• রাজনীতির ময়দানে মিলবে ন্যায়বিচার? মানেন না নির্ভয়ার মা
    এই সময় | ২৮ মার্চ ২০২৬
  • সুদেষ্ণা ঘোষাল, নয়াদিল্লি

    এক মা বলছেন, দোরে দোরে হত্যে দিয়েও মেয়ের ধর্ষণ–খুনে ন্যায়বিচার পাননি। তাই বাধ্য হয়েই এ বার ভোটের ময়দানে প্রার্থী হয়েছেন। প্রায় দেড় দশক আগে আর এক মা হারিয়েছিলেন তাঁর মেয়েকে। দিল্লিতে নির্ভয়ার গণধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় উত্তাল হয়েছিল দেশ। ওই ঘটনায় চার জনের ফাঁসির সাজা দিয়েছে আদালত। সেই নির্ভয়ার মায়ের সংশয়ী প্রশ্ন, রাজনীতির লড়াইয়ে নেমে পথ হারাবে না তো আরজি করের নির্যাতিতার মায়ের ন্যায়বিচারের লড়াই? অভয়ার মায়ের ভোটযুদ্ধের ময়দানে নামার বিষয়টির সঙ্গে সহমত হতে পারছেন না তিনি।

    আরজি করের নির্যাতিতার মা শুক্রবার থেকে পানিহাটিতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রচারে নেমেছেন। তখন পানিহাটি থেকে প্রায় ১৫০০ কিলোমিটার দূরে বসে নির্ভয়ার মা আশা দেবী ‘এই সময়’–এর কাছ থেকেই জানতে পারেন ভোটযুদ্ধে প্রার্থী হয়েছেন অভয়ার মা। খানিক থমকে গিয়ে তিনি বলেন, ‘এটা ওঁর ব্যক্তিগত ভাবনা এবং সিদ্ধান্ত৷ তবে আমার মনে হয়, কোনও একটি রাজনৈতিক দলের প্রার্থী হিসেবে ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করে উনি তৃণমূল স্তরে লাগাতার লড়াই চালিয়ে গিয়ে মেয়ের জন্য বিচার চাইলে ভালো করতেন৷’ তাঁর সংযোজন, ‘দিল্লিতে কয়েক মাস আগে ওঁর সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল৷ সেই সময়েও ওঁকে বলেছিলাম, লাগাতার লড়াই চালিয়ে যেতে হবে৷ হাল ছাড়লে বা ভেঙে পড়লে হবে না৷ আদালতে তারিখ পে তারিখ আসবে৷ প্রতি মুহূর্তে মনে হবে সব শেষ হয়ে যাচ্ছে, আর হয়তো বিচার পাব না৷ তারপরেও হাল ছাড়লে হবে না৷’ ‘উম্মিদ পে দুনিয়া কায়েম হ্যায়— সব সময়ে এটা মাথায় রেখেই লড়াই জারি রাখতে হবে’— মনে করিয়ে দেন আশা দেবী। সেই সঙ্গে সংশয়ের সুরও শোনা যায় তাঁর গলায়— ‘ভোটে লড়াই করে উনি (অভয়ার মা) ন্যায়বিচার আদায় করতে পারবেন কি? আমার মুশকিল মনে হচ্ছে৷’

    কেন তাঁর এই অবস্থান?

    অভয়ার মায়ের মতো তাঁর জীবনেও বেশ কয়েকবার ভোটে লড়ার অফার এসেছিল বলে নিজেই জানিয়েছেন নির্ভয়ার মা৷ তাঁর কথায়, ‘আমাকে একটা সময়ে সব রাজনৈতিক দল ভোটে লড়ার জন্য জোরাজুরি করছিল৷ আমার বাড়িতে চলে আসতেন নেতারা৷ আমি তাঁদের প্রস্তাব গ্রহণ করিনি৷ নিজের মন শক্ত করে লড়াই চালিয়ে গিয়েছি৷ তার পরেই ঈশ্বরের কৃপায় আমি ন্যায়বিচার পেয়েছি৷ আমার মেয়ের হত্যাকারীদের চরম সাজা হয়েছে৷ রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি হিসেবে ভোটে লড়াই করে আমি মেয়ের হত্যাকারীদের সাজা দিতে পারতাম বলে মনে হয় না৷’

    আরজি করের ধর্ষণ–খুনের মামলায় শুধুমাত্র সঞ্জয় রায়কে দোষী সাব্যস্ত করেছে আদালত। তাঁর আমৃত্যু কারাদণ্ডের সাজা হয়েছে। কিন্তু অভয়ার মা ও বাবার দাবি, এই ঘটনার পিছনে আরও অনেকে জড়িত। সিবিআই–ও সেই অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করছে না। তাই ন্যায়বিচার পেতেই তিনি পদ্মফুলের প্রার্থী হয়ে ভোটে দাঁড়াচ্ছেন। এ দিন তাঁর প্রচার চলাকালীন অনেক মহিলাকে এগিয়ে এসে তাঁকে জড়িয়ে কাঁদতে দেখা গিয়েছে। আবার কেউ কেউ প্রশ্ন তুলছেন, ভোটযুদ্ধে নামাটা কি শুধুই মেয়ের ন্যায়বিচারের জন্য? অভয়ার মায়ের বিশ্বাস, ‘পানিহাটির মানুষ সঙ্গে থাকলে বিচার আমি পাবই।’ কিন্তু ভোটযুদ্ধে একটা জয় বা পরাজয় কি ন্যায়বিচার এনে দেবে অভয়ার পরিবারকে? অভয়ার পরিণতি যাতে আর কারও না–হয়, তা নিশ্চিত করতে কি আইন কঠোরতর হবে?

    নির্ভয়ার মা আশা দেবীর কথায়, ‘কেন্দ্রীয় সরকারের উদ্যোগে তৈরি নির্ভয়া ফান্ডের অর্থ সঠিক ভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে না৷ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ফাস্ট ট্র্যাক কোর্ট গঠন হচ্ছে না, থানাগুলির আধুনিকীকরণ হচ্ছে না, ফরেন্সিক ল্যাবের সার্বিক পরিকাঠামোর উন্নয়ন হচ্ছে না৷ এই ভাবে চললে অপরাধীরা ক্রমেই শক্তিশালী হবে৷ মহিলাদের উপরে অত্যাচার থামবে না৷ ন্যায়বিচারও বিলম্বিত হবে৷’

    এক সময়ে রিজওয়ানুর রহমানের মৃত্যুর ঘটনায় বিচার চেয়ে যে আন্দোলন হয়েছিল, তাতে অন্যতম শরিক ছিলেন সমাজকর্মী সুজাত ভদ্র। রিজওয়ানুরের দাদা এখন তৃণমূল বিধায়ক। যদিও এত বছরেও সেই মামলার বিচার শেষ হয়নি। অভয়ার মায়ের ভোটে দাঁড়ানো নিয়ে সুজাত এ দিন‍ বলেন, ‘ন্যায়বিচার কিন্তু খাতায়কলমে একটা হয়েছে। একজন দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। তিনি জেলে আছেন। সেই মামলাতে একাধিকবার অভয়ার পরিবার সাক্ষ্য দিয়েছেন।’ বিজেপি শাসিত উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশের প্রসঙ্গ টেনে তাঁর কটাক্ষ, ‘এখন যে দলের হয়ে উনি (অভয়ার মা) ভোটে লড়াই করছেন, তারা তো প্রকাশ্যে ধর্ষকদের মাল্যদান করে। যদি জিতে বিধায়ক হন, তাতেই বা কী যাবে আসবে?’ যদিও আর এক প্রবীণ শিক্ষাবিদ তথা সমাজকর্মী মীরাতুন নাহারের কথায়, ‘নির্ভয়ার মায়ের অবস্থানকে আমি সমর্থন করি। আবার নিহত চিকিৎসকের মা যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, সেটা নেওয়ার স্বাধীনতাও তাঁদের আছে। তবে আজকের রাজনৈতিক পরিস্থিতি কোন তলানিতে গিয়েছে সে সম্পর্কে আশা করি ওই নিহত চিকিৎসকের মা-বাবা জানেন। তাই মোহগ্রস্ত হয়ে কোনও সিদ্ধান্ত নিলেন কি না, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।’

    বিজেপি নেতৃত্ব অবশ্য মনে করেন, ভোটযুদ্ধে জিতেই ন্যায়বিচার পেতে পারেন অভয়ার মা। কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার বলেন, ‘কে ভোটে দাঁড়াবেন বা দাঁড়াবেন না, সেটা তাঁর ব্যক্তিগত বিষয়। এ বিষয়ে কারও মন্তব্য না–করাই ভালো। বিচারের দৃষ্টিভঙ্গি এক একজন মানুষের কাছে এক একরকম। যে বিধায়ক পোস্ট মর্টেমের আগেই অভয়ার মৃতদেহ সৎকারের তোড়জোড় করেছিলেন, ভোটে তাঁকে হারানোটাও তো এক ধরনের বিচারই।’ রাজ্যের বিদায়ী শিল্পমন্ত্রী শশী পাঁজার পাল্টা যুক্তি, ‘আমরা অভয়ার পরিবারের প্রতি সমবেদনাশীল। আমরা কখনও তাঁদের প্রতি কোনও বিরূপ মন্তব্য করব না। কলকাতা পুলিশ–সুপ্রিম কোর্ট মনিটর্ড সিবিআই তদন্তে তাঁর ভরসা নেই। অথচ বিজেপির উপরে ওঁর ভরসা আছে বলে উনি ভোটে প্রার্থী হয়েছেন! কিন্তু বিজেপি ও বিচার এটা অত্যন্ত পরস্পর বিরোধী।’ সিপিএম নেত্রী মধুজা সেন রায়ের কথায়, ‘নির্ভয়া এবং অভয়ার মা নিজেদের মতো অবস্থান নিয়েছেন। দু’জনেরই সেই অধিকার আছে। আমরা বামপন্থীরা অভয়াদের বিচারের জন্য লড়ছি। সেই লড়াইটা বিজেপি এবং তৃণমূল উভয়েরই বিরুদ্ধে।’

  • Link to this news (এই সময়)