• শুক্রে সব রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীদের নিয়ে বৈঠক মোদীর, কী নিয়ে আলোচনা? জারি জল্পনা
    এই সময় | ২৭ মার্চ ২০২৬
  • এই সময়: সামাজিক মাধ্যমে হোক, অথবা অলিগলিতে দিনভর জল্পনা, ইরান–ইজ়রায়েল যুদ্ধ পরিস্থিতিতে কি দেশে ফিরবে কোভিডকালের ‘লকডাউন’ ? অথবা জ্বালানি সঙ্কট কাটাতে কোনও কাটছাঁট?

    দেশজুড়ে এই জল্পনার মধ্যে পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং তার জেরে ভারতের অবস্থান ও পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করতে আজ, শুক্রবার সব রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে জরুরি বৈঠকে বসবেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। পশ্চিমবঙ্গ–সহ ভোটমুখী পাঁচ রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে নির্বাচনী আদর্শ আচরণবিধি কার্যকর হয়ে যাওয়ায় সেখানকার মুখ্যমন্ত্রীরা আজকের বৈঠকে থাকছেন না। কেন্দ্রের ক্যাবিনেট সচিব সংশ্লিষ্ট রাজ্যের মুখ্যসচিবদের সঙ্গে আলাদা করে বৈঠক করবেন বলে সূত্রের খবর।

    এই বৈঠকের অ্যাজেন্ডা বৃহস্পতিবার সামনে না–এলেও দিল্লিতে প্রশাসনিক মহলের দাবি, ইরান–ইজ়রায়েলের যুদ্ধ পরিস্থিতি ২৮ দিন অতিক্রান্ত হওয়ায় ভারত–সহ বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সঙ্কট, এলপিজি সিলিন্ডার নিয়ে হাহাকার, মূল্যবৃদ্ধির মতো আশু সমস্যা এবং কী ভাবে তার মোকাবিলা করা যাবে, সেটাই আজকের ভার্চুয়াল বৈঠকে মুখ্য বিষয় হিসেবে উঠে আসতে পারে। দিন দুয়েক আগেই সংসদে প্রধানমন্ত্রী মোদী এই যুদ্ধকে বিশ্বব্যাপী তীব্র জ্বালানি সঙ্কটের কারণ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। তিনি এও জানান, পরিস্থিতি এ ভাবেই চলতে থাকলে এর প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। এর অনিবার্য পরিণতি ভোগ করতে হবে। ভারতে এর প্রভাব ন্যূনতম রাখতে সরকার সক্রিয় ভাবে কাজ করছে বলে তিনি আশ্বাস দিলেও সম্ভাব্য যে কোনও পরিস্থিতির জন্য নাগরিকদের প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি জ্বালানি, সরবরাহ ব্যবস্থা (সাপ্লাই চেন), সার এবং মূল্যবৃদ্ধির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি পরিচালনার জন্য সরকার কোভিড-কালের ধাঁচে সাতটি বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন গোষ্ঠীও (এমপাওয়ার্ড গ্রুপ) গঠন করেছে। কেন্দ্রের দাবি, ভারত তার জ্বালানির উৎস বহুমুখী করছে, অপরিশোধিত তেল ও গ্যাসের জন্য নতুন বাজার খোঁজার সঙ্গে সঙ্গে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করার চেষ্টা চালাচ্ছে।

    গত কয়েক দিন ধরে সামাজিক মাধ্যমে জল্পনা চলছে, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে জ্বালানি সঙ্কটের জেরে কি আবার ‘লকডাউন’ না–হলেও কোভিডের মতো কোনও কড়া পদক্ষেপের মতো হাঁটতে পারে কেন্দ্র? কারণ, কেন্দ্র দাবি করছে, দেশে জ্বালানি সঙ্কট এখনও তেমন পর্যায়ে পৌঁছয়নি এবং দেশে এখনও জ্বালানির পর্যাপ্ত ভাঁড়ার রয়েছে। কিন্তু বাস্তব চিত্র সেটা বলছে না। বিভিন্ন রাজ্যে এলপিজি সঙ্কট ক্রমশ বাড়ছেই। পেট্রল পাম্পে দেখা যাচ্ছে লম্বা লাইন। তা র উপরে কোভিডকালের ধাঁচে সাতটি এমপাওয়ার্ড কমিটি গঠনের সিদ্ধান্তও জনমানসে জল্পনায় বাড়তি ইন্ধন দিচ্ছে। বস্তুত মোদীর বৈঠকের আগেই কেন্দ্রকে এই ইস্যুতে নিশানা করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পশ্চিম বর্ধমানের পাণ্ডবেশ্বরে বৃহস্পতিবার নির্বাচনী প্রচারে তৃণমূলনেত্রী বলেন, ‘দেশের মানুষকে আবারও লাইনে দাঁড় করাতে চলেছে মোদী সরকার। লকডাউনের ফন্দি করছে।’ মমতার কথায় ‘নোটবন্দি থেকে আধার লিঙ্ক, সুযোগ পেলেই মানুষকে লাইনে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে মোদী সরকার। এখন গ্যাসের জন্য লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে। মোদী সরকারকে আনা যাবে না। ওদের বিশ্বাস করি না আমি। গ্যাস ফুরিয়ে গেলে মানুষ খাবে কী? হাওয়া খাবে?’ যদিও কেন্দ্রের প্রশাসনিক মহলের একাংশের বক্তব্য, ভারত যেমন বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক দিক থেকে ভারসাম্য রেখে চলার চেষ্টা করছে, তেমনই দেশের অভ্যন্তরে এর সম্ভাব্য আঁচ যাতে সাধারণ মানুষের উপরে এসে না–পড়ে, তারও চেষ্টা চালাচ্ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী আজকের বৈঠকে ‘টিম ইন্ডিয়া’র চেতনায় ঐক্যবদ্ধ দৃষ্টিভঙ্গির উপরে জোর দিতে পারেন বলে মনে করা হচ্ছে।

    এর মধ্যে জ্বালানি সমস্যা ঘিরে বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে, তাকে সামাল দিতে এ দিন বিবৃতি দিয়েছে পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রক। বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছে, ভারতের জ্বালানি সরবরাহ আগামী বেশ কয়েক মাসের জন্য সম্পূর্ণ সুরক্ষিত। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘সমস্ত রিটেল পাম্পে পর্যাপ্ত জ্বালানি রয়েছে। দেশে পেট্রল, ডিজে়ল বা এলপিজি-র কোনও ঘাটতি নেই। উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে আতঙ্ক ছড়ানোর যে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে, তাতে বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য নাগরিকদের কাছে আবেদন জানানো হচ্ছে।’ ভারত বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম তেল পরিশোধক এবং পঞ্চম বৃহত্তম পেট্রোলিয়াম পণ্য রপ্তানিকারক দেশ— এই তথ্য মনে করিয়ে দিয়ে মন্ত্রক জানায়, সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়ানো ভুয়ো ভিডিয়োর জেরে কয়েকটি পাম্পে হুড়োহুড়ি হলেও, তেল কোম্পানিগুলির ডিপো রাতভর কাজ করে সরবরাহ স্বাভাবিক রেখেছে। হরমুজ় প্রণালীতে সঙ্কটের জেরে সাপ্লাই লাইন ব্যাহত হলেও, ভারত বর্তমানে বিশ্বের ৪১টিরও বেশি দেশের কাছ থেকে আগের চেয়ে বেশি অপরিশোধিত তেল আমদানি করছে। মন্ত্রকের আরও দাবি, ভারতের কাছে ৭৪ দিনের মোট রিজ়ার্ভ ক্ষমতা এবং প্রায় ৬০ দিনের প্রকৃত মজুত (অ্যাকচুয়াল স্টক কভার) রয়েছে। আগামী দু’মাসের অপরিশোধিত তেল সংগ্রহের বিষয়টি ইতিমধ্যেই সুরক্ষিত। তাই দেশের তেলের মজুত ফুরিয়ে আসছে— এমন দাবি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।

    এলপিজি ভাঁড়ার নিয়ে কেন্দ্রের দাবি, এলপিজি-র কোনও ঘাটতি নেই। দেশীয় শোধনাগারগুলিতে উৎপাদন ৪০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। গড়ে দৈনিক ৮০ হাজার মেট্রিক টন চাহিদার ক্ষেত্রে এখন উৎপাদন হচ্ছে ৫০ হাজার মেট্রিক টন। অন্তত এক মাসের সরবরাহ পুরোপুরি সুনিশ্চিত করা হয়েছে। মানুষের আতঙ্কের কারণে দৈনিক সিলিন্ডারের চাহিদা একধাক্কায় বেড়ে ৮৯ লক্ষে পৌঁছলেও, পরিস্থিতি এখন স্বাভাবিক হওয়ায় তা ফের ৫০ লক্ষে নেমে এসেছে।

  • Link to this news (এই সময়)