দিগন্ত মান্না, পাঁশকুড়া
রামায়ণ গানকে বহির্জগতে ছড়িয়ে দিয়েছেন তিনি। একটা সময়ে রামায়ণ গান গেয়ে মঞ্চ শাসন করেছেন পূর্ব মেদিনীপুরের পাঁশকুড়ার বিদ্যুৎলতা সামন্ত। কয়েক দশক ধরে মুক্তমঞ্চের পাশাপাশি 'টিকিট সেল' মঞ্চেও রামায়ণ গান গেয়েছেন। 'বিদ্যুৎলতা নাইট'–এর আয়োজন করে বহু উদ্যোক্তা লাভের কড়ি গুনেছেন। বিদ্যুৎলতার কিন্তু শিল্পীভাতাটুকু জোটেনি।
রামনবমী এলেই পুরোনো স্মৃতি হাতড়ে বেড়ান। যাত্রা, অর্কেস্ট্রা, ডান্স ট্রুপের ভিড়ে ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে রামায়ণ গান। তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে শিল্পী বললেন, 'কদর বাড়ুক রামায়ণ গানের। এই গানকে বাঁচাতে সরকার এগিয়ে আসুক।'
রামনবমীতে কোলে রামের ছবি নিয়ে বসেছিলেন বিদ্যুৎলতা। শুকিয়ে যাওয়া চোখের জল অনেক কথা বলছিল। গ্রামের এক সাদামাটা আটপৌরে গৃহবধূর রামায়ণ গানের 'স্টার' হয়ে ওঠার গল্প হার মানায় সেলুলয়েডের কাহিনীকেও। তমলুকের গৌরাঙ্গপুরে জন্ম বিদ্যুৎলতার। পাশের যুগীখোপ গ্রামে গাঁতাইতদের বাড়িতে রাসযাত্রা উপলক্ষে রামায়ণ গান শোনাতে এসেছিলেন প্রখ্যাত শিল্পী অনাথবন্ধু দাস অধিকারী। তাঁর গান শুনে ছোট্ট বিদ্যুৎলতা রামায়ণ গান শেখার বায়না ধরেন। কিন্তু বাড়ির লোকজনের আপত্তিতে তখন সেই সাধ পূরণ হয়নি তাঁর। মাত্র ১৩ বছর বয়সে পাঁশকুড়ার হরিনারায়ণচক গ্রামের দেবেন্দ্রনাথ সামন্তর সঙ্গে বিদ্যুৎলতার বিয়ে হয়ে যায়। আর এ যেন সত্যি সত্যি 'রাম মিলায়ে জোড়ি'! স্ত্রীর অনুরোধে শিক্ষক স্বামী রামায়ণ গান লিখে সুর দেওয়া শুরু করেন। আর সঙ্গে সঙ্গে সেই সুর তুলে নিতেন বিদ্যুৎলতা। ১৯৭১–এ তমলুকে প্রথম বার মঞ্চে রামায়ণ গান পরিবেশন করেন। তার পরে আর পিছনে তাকাতে হয়নি।
প্রথম দিকে অবশ্য মঞ্চে গান গাওয়া নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন শাশুড়ি। তাঁকে খুশি করতে সংসারের সব কাজ সামলে, ছেলেমেয়েদের প্রতি দায়িত্ব পালন করে তার পরে ডুবেছেন রামগানে। এ ভাবেই হয়ে উঠেছেন রামায়ণ গানের স্টার। 'সীতাহরণ', 'রামের বনবাস'-এর মতো রামায়ণ গানের ২৫টি পালা লিখেছিলেন দেবেন্দ্রনাথ। বিদ্যুৎলতার কণ্ঠে সব পালাই জনপ্রিয় হয়। ১৯৮১–২০১৪ টানা ৩৩ বছর আকাশবাণীতে রামায়ণ গান গেয়েছেন। ১৯৮৯–এ দূরদর্শনে সম্প্রচারিত হয়েছে তাঁর রামায়ণ গান। টিকিট কেটেও 'বিদ্যুৎলতা নাইট'–এ ভিড় করতেন শ্রোতারা। ১৯৯০–এর শেষের দিকে 'সহস্র স্কন্ধ রাবণবধ' নামে বিদ্যুৎলতার রামায়ণী কথক গানের একটি ক্যাসেট ব্যাপক জনপ্রিয় হয়। মঞ্চে হারমোনিয়াম বাজিয়ে রামায়ণ গান গাইতেন বিদ্যুৎলতা। বড় ছেলে তাপস তবলা বাজাতেন। আর দেবেন্দ্রনাথ কখনও নাক, কখনও আবার চিরুনির সাহায্যে সুর দিতেন।
২০১৯–এ স্বামীর মৃত্যুর পরে পুরোপুরি মঞ্চ ছেড়ে দেন বিদ্যুৎলতা। হারমোনিয়াম, তবলা আর খোলের বোলে এখন আর রামায়ণ গানের আসর জমে না। সুখস্মৃতি রোমন্থন করতে করতে গলা বুজে আসে সে দিনের 'স্টার' বিদ্যুৎলতার। দুই ছেলের মধ্যে এক ছেলে আগে মারা গিয়েছেন। মেয়ের বিয়ে হয়ে গিয়েছে অনেক আগেই। পাঁশকুড়া শহরের প্রতাপপুরে বড় ছেলের বাড়িতে থাকেন বছর আশির বিদ্যুৎলতা। সেই বাড়ির ঠাকুরের আসনের সামনেই রাখা আছে মঞ্চ কাঁপানো সঙ্গী তাঁর সেই হারমোনিয়াম। ইচ্ছে থাকলেও এখন আর গলা ওঠে না। স্বামীর লেখা রামায়ণ গানের পালার পাণ্ডুলিপির দিকে মাঝেমাঝেই চোখ বোলান। বেরিয়ে আসে দীর্ঘশ্বাস।
বিদ্যুৎলতা বলেন, 'তখন অনুষ্ঠানের এত চাপ ছিল যে, এক বছর আগে কেউ বুক না করলে অনুষ্ঠানের দিন পেতেন না। এখন তো রামায়ণ গানের চর্চা হারিয়ে যাচ্ছে। রামনবমী নিয়ে মানুষের উন্মাদনা বেড়েছে। কিন্তু রামায়ণ গানের মঞ্চ কোথায়?'
ছেলে তাপস সামন্ত বলেন, 'রামায়ণ গানের শিল্পীদের সরকার আলাদা স্বীকৃতি দেয় না। মা শংসাপত্র পেলেও শিল্পী ভাতা পান না। তাতে অবশ্য দুঃখ নেই। মা মানুষের হৃদয় জয় করেছেন।'