক্রেতারা আসছেন। এখনও শাসকদলের প্রার্থীদের অর্ডারই বেশি, তবে অন্য দলগুলোরও চাহিদা ধীরে ধীরে দেখা যাচ্ছে। যুদ্ধ কোন দিকে এগোয় তার উপরেই নির্ভর করছে ব্যবসা।'

    মুর্শিদাবাদের বহরমপুরের ফ্লেক্স দোকান মালিক চিরঞ্জিৎ ঘোষ বলেন, 'ফ্লেক্স তৈরিতে কাঁচামাল হিসেবে প্লাস্টিকের দানা লাগে। কিলো প্রতি আগে দর ছিল ৮৮–৯০ টাকা, এখন বেড়ে হয়েছে ১৯০ টাকা। এ ছাড়াও সাদা ফ্লেক্স ও রংয়ের দাম ৩৫–৪০ শতাংশ হারে বেড়েছে। তার প্রভাব পড়ছে ফ্লেক্স তৈরিতে।' পশ্চিম বর্ধমানের আসানসোলের ব্যবসায়ী প্রীতম বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায়, 'যুদ্ধের কারণে পেট্রলের বাই প্রোডাক্টগুলির দাম বেড়েছে। ১০ টাকার জায়গায় ১২ টাকা স্কোয়ার ফিট হিসেবে ফ্লেক্সের দাম নিচ্ছি ।'

    অন্য দিকে, ফ্লেক্স ছাপানোর কালির দাম ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেলেও প্রতিযোগিতার বাজারে কারখানা চালু রাখতে দাম কমিয়ে ফ্লেক্স ছাপানো হচ্ছে ঝাড়গ্রামে। ঝাড়গ্রামের একটি কারখানার মালিক মনোজ দাস বলেন, 'ছাপানোর কালির দাম ৮৫০ টাকা থেকে ১২৫০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। বাজার ধরে রাখার জন্য ফ্লেক্সের গুণগত মান কমিয়ে স্বাভাবিক মূল্যর চেয়েও অনেক কম টাকায় ফ্লেক্স ছাপাতে হচ্ছে।'

    পূর্ব মেদিনাপুরের নিমতৌড়ির এক ব্যবসায়ী নীলুপ্রসাদ পাড়ুই বলেন, 'আগের তুলনায় বর্তমানে প্রতি স্কোয়ার ফিটে প্রায় ৭০ থেকে ৭৫ পয়সা পর্যন্ত দাম বেড়েছে। তিনটি জেলার একাধিক বিধানসভার প্রার্থীদের ভোটের কাজ আগে থেকেই নেওয়া ছিল, কিন্তু সে অনুযায়ী আগাম ফ্লেক্স মজুত করা হয়নি। হঠাৎ দাম বৃদ্ধির কারণে ব্যবসায়ীদের এখন বড়সড় ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে।' নদিয়ার রানাঘাটের একটি প্রেসমালিক দোলন ভৌমিক বলেন, 'প্রয়োজনীয় উপকরণের দাম বাড়ায় ফ্লেক্স বানাতে দাম কিছুটা বেশি নিতেই হচ্ছে।'

    যদিও বাঁকুড়ায় এখনও ফ্লেক্সের দামে কোনওরকম হেরফের ঘটেনি। ফ্লেক্স মিলছে আগের দামেই। বাঁকুড়া শহরের একটি ফ্লেক্স প্রিন্টিং ইউনিটের ম্যানেজার সঞ্জয় ঘোষ বলছেন, 'প্রায় দেড় সপ্তাহ আগে আমরা কাঁচামাল তুলেছি এবং সেটা আগের দামেই পেয়েছি। আগে যা ছিল সেই দামেই ফ্লেক্স বানিয়ে দিচ্ছি। তবে আগামী দিনে কাঁচামালের যোগানে ঘাটতি দেখা দিলে কিংবা দাম বাড়লে সে ক্ষেত্রে আমরাও ফ্লেক্সের দাম বাড়াতে বাধ্য হব।'

    একই কথা বললেন মেদিনীপুর শহরের প্রিন্টিং সংস্থার কর্ণধার পাপ্পু খান। তাঁর বক্তব্য, 'আমরা এখনও প্রিন্টিংয়ের রেট বাড়াইনি। দাম বাড়তে পারে ভেবে প্রচুর পরিমাণ রোল কাগজ ও অন্য উপকরণ অর্ডার দিয়েছিলাম। পুরোনো দামে সেই সামগ্রী পেয়ে যাওয়ায় দাম এখনও বাড়াতে হয়নি। তবে কতদিন চলবে জানি না।'

    তবে শুধু ফ্লেক্স নয়, যাঁরা স্মারক বা ট্রফি তৈরি করেন তাঁরাও পড়েছেন সমস্যায়। পশ্চিম বর্ধমানের আসানসোলের ব্যবসায়ী মহম্মদ জাকির বলেন, '৬০ টাকা দামের স্মারকের দাম ১০ টাকা বেড়েছে। বড় স্মারকগুলোর ক্ষেত্রে দাম বেড়েছে আরও বেশি।'

  • Link to this news (এই সময়)