দিব্যেন্দু সিনহা, জলপাইগুড়ি
এ বারে ভোটে কে জিতবে? কোন দল ক্ষমতায় আসবে? এমন প্রশ্ন শুনেই তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন জলপাইগুড়ি শহরের বাসিন্দা সুশীল সরকার। চায়ে শেষ চুমুকটা দিয়ে বললেন, 'ধুর মশাই, ভোটে কে জিতবে তা দিয়ে আমাদের কী হবে।' তাঁর পাল্টা প্রশ্ন, 'গ্যাসের দাম কমবে? পেট্রল সস্তা হবে কি?'
ভোটের বাদ্যি বেজেছে, আর চায়ের দোকানে ভোট-আড্ডা হবে না- তা হয় নাকি! তবে এ বার যেন অন্য ছবি। কে ক্ষমতায় আসতে পারে, কোন প্রার্থী ভালো, কে দুর্নীতিগ্রস্ত- এ সব নিয়ে বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই জলপাইগুড়ি শহরে চায়ের ভাঁড়ে তুফানি আড্ডা দেওয়া জনতার। কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ, গ্যাস সিলিন্ডারের অপ্রতুলতা আর পেট্রলের মূল্যবৃদ্ধি। এ নিয়ে জনতার চোখেমুখে বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট।
জলপাইগুড়ি বড় পোস্ট আফিস মোড়ে চায়ের দোকান রয়েছে। বিন্দু রায়ের। সেখানে বসে চা খাচ্ছিলেন সরকারি কর্মী অসিত গুপ্ত। বিধানসভা নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন করতেই তাঁর খেদোক্তি, 'ভোট নিয়ে আলোচনা করে কী হবে? রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত। সমস্যায় পড়েছি আমরা। রান্নার গ্যাসের সিলিন্ডার বুক করলে কবে আসবে ঠিক নেই। বাধ্য হয়ে ব্ল্যাকে ১,৩০০ টাকা দিয়ে সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে। এই সমস্যাগুলো কে দেখবে?' তাঁর কথা শেষ হতেই 'ঠিকই তো' বলে সায় দিলেন টোটোচালক রবীন মণ্ডল।
বিন্দুকে 'একটা দুধ চা দিন তো' বলে জল খেয়ে বসলেন। তার পরে বললেন, 'রান্নার গ্যাসের সমস্যা নিয়ে রাজ্য দোষারোপ করছে কেন্দ্রকে। কেন্দ্র বলছে গ্যাসের কোনও সমস্যা নেই। তা হলে সমস্যা কোথায়?' চায়ে প্রথম চুমুকটা দিয়ে বললেন, 'আসলে সবই রাজনীতি। সংসার চালাব কী করে তা নিয়েই চিন্তায় আছি। ভোটে কে জিতবে সে সব নিয়ে আলোচনা করার ফুরসত আমাদের নেই।'
বিগত নির্বাচনগুলির আগেও বিন্দুর চায়ের দোকানে আড্ডার বিষয় ছিল ভোট। কিন্তু এ বার কথায় কথায় হতাশা বেরিয়ে আসছে। বিন্দুর কথায়, 'আমার দোকানে যাঁরা চা খেতে আসেন, তার অধিকাংশই অফিসকর্মী এবং দিনমজুর। অন্যবারে ভোট নিয়ে যতটা আলোচনা শুনেছি, এ বারে সেটা প্রায় নেই।' একই ছবি শহরের উকিলপাড়ায় সুজনের চায়ের দোকানে। সন্ধ্যা হলেই এখানে ভিড় জমে নানা বয়সের মানুষের। তাঁদের মধ্যে কাবেরী সরকার বললেন, 'ভোটে কে জিতবে তা নিয়ে আলোচনা করে কী হবে? রান্নার গ্যাস নিয়ে সমস্যায় পড়েছি। এটা কতদিন চলবে, জানি না।'
একটি বেসরকারি সংস্থার কর্মী নিমাই কর্মকার বলেন, 'অফিসের কাজে সারাদিন বাইরেই থাকি। মোটরবাইক চালাই। পেট্রলের দাম যে ভাবে বেড়েই চলেছে, তাতে মাসিক খরচ বেড়ে গিয়েছে। এ দিকে যুদ্ধের কারণে গ্যাস সিলিন্ডারের দামও আকাশছোঁয়া। কী করে সংসার চালাব বলুন তো? এই সমস্যার মধ্যে ভোট নিয়ে আলোচনার কোনও মানেই হয় না।' শহরের অন্যত্র চায়ের আড্ডাতেও ভোট-চর্চা গৌণ, মুখ্য হয়েছে দৈনন্দিন সমস্যা।