• ভোটকর্মীকে মারধরে প্রশ্নের মুখে EC-ও, মামলা দায়ের পুলিশের, তুঙ্গে রাজনৈতিক তরজা
    এই সময় | ২৮ মার্চ ২০২৬
  • এই সময়, হাঁসখালি ও কলকাতা: বাংলায় বিধানসভা ভোট এ বার হিংসামুক্ত করতে তারা বদ্ধপরিকর বলে বারবার জানিয়েছে দেশের নির্বাচন কমিশন (ইসি)। কিন্তু প্রথম দফার ভোটের সাড়ে তিন সপ্তাহ আগে ভোটকর্মীদের প্রশিক্ষণ চলাকালীন এক ভোটকর্মীকে মারধরের অভিযোগ উঠল। শুক্রবার ঘটনাস্থ‍ল নদিয়ার রান‍াঘাট। অভিযোগ, ভোট প্রশিক্ষণ চলাকালীন প্রোজেক্টরে যে স্লাইড দেখানোর কথা, তার আগে রাজ্য সরকারের প্রচারমূলক একটি ভিডিয়ো দেখানো হচ্ছিল। সৈকত চট্টোপাধ্যায় নামে পেশায় শিক্ষক এক ভোটকর্মী এতে আদর্শ নির্বাচনী বিধি (এমসিসি) ভঙ্গের অভিযোগ তুলে সরব হন। সেই সময়ে খোদ হাঁসখালির বিডিও–র উপস্থিতিতে তাঁর অফিসের কয়েকজন কর্মী সৈকতকে মারধর করেন বলে অভিযোগ। তাঁর মাথা ফেটে রক্ত ঝরতে দেখা যায়। বিডিও মারধরের অভিযোগ উড়িয়ে দিলেও পুলিশ এই ঘটনায় মামলা দায়ের করে তদন্ত শুরু করেছে। ঘটনায় রাজ্য পুলিশের ডিজির কাছে রিপোর্ট তলব করেছে কমিশন।

    নিজে এ দিনের ঘটনা পরম্পরায় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ‘ভোটকর্মী ও বিএলও ঐক্যমঞ্চ’। যদিও এই ঘটনার প্রেক্ষিতে দু’টি মূল প্রশ্ন উঠছে কমিশনের ভূমিকা নিয়ে। প্রথম— একটি স্কুলে ভোটকর্মীদের প্রশিক্ষণ চলাকালীন যদি একজন ভোটকর্মীকে মারধরের অভিযোগ ওঠে, তা হলে ভোটের দিন যত এগোবে, তত উত্তেজনার আবহ চড়তে থাকলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হবে কী ভাবে? এবং দ্বিতীয়— ভোটকর্মীদের প্রশিক্ষণের ম্যানুয়াল তো ঠিক করে দেওয়ার কথা কমিশনেরই এবং সংশ্লিষ্ট জেলাশাসক তথা জে‍লা নির্বাচনী আধিকারিকরা (ডিইও) মূলত এই বিষয়গুলির তত্ত্বাবধানের দায়িত্বে থাকেন। তা হলে কী ভাবে এই ধরনের প্রচারমূলক ভিডিয়ো ট্রেনিং ম্যানুয়ালে ঢুকে পড়ল সকলের চোখ এড়িয়ে? রাজ্যের অন্য যে সব জায়গায় ভোটকর্মীদের প্রশিক্ষণ চলছে, সেখানেও ম্যানুয়াল কি পরীক্ষা করে নেওয়া হচ্ছে? রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক (সিইও) মনোজ আগরওয়াল অবশ্য বলেন, ‘দু’জনের নামে এফআইআর হয়েছে। তাদের গ্রেপ্তার করতে বলা হয়েছে। ডিজিপি প্রাথমিক রিপোর্ট দিয়েছেন। সবটাই খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’

    কী ভাবে এই গোলমালের সূত্রপাত?

    রানাঘাট–১ ব্লকের দেবনাথ ইনস্টিটিউট ফর বয়েজ় স্কুলে প্রশিক্ষণ চলছিল ভোটকর্মীদের। সৈকত এবং তাঁর কয়েক জন সহকর্মীর দাবি, প্রশিক্ষণের শুরুতে প্রোজেক্টরের মাধ্যমে রাজ্য সরকারের উন্নয়নমূলক কাজ এবং দিঘায় জগন্নাথ মন্দির নির্মাণ সংক্রান্ত একটি ভিডিয়ো দেখানো হচ্ছিল। সৈকতের কথায়, ‘আমি বলেছিলাম, এতে নির্বাচনী বিধি লঙ্ঘন হচ্ছে। তখন তিন-চার জন এসে বলল, বেশি বাড়াবাড়ি করিস না। বাইরে গেলে মার্ডার হয়ে যাবি। তারপরে আমাকে টেনে নিয়ে গিয়ে একটা ঘরে আটকে মারধর করে।’ তাঁর আরও দাবি, হামলাকারীরা প্রকৃতই সরকারি কর্মী কি না, সে নিয়ে তাঁর সন্দেহ রয়েছে। তিনি পরিচয়পত্র দেখতে চেয়েছিলেন। এমসিসি লঙ্ঘনের অভিযোগ ও অভিযুক্তদের পরিচয়পত্র দেখতে চাওয়াতেই তাঁকে মারধর করা হয়। মারধরে বিডিও নিজেও সামিল হন বলে দাবি সৈকতের। প্রশিক্ষণ শিবিরে উপস্থিত সৈকতের কয়েক জন সহকর্মীও এই ঘটনার প্রতিবাদ জানান। গন্ডগোলের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যায় পুলিশও।

    প্রশিক্ষণকেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা হাঁসখালির বিডিও সায়ন্তন ভট্টাচার্য অবশ্য অভিযোগ উড়িয়ে পাল্টা দাবি করেন, ‘ওই শিক্ষক (সৈকত) প্রথম থেকেই গোলমাল পাকানোর চেষ্টা করছিলেন। এমনকী আমার কাছেও আইকার্ড (পরিচয়পত্র) দেখতে চান। যাঁরা প্রোজেক্টর বা সিসিটিভির কাজ করেন, তাঁদের তো সরকারি পরিচয়পত্র থাকে না। আমার কর্মীদের সঙ্গে উনি দুর্ব্যবহার করেছেন। ধাক্কাধাক্কি করেন। সম্ভবত, সেই সময়ে পড়ে গিয়ে ওঁর মাথা ফেটেছে।’ সৈকতের মানসিক সুস্থতা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেন বিডিও। তবে কী ভাবে প্রোজেক্টরে সরকারি প্রচারমূলক ভিডিয়ো চলল, তার ব্যাখ্যা অবশ্য বিডিও দেননি। স্বাভাবিক ভাবেই এ দিনের ঘটনাকে হাতিয়ার করে তৃণমূলকে আক্রমণ শাণিয়েছে বিজেপি। বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী সামাজিক মাধ্যমে এই ঘটনার ভিডিয়ো পোস্ট করেছেন।

    রানাঘাটের বিজেপি সাংসদ জগন্নাথ সরকার বলেন, ‘উনি এক জন প্রাথমিক শিক্ষক এবং বিজেপি কর্মী। তাঁর উপরে অমানবিক অত্যাচার করা হয়েছে বহিরাগত গুন্ডাদের দিয়ে। প্রশিক্ষণের শুরুতে প্রোজেক্টর স্ক্রিনে মুখ্যমন্ত্রীর ছবি-সহ বিজ্ঞাপন দেখানো হচ্ছিল। এর প্রতিবাদ করায় হামলা চালানো হয়েছে।’ পাল্টা তৃণমূলের মুখপাত্র অরূপ চক্রবর্তী বলেন, ‘এই ঘটনাটা অতিরঞ্জিত। ওই ব্যক্তি আগে সিপিএমের কর্মচারী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, পরে বাম ছেড়ে রাম শিবিরে যুক্ত হয়েছেন। জগন্নাথ সরকারকে উনি উত্তরীয় পরাচ্ছেন, সেই ছবিও সামনে এসেছে।’

    কিন্তু কমিশনের প্রশিক্ষণে কী ভাবে রাজ্য সরকারের ভিডিয়ো চলে এল? অরূপের ব্যাখ্যা, ‘যেখানে প্রশিক্ষণ হচ্ছিল, সেটা রাজ্য সরকারেরই অফিস। সেখানে কম্পিউটারের ফোল্ডারে রাজ্য সরকারের অনুষ্ঠান বা কর্মসূচির ভিডিয়ো থাকবে, তাতে অস্বাভাবিক কী আছে? এগুলো সবই পরিকল্পনামাফিক ভাবে অশান্তি ছড়ানোর চেষ্টা।’ এই ঘটনায় উদ্বিগ্ন ভোটকর্মীদের সংগঠনের পক্ষে স্বপন মণ্ডলের বক্তব্য, ‘কমিশনের প্রশিক্ষণ শিবিরে এই ধরনের ছবি দেখানো আদর্শ আচরণবিধির পরিপন্থী। স্বাভাবিক ভাবে ওই ভোটকর্মী তার প্রতিবাদ করেন। তার জন্য তাঁর উপরে আক্রমণ চালানো হয়েছে, বিডিও–র উপস্থিতিতে খুনের হুমকিও দেওয়া হয়। এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত সবার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছি। এই ধরনের ঘটনা যাতে আর না ঘটে, তা কমিশনকেই নিশ্চিত করতে হবে।’

  • Link to this news (এই সময়)