• বৃদ্ধাশ্রম থেকে নিখোঁজ, জানতেনই না কর্তৃপক্ষ! প্রশ্ন পরিকাঠামো নিয়ে
    এই সময় | ২৮ মার্চ ২০২৬
  • অর্পিতা হাজরা

    তাঁদের কারও ছেলে বিদেশে মোটা মাইনের চাকরি করেন। কারও মেয়ের বিয়ে হয়েছে বেঙ্গালুরুতে। কেউ আবার বিয়ে করেননি। খাঁ খাঁ বাড়িতে বৃদ্ধ বয়সে নিঃসঙ্গ জীবন কাটানো দুর্বিসহ হয়ে পড়ছিল। তাই তাঁদের সকলের জীবনবৃত্ত এসে মিলেছে ‘বৃদ্ধাশ্রম’–এ। কিন্তু বাড়ি ছেড়ে আদৌ কি সেখানে এই প্রবীণরা নিরাপদে রয়েছেন–এই প্রশ্নই ছুড়ে দিচ্ছে চলতি বছরের জানুয়ারির একটি ঘটনা।

    ১ জানুয়ারি, গড়িয়া মেট্রো স্টেশনের বাইরে থেকে বছর আশির বৃদ্ধাকে অসহায় অবস্থায় উদ্ধার করে পঞ্চসায়র থানার পুলিশ। বৃদ্ধার পরিচয় ও ঠিকানা জানতে তদন্ত নামতেই পুলিশ জানতে পারে, ওই বৃদ্ধা সুতৃপ্তি দাস স্কিৎজ়োফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত। তাঁকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখেছিল পরিবার। কিন্তু সেখান থেকে তিনি নিখোঁজ হয়ে যান। সে খবর বৃদ্ধাশ্রম কর্তৃপক্ষ পরিবারকে জানায়নি। পরে পুলিশ বৃদ্ধাকে তাঁর পরিবারের কাছে পৌঁছে দিলে বিষয়টি তাঁরা জানতে পারেন।

    বৃদ্ধার বৌদি সীমা দাস জানিয়েছেন, তাঁর বয়সও সত্তর পেরিয়েছে। স্বামীও অসুস্থ। তাই ননদ ও স্বামীকে এক সঙ্গে দেখভাল করা তাঁর সম্ভব হচ্ছিল না। পেনশনের টাকা খরচ করেই অসুস্থ ননদকে তিনি পূর্ব যাদবপুরের একটি বৃদ্ধাশ্রমে রেখেছিলেন। বৃদ্ধাশ্রমটি চার–পাঁচজন আবাসিককে নিয়ে ভাড়াবাড়িতে চলত। পরবর্তীতে আয়ার অভাবে ওই বাড়ি থেকে আবাসিকদের নিজের বাড়িতে নিয়ে আসেন মালিক। কিন্তু তাঁরা ঠিকমতো দেখভাল করতে না পারায় ওই আশ্রমের মালিকই পঞ্চসায়রের আরেকটি বৃদ্ধাশ্রমে ননদকে পাঠিয়ে দেয়।

    সীমা বলেন,‘সুতৃপ্তিকে পঞ্চসায়ের থানা পুলিশ বাড়িতে নিয়ে আসার পরে আমরা ঘটনার কথা জানতে পারি। আমরা ভীষণ অবাক হয়েছিলাম। পরবর্তীতে ওই বৃদ্ধাশ্রম ভালোভাবে ননদকে রাখার আশ্বাস দিলে আর আমরা অভিযোগ দায়ের করিনি।’

    অভিযুক্ত বৃদ্ধাশ্রমের মালিক মন্টু মণ্ডল বলেন,‘ঘটনার সময়ে আগের বৃদ্ধাশ্রম ওই বৃদ্ধা রোগ সম্পর্কে কোনও তথ্য দেয়নি। সে কারণে ওই বৃদ্ধাকে অন্য আবাসিকদের সঙ্গে রাখা হয়েছিল। স্কিৎজ়োফ্রেনিক জানলে আলাদাভাবে রাখতাম। এখন তিনি ভালোভাবে এখানে আছেন।’ তবে এই ঘটনা সামনে আসতেই বৃদ্ধাশ্রমগুলির পরিকাঠামো নিয়ে তৎপর হয়ে ওঠে প্রশাসন। আশ্রমগুলি ঠিকঠাক সরকারি গাইড লাইন মানছে কি না তা নিয়ে খোঁজখবর নিচ্ছে তাঁরা। এ বিষয়ে রিপোর্ট তৈরি করে সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার ডিপার্টমেন্টে জমা দেবে।

    পুলিশের দাবি, শহর ও শহরতলিতে যেখানে–সেখানে বৃদ্ধাশ্রম গজিয়ে উঠছে। সেগুলোর বেশিরভাগ পরিবারের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাঁকিয়ে প্রবীণদের দায়িত্ব নিচ্ছে। কিন্তু কোনও গাইডলাইন মেনে পরিষেবা দিচ্ছে না। তাই এই ধরণের ঘটনা ঘটছে। পুলিশের এই দাবিকে উড়িয়ে দিচ্ছেন না সেবা ওল্ডেজ হোমের কর্ণধার সঞ্জীব কুমার দাসও। তাঁর দাবি, ২৯ বছর ধরে তাঁরা বৃদ্ধাশ্রম চালিয়ে আসছেন। তাঁদের উপরে বাড়ির প্রবীণদের দেখভালের দায়িত্ব দিচ্ছেন অনেকে। সেই কর্তব্য নিখুঁত পালন করছেন তাঁদের সংস্থা। কিন্তু কয়েকজন অসাধু মানুষের জন্য বৃদ্ধাশ্রমে নিয়ে মানুষের মধ্যে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হচ্ছে। এটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক।

  • Link to this news (এই সময়)