এই সময়, বাগদা: প্রথম সাপ্লিমেন্টারি তালিকা প্রকাশ হতেই বাগদা ব্লকের হেলেঞ্চা পঞ্চায়েতের ১২৭ ও ১৩৩ নম্বর বুথের বিচারাধীন ৮৯ জন ভোটারের নাম বাদ যেতেই আতঙ্ক ছড়িয়েছে এলাকায়। এরা সকলেই মতুয়া। ফলে মতুয়া অধ্যুষিত এই বিধানসভা কেন্দ্রে আদতে কতজন মতুয়ার নাম বাদ গেল তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বেনাগরিক হওয়ার দুশ্চিন্তা।
বাগদা ব্লকের হেলেঞ্চা পঞ্চায়েতের মণ্ডপঘাটা গ্রাম। বাগদা বিধানসভা কেন্দ্রটি মূলত মতুয়া অধ্যুষিত। মণ্ডপঘাটা গ্রামের ১২৭ নম্বর বুথের বাসিন্দা আশুতোষ বিশ্বাস, মতি সাধকের মতো মোট ৪৭ জন ভোটারের নাম বিচারাধীন তালিকায় ছিল। নথি জমা দিয়ে তাঁরা শুনানি করিয়েছেন। আশা ছিল হয়তো সাপ্লিমেন্টারি তালিকায় নাম উঠবে। কিন্তু প্রথম সাপ্লিমেন্টারি তালিকায় বুথের ৪৭ জন মতুয়া ভোটারের নামই বাদ যাওয়ায় তীব্র আতঙ্ক এলাকায়। ভোটাধিকার হারিয়ে ঘোর দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তাঁরা। সরকারের ভাতা পাওয়া নিয়েও অনিশ্চয়তার আশঙ্কা বাড়ছে গ্রামবাসীদের।
পাশের ১৩৩ নম্বর বুথের ৪২ জনের নাম বাদ গিয়েছে সাপ্লিমেন্টারি তালিকা থেকে। বাগদা বিধানসভায় সার প্রক্রিয়ার প্রথম পর্বে মোট ১৫,৩০৩ জনের নাম চূড়ান্ত ভোটার তালিকা থেকে বাদ গিয়েছে। বিচারাধীন ছিলেন ১৩ হাজার ৪৫৯ জন। বাগদা কেন্দ্রে অধিকাংশ উদ্বাস্তু ও মতুয়া সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস। প্রধানমন্ত্রী থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলায় এসে মতুয়াদের একজনের নামও ভোটার তালিকা থেকে বাদ যাবে না বলে আশ্বস্ত করেছিলেন। কিন্তু প্রথম সাপ্লিমেন্টারি তালিকা থেকে বাগদার দু'টি বুথেই ৮৯ জন মতুয়ার নাম বাদ চলে যাওয়ায় সিঁদুরে মেঘ দেখছেন বাকিরা।
নাম বাদ যাওয়ায় ভেঙে পড়েছেন ৭২ বছরের বৃদ্ধ আশুতোষ বিশ্বাস। তিনি বলেন, 'বহু বছর ধরে এই কেন্দ্রে ভোট দিয়ে আসছি। আমরা মতুয়া সদস্য হিসেবে ঠাকুরবাড়ি থেকে দলের রেজিস্ট্রেশন করিয়েছি। বড় ছেলের নাম আগেই বাদ গিয়েছিল। এ বার ছোট ছেলে ও আমার নাম বাদ দেওয়া হলো। কোথায় যাব বুঝতে পারছি না।' মতি সাধক বলেন, 'আমার পরিবারের ৬ জন সদস্য। পাঁচজনের নাম আগেই বাদ গিয়েছে। একজনের নাম বিচারাধীন ছিল। আমরা সবাই বেনাগরিক হয়ে গেলাম!'
ক্ষুব্ধ মতুয়াদের বক্তব্য ২০০২ সালে ভোটার তালিকায় নাম থাকা বাবা-মায়ের লিঙ্ক জমা দেওয়ার পরেও বিচারাধীন ভোটার হিসেবে চিহ্নিত করেছিল কমিশন। কেউ বা বিদেশে কাজ করেন। তাঁরা কী করবেন? কোথায় যাবেন? এই প্রশ্নগুলোই ঘুরছে হেলেঞ্চা পঞ্চায়েতের বিস্তীর্ণ এলাকায়।
১৩৩ নম্বর বুথের বাসিন্দা গৌতম বিশ্বাস বলেন, 'শান্তনু ঠাকুর থেকে প্রধানমন্ত্রী সকলেই বলেছিলেন, অনুপ্রবেশকারী, রোহিঙ্গাদের নাম বাদ যাবে। উদ্বাস্তু, মতুয়াদের একজনের নামও বাদ যাবে না। কিন্তু দেখা গেল বাগদা থেকে অধিকাংশ মতুয়াদের নামই বাদ গিয়েছে। এখন আমাদের তো মরণ ছাড়া কোনও উপায় নেই।' অম্বিক বিশ্বাস বলেন, 'আমার বাবা-মা, ঠাকুমা সবাই ২০০২ সাল থেকে ভোট দিয়েছে। আমরা তিন ভাই এখানে জন্মেছি। অথচ আমাদের পরিবারের চারজনের নাম বাদ চলে গেল।'
এই প্রসঙ্গে তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ মমতাবালা ঠাকুর বলেন, 'মতুয়াদের ভোট নিয়েই বাগদা থেকে এতদিন বিজেপি জিতেছিল। শান্তনু ঠাকুর সাংসদ থেকে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হয়েছেন। এ বারের ভোটে বাগদা থেকে মতুয়াদের নামগুলো কমিশনকে হাতিয়ার করে বাদ দেওয়া হয়েছে। এর জবাব নির্বাচনে মতুয়ারা দেবেন।'
বারবার ফোন করা হলেও শান্তনু ঠাকুর ও সুব্রত ঠাকুর কেউই ফোন ধরেননি। বিজেপি প্রভাবিত অল ইন্ডিয়া মতুয়া মহাসঙ্ঘের সাধারণ সম্পাদক এবং শান্তনু ঘনিষ্ঠ সুকেশ গাইন বলেন, 'যাদের নাম বাদ গিয়েছে, তারা এ বারের নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। তবে, পরে সিএএতে আবেদন করে তারা ভারতের নাগরিকত্ব পেয়ে যাবেন।'