সুনন্দ ঘোষ
হোল্ড বললেই প্রথমে মনে পড়ে কিছু ধরে রাখা। এ ছাড়াও আপনাকে ‘হোল্ড করতে বলা হচ্ছে’ অর্থে আপনাকে অপেক্ষা করতে বা কোথাও থমকে যেতে বলা হচ্ছে, এমনটাও বোঝায়।
এই হোল্ড শব্দটা খুব ফ্রিকোয়েন্টলি, প্রতিদিন প্রায় কয়েক লক্ষ বার ব্যবহার করা হয় এভিয়েশন সেক্টরে (Aviation)। বিমান টেক–অফ করার আগে গড়িয়ে গড়িয়ে রানওয়েতে পৌঁছয়। সেখান থেকে গতি প্রচণ্ড বাড়িয়ে মুখ তুলে উড়ে যায় আকাশে। তবে, তার আগে, রানওয়েতে ঢোকার মুখে যদি দেখা যায় সেই সময়ে অন্য বিমান নামছে বা ইতিমধ্যেই একটি বিমান রানওয়ে থেকে টেক–অফ করছে, তখন রানওয়েতে ঢোকার মুখে দাঁড় করিয়ে অপেক্ষা করতে বলা হয় দ্বিতীয় বিমানের পাইলটকে। তখনও বলা হয় ‘হোল্ড’ (Holding Pattern)। পাইলট ঠিক যেখানে বিমান নিয়ে অপেক্ষা করেন, তাকে ‘হোল্ডিং পয়েন্ট’ (Holding Point) বলে। তা থেকে এগিয়ে যেতে পারেন না পাইলট।
মাটিতে ব্রেক কষে এ ভাবে দাঁড়িয়ে থাকাটা না হয় বোধগম্য। তা বলে প্রায় প্রতিনিয়ত শুনতে হয় ল্যান্ডিং–এর আগে ‘হোল্ড’–এ রয়েছে বিমান। আরে! বিমান তো তখন আকাশে! সেখানে ও ভাবে এক জায়গায় থিতু হয়ে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করা যায় নাকি! বৈজ্ঞানিক ভাবে তো সম্ভব নয় যে একটা বস্তু আকাশে চুপটি করে দাঁড়িয়ে আছে।
অথচ, প্রতিনিয়ত বিশ্বের প্রায় প্রতিটি ব্যস্ত বিমানবন্দরে নামার আগে ‘হোল্ড’–এ থাকতে হয় সব বিমানকে। কারণ দু’টি ল্যান্ডিং–এর মাঝে একটি টেক–অফও করে। ফলে, সেই সময়টুকু লাগে। সেই কারণে ব্যস্ত শহরে যাওয়ার আগে হিসেব করে বেশি জ্বালানি তুলে নেন পাইলটেরা। সম্প্রতি, বৃহস্পতিবার অন্ডাল থেকে কলকাতায় নামার আগে স্রেফ খারাপ আবহাওয়ার কারণে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে (Mamata Banerjee) নিয়েও হোল্ড করতে হয়েছে প্রাইভেট জেট ফ্যালকনকে। এক–আধ মিনিট নয়, প্রায় এক ঘণ্টারও বেশি।
প্রতিটি বিমানের গতিবিধি ফুটে ওঠে বিমানবন্দরের এয়ার ট্র্যাফিক কন্ট্রোল (Air Traffic Control) (এটিসি)–এর মনিটরে। রেডারের সাহায্যে সেখানে এক একটি বিমান ফুটে ওঠে এক একটি বিন্দু হিসেবে। মনিটরে ফুটে ওঠা সেই বিন্দুর সঙ্গে থাকে সেই বিমানের ফ্লাইট নম্বর, বিমানের টাইপ, তার তখনকার গতিবেগ, উচ্চতা, অবস্থানের বিস্তারিত তথ্য। সেই সব দেখেই প্রতিটি বিমানকে সুরক্ষিত জায়গা দিয়ে উড়ে যাওয়ার জন্য গাইড করেন এটিসি অফিসারেরাই।
এ বার ধরা যাক, বৃহস্পতিবারের কথাই। মুখ্যমন্ত্রীর বিমান বিকেল চারটে নাগাদ চলে এসেছিল কলকাতায় নামতে। এটিসি–র সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন পাইলট। ততক্ষণে প্রচণ্ড বৃষ্টি ও ঝড় শুরু হয়ে গিয়েছে। এটিসি জানিয়েছিল, পাইলটও বুঝেছিলেন ওই অবস্থায় নামা সম্ভব নয়। অগত্যা হোল্ড করতে হবে তাঁকে। এটিসি অফিসারেরা মনিটরে দেখে নেন, আকাশে কোন জায়গাটা সেফ বা সুরক্ষিত। অন্য বিমানের সেখানে আসার সম্ভাবনা নেই। সেই মতো, কলকাতার দক্ষিণে, একেবারে দক্ষিণ ২৪ পরগনার সোনারপুরের দিকের আকাশে পাঠিয়ে দেওয়া হয় সেই ফ্যালকন বিমানকে।
ধরা যাক বলা হলো, পাঁচ হাজার ফুট উপরে তিন কিলোমিটার এলাকা জুড়ে আপনি (পাইলট) গোল গোল করে ঘুরে বেড়াবেন। যতক্ষণ না আপনাকে রানওয়েতে নামার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে, ততক্ষণ আপনাকে ওই আকাশে ও ভাবেই এটিসি–র বলে দেওয়া উচ্চতায় গোল গোল করে ঘুরে যেতে হবে। এটিসির মনিটরে ওই বিমানের গতিবিধি ফুটে উঠবে। এটিসি অফিসারেরা মনিটরে নজরে রাখবেন যাতে কোনও ভাবেই সেই সময়ে ওই উচ্চতায় ওই আকাশে দ্বিতীয় কোনও বিমান চলে না আসে। বিমান পরিবহণের ভাষায় একেই বলে ‘হোল্ড’ করা।
এ ভাবে একই সঙ্গে কলকাতার আকাশে ১০ থেকে ১৫ এমনকী ২০টি বিমানও হোল্ড–এ রাখা যায়। সে ক্ষেত্রে প্রতিটি বিমানকে আলাদা আলাদা উচ্চতায়, আলাদা আলাদা আকাশে গোল গোল করে ঘুরে বেড়াতে হবে। এরপরে রয়েছে সিকোয়েন্স। আগে এলে আগে পাবে ভিত্তিতে ল্যান্ডিং–এর সুযোগ দেওয়া হয়। তবে, বিশেষ ক্ষেত্রে ভিআইপি বা বিমানের কোনও ইমারজেন্সি হলে তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে আগে নামিয়ে আনা হয়। ধরা যাক, দিল্লি থেকে কলকাতায় আসার সময়ে প্রথম হোল্ডে পাঠানো হয়েছে স্পাইসজেটকে। বেঙ্গালুরু থেকে ইন্ডিগোর ফ্লাইট এসেছে ঠিক তার পরে। সে–ও হোল্ডে। ইন্ডিগোর পাইলটকে জানিয়ে দেওয়া হবে আপনার সিকোয়েন্স নাম্বার টু বা দুই। রানওয়ে পরিষ্কার হলে প্রথমে স্পাইস নামবে তারপরে ইন্ডিগো।
ভারতের মধ্যে দিল্লি, মুম্বই, বেঙ্গালুরু তুলনায় ব্যস্ত বিমানবন্দর। সেখানে ফ্লাইট মুভমেন্ট বেশি। আকাশ পরিষ্কার থাকলে, রানওয়ের কাছাকাছি এলাকা থেকে দেখা যায়, একটি বিমান নামছে, আর একটু দূরে আকাশে তার পিছনে রয়েছে আরও একটি বিমান। লন্ডনের হিথরো বা সিঙ্গাপুরের চাঙ্গি, দুবাই অথবা নিউ ইয়র্কের জে এফ কেনেডি বিমানবন্দরের সামনে দাঁড়ালে মনে হবে রানওয়েতে নামার অপেক্ষায় লাইন করে আকাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে একের পর এক বিমান। যদিও চোখে দেখে দু’টি বিমান খুব কাছাকাছি রয়েছে বলে মনে হলেও সেই সময়ে দু’টি বিমানের মধ্যে দূরত্ব থাকে বিস্তর।
ভারতের ক্ষেত্রে ল্যান্ডিংয়ের সময়ে দু’টি বিমানের মধ্যে ন্যুনতম দূরত্ব রাখতে হয় চার থেকে পাঁচ নটিক্যাল মাইল। যার মানে প্রায় সাত থেকে আট কিলোমিটার। হিথরো, দুবাই বা কেনেডি বিমানবন্দরে সেই সেপারেশনটা আরও কম। দুই থেকে তিন কিলোমিটারের মধ্যে।