উত্তরবঙ্গের ‘নির্বাচনী চায়ের’ স্বাদ বারবার বদলেছে। কার ভাগ্যে জুটবে কড়া চা আর কার কপালে জুটবে পানসে চা, তা নির্ভর করে অনেকগুলি ফ্যাক্টরের ওপর। ঠিক যেমন চায়ের চাষ, ফলন ও উৎপাদনের ওপর নির্ভর করে আপনার কাপের চায়ের স্বাদ কেমন হবে। আপনার চা কতটা সুস্বাদু হবে তা যেমন নির্ভর করে সেটা কোন ‘ফ্লাশ’-এর চা, ঠিক তেমনই উত্তরবঙ্গের ৫৪টি আসন অনেকটাই ঠিক করে দেয় যে কলকাতায় চায়ের স্বাদ মিষ্টি হবে।
উত্তরবঙ্গের রাজনীতি ও চায়ে পে চর্চা
অর্থাৎ, কার সরকার গড়বে এবং কতটা শক্তিশালী হবে। আসুন উত্তরবঙ্গের চা, রাজনীতি আর নির্বাচনী সম্পর্কের রসায়নটা বুঝে নেওয়া যাক। কেন উত্তরবঙ্গকে ‘সুইং জোন’ বলা হয় এবং কেন তৃণমূল ও বিজেপি, উভয় পক্ষের কাছেই এই অঞ্চলটি এত গুরুত্বপূর্ণ, তা আলোচনা করা যাক। রাজনৈতিক অঙ্ক বোঝার আগে চায়ের বিষয়টা সংক্ষেপে বুঝে নেওয়া দরকার। উত্তরবঙ্গের বাগান থেকে চা পাতা আপনার কাপ পর্যন্ত পৌঁছতে চারটি পর্যায় থাকে, যাকে ‘ফ্লাশ’ বলা হয়। এটি ফেব্রুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত চলে। এর মধ্যে সবথেকে ভাল চা পাওয়া যায় ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিলের মধ্যে, যাকে ‘ফার্স্ট ফ্লাশ’ বলে। এর বিশেষত্ব হল এর সুগন্ধ। বর্তমানে উত্তরবঙ্গের চা বাগানগুলিতে ফার্স্ট ফ্লাশ চায়ের গন্ধের সঙ্গেই মিশে রয়েছে ভোটের রাজনীতির গন্ধ।
উত্তরবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাস দেখলে বোঝা যায়, দীর্ঘ সময় এটি বামেদের দুর্গ ছিল। কিন্তু ২০১১ সালে গোটা রাজ্যের সঙ্গে এখানকার ছবিটাও পাল্টে যায়। ‘মা-মাটি-মানুষ’ আর ‘পরিবর্তন’-এর হাওয়ায় ৫৪টির মধ্যে ২৮টি আসন জিতেছিল তৃণমূল। মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শিলিগুড়িতে মিনি সচিবালয় (উত্তরকন্যা) তৈরির ঘোষণা করেন, উত্তরবঙ্গের জন্য আলাদা মন্ত্রক তৈরি হয় এবং গৌতম দেবকে মন্ত্রিত্ব দেওয়া হয়। চা বাগান, ডুয়ার্স আর পাহাড় ঘেরা এই অঞ্চলে ২০১৬ সালেও তৃণমূলের আধিপত্য বজায় ছিল এবং তারা ২৩টির বেশি আসন পায়। কিন্তু ঠিক এই সময়েই বাংলার রাজনীতিতে জোরালোভাবে প্রবেশ ঘটে বিজেপির।
বিজেপি উত্তরবঙ্গের, তৃণমূল দক্ষিণবঙ্গের?
এর প্রভাব উত্তরবঙ্গেও দেখা যায় এবং বিজেপি শূন্য থেকে একলাফে ৭টি আসনে পৌঁছে যায়। বামেরা ক্রমাগত দুর্বল হতে থাকে এবং কংগ্রেসও তাদের জমি হারায়। ২০১৬-র সেই পারফরম্যান্সকে আরও একধাপ এগিয়ে নিয়ে গিয়ে ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি অসাধ্য সাধন করে। ৮টি লোকসভা আসনের মধ্যে ৭টিতেই জয়লাভ করে তারা উত্তরবঙ্গের রাজনীতির সমীকরণ পুরোপুরি বদলে দেয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সময় থাকতেই এর আঁচ পেয়েছিলেন।
তৃণমূলের গায়ে সবসময় ‘দক্ষিণবঙ্গের দল’ তকমা দেওয়ার যে চেষ্টা চলত, এই ফলাফল তাকে আরও মজবুত করে। তাই তৃণমূল কোমর বেঁধে লড়াই শুরু করে এবং ২০২১-এ আবার ২৩টি আসনে ফিরে আসে। কিন্তু আসল খেলাটা দেখায় বিজেপি। ২০২১-এ বিজেপি নবান্নের দখল নিতে না পারলেও উত্তরবঙ্গে ৩০টি আসন জিতে বুঝিয়ে দেয় যে এই অংশে তাদের প্রভাব কতটা গভীর। বাম ও কংগ্রেস এখানে কার্যত প্রান্তিক শক্তিতে পরিণত হয়। রাজ্য এক হলেও দক্ষিণ ও উত্তরবঙ্গের মধ্যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ও প্রত্যাশার দিক থেকে অনেক তফাত রয়েছে।
সেই কারণেই এখানে আলাদা রাজ্যের দাবি দীর্ঘদিনের। কলকাতা থেকে ভৌগোলিক দূরত্ব একটি বড় কারণ, যার ফলে এখানে ছোট ছোট রাজনৈতিক দল ও জনজাতিগুলোর দাবিদাওয়া জোরালো হয়েছে। দার্জিলিং-এ আলাদা গোর্খাল্যান্ডের দাবি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে। চা বাগান এবং আদিবাসী এলাকাগুলির মাধ্যমে বিজেপি এখানে নিজেদের শক্ত ভিত তৈরি করেছে। একইভাবে কোচবিহার ও দিনাজপুর জেলাগুলিতে স্থানীয় ইস্যুর পাশাপাশি রাজবংশী সম্প্রদায়কে পাশে টেনে বিজেপি সাফল্য পেয়েছে।
ছাব্বিশে লড়াইটা সহজ নয়
তবে এবার উত্তরবঙ্গে বিজেপির লড়াই খুব একটা সহজ নয়। বিজেপির চারজন বিধায়ক ইতিমধ্য়েই তৃণমূলে যোগ দিয়েছেন। শিলিগুড়ি ও সংলগ্ন এলাকায় তৃণমূল ক্রমাগত শক্তিশালী হচ্ছে, যার প্রতিফলন দেখা গিয়েছে পুরভোটে। এই প্রথম শিলিগুড়ি পুরনিগম তৃণমূলের পূর্ণ দখলে। এমনকী শিলিগুড়ি মহকুমা পরিষদ, যা কখনও তৃণমূলের হাতে ছিল না, সেখানেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল জিতেছে। বিজেপি এই এলাকায় আদিবাসী ভোটের ওপর ভরসা করে আসছিল। আদিবাসী নেতা জন বার্লাকে কেন্দ্র করে বিজেপি মন্ত্রীও করেছিল, কিন্তু আজ তিনি তৃণমূলের শিবিরে। এর ফলে আদিবাসী ভোটব্যাঙ্ক কোন দিকে যাবে, তা বলা কঠিন। যদিও কোচবিহার, আলিপুরদুয়ার, জলপাইগুড়ি ও দার্জিলিং-এর আসনগুলোতে বিজেপি এখনও শক্তিশালী। এর মূল কারণ এখানকার মিশ্র ভোটার।
উত্তরবঙ্গের ভোটাররা সবসময়ই এক দল থেকে অন্য দলে সরতে থাকেন। সাধারণত ১২-১৫ বছর অন্তর এই প্যাটার্ন বদলায়। এবার লড়াই সরাসরি তৃণমূল বনাম বিজেপি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই বাস্তবটা ভাল ভাবেই বোঝেন, তাই এবার তিনি উত্তরবঙ্গে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছেন। মঙ্গলবার আলিপুরদুয়ার থেকে নির্বাচনী সফর শুরু করেছেন তিনি। ময়নাগুড়ি ও মাটিগাড়া-নকশালবাড়িতেও তাঁর সক্রিয় উপস্থিতি দেখা গিয়েছে। শিলিগুড়ি সংলগ্ন এই তরাই অঞ্চলে এক সময় বামেদের দাপট ছিল, পরে বিজেপি সেখানে জায়গা করে নেয়। তৃণমূল এবার অনেক আসনে নতুন মুখ এনেছে, কারণ দিনাজপুর জোনে তৃণমূলের বেশ কিছু নেতার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ছিল।
এছাড়া দক্ষিণ দিনাজপুর, উত্তর দিনাজপুর ও মালদহে তৃণমূল বর্তমানে তাদের জমি ধরে রেখেছে। এবার মালদহের লড়াই বেশ আকর্ষণীয় হতে চলেছে। প্রাক্তন সাংসদ মৌসম নূর ফের কংগ্রেসে ফিরেছেন। তিনি তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ ছিলেন এবং গনি খান চৌধুরীর পরিবারের সদস্য। মালদহের রাজনীতিতে এই পরিবারের দীর্ঘকালীন প্রভাব থাকায় এটি কংগ্রেসের দুর্গ বলে পরিচিত ছিল। যদিও গত দুটি নির্বাচনে কংগ্রেস এখানে বিশেষ সুবিধা করতে পারেনি। পাহাড়ের রাজনীতির কথা বললে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আগের মতো সেই সংহতি এখন আর নেই। গোর্খাল্যান্ডের দাবি নিয়ে যে আন্দোলন ১৫-২০ বছর আগে তুঙ্গে ছিল, তার তীব্রতা এখন অনেকটাই স্তিমিত।
অল্প কিছু ভোটই ভাগ্য বদলে দিতে পারে
পাহাড়ের রাজনৈতিক দলগুলো এখন কয়েকটি গোষ্ঠীতে বিভক্ত। তাই তৃণমূল সরাসরি প্রার্থী না দিয়ে জোটের পথে হেঁটেছে। অনীত থাপার নেতৃত্বে তৃণমূল দার্জিলিং-এর তিনটি আসন ভারতীয় জনমুক্তি মোর্চাকে ছেড়ে দিয়েছে। বিজেপি-ও আঞ্চলিক দলগুলির সঙ্গে জোট বেঁধে লড়ছে। যশবন্ত সিংয়ের সময় থেকেই দার্জিলিং লোকসভা আসনে বিজেপি জিতে আসছে কারণ পাহাড়ের আঞ্চলিক দলগুলো তাদের সমর্থন দিয়ে এসেছে। যেখানে জয়ের ব্যবধান খুব কম, সেখানে অল্প কিছু ভোটই ভাগ্য বদলে দিতে পারে। গত ১৫ বছর ধরে উত্তরবঙ্গের অনেক আসনে খুব হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হচ্ছে।
তাই ভোটের ধরনে সামান্য বদলও বড় প্রভাব ফেলতে পারে। এই জেলাগুলিতে ‘সুইং ভোটার’ বা দোদুল্যমান ভোটাররা বড় ফ্যাক্টর, অর্থাৎ এখানকার ভোটাররা কোনও নির্দিষ্ট ছকে ভোট দেন না। এর প্রধান কারণ হলো মিশ্র জনসংখ্যা। এখানে যেমন শহুরে ভোটার আছেন, তেমনই গ্রামীণ ভোটারদের সংখ্যাও বিশাল। শহরে যানজট বা সাফাইয়ের মতো বিষয়গুলো বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়ায়। আবার এক দিকে রাজবংশী ভোটব্যাঙ্ক, অন্য দিকে চা বাগানের শ্রমিকদের বিশাল সংখ্যা। শ্রমিকদের কাছে আজও বড় সমস্যা হলো বাগানের বাইরে পাকাবাড়ি, বিদ্যুৎ আর সঠিক মজুরি।
জলপাইগুড়ি ছাড়াও কোচবিহার ও দিনাজপুর জোনে রাজবংশী ও কামতাপুরি আন্দোলন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অন্তত ১২-১৫টি আসনে এদের বড় প্রভাব রয়েছে। দীর্ঘকাল ধরে আলাদা রাজ্যের দাবি তোলা হলেও আজও তার পূর্ণ সমাধান হয়নি।
পৃথক পরিচয়ের পাশাপাশি উন্নয়নের দাবিও অনেক দিনের। গ্রেটার কোচবিহার রাজ্যের দাবি এই এলাকায় বারবার উঠেছে। শুধু এই অঞ্চলেই নয়, রাজবংশী সম্প্রদায়ের বিস্তার অসম ও প্রতিবেশী দেশ নেপাল পর্যন্ত। বিজেপির রাজ্যসভার সাংসদ অনন্ত মহারাজ বর্তমানে তৃণমূলের ঘনিষ্ঠ, আবার তৃণমূল বিধায়ক অর্ঘ্য রায় বর্মন বা রাজবংশী নেতা বংশীবদন বর্মন এখন বিজেপির শিবিরে। নির্বাচনী চা শেষ পর্যন্ত কার জন্য কড়া হবে, তা নির্ভর করবে ভোটারদের গতিপ্রকৃতির ওপর। তৃণমূল কি তাদের হারানো জমি ফিরে পাবে, নাকি বিজেপি উত্তরবঙ্গের এই দুর্গ রক্ষা করতে সফল হবে। সেটাই এখন দেখার।