• বিপদের নাম আগাছানাশক, জলজ প্রাণী থেকে মানুষ, ক্ষতি সকলের
    এই সময় | ২৮ মার্চ ২০২৬
  • সুপ্রকাশ মণ্ডল

    প্রায় গোটা বিশ্বেই চাষের জমিতে আগাছা দমনে হরবখত ব্যবহার করা হয় আগাছানাশক। এতদিন এমন আগাছানাশককে মোটামুটি নিরাপদ বলেই মনে করা হতো। কিন্তু সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় জানা গেল, ওই জিনিস নিরাপদ তো নয়ই, উল্টে তার ব্যবহার জলজ প্রাণী এবং পরিবেশের জন্য বিপদ ডেকে আনছে। এমনকী, এর ফলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মানবসমাজ। নতুন এক আন্তর্জাতিক গবেষণা এহেন আশঙ্কাকেই সামনে এনেছে। সম্প্রতি বিখ্যাত বিজ্ঞান পত্রিকা ‘সায়েন্স ডিরেক্ট’-এ প্রকাশিত হয়েছে গবেষণাপত্রটি।

    গবেষণার কেন্দ্রে রয়েছে বহুল ব্যবহৃত আগাছানাশক গ্লুফোসিনেট অ্যামোনিয়াম (জিএলএ)। বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, এই রাসায়নিক জলে অতিমাত্রায় দ্রবণীয় হওয়ায় খুব সহজেই সেটা ফসলের মাঠ থেকে পাশের পুকুর, খাল বা নদীর জলে মিশে যায় এবং সব শেষে সমুদ্রে গিয়ে পড়ে। শুধু তা–ই নয়, প্রাকৃতিক জলাশয়ে এর স্থায়িত্বও বেশ দীর্ঘ। ফলে, কৃষিজমির আশপাশের জলাশয়ে এর উপস্থিতি থাকে দীর্ঘ সময় ধরে।

    গবেষক দলটি পরীক্ষা চালিয়েছে লাল জলচিংড়ি বা রেড সোয়াম্প ক্রেফিশের উপর। তিন সপ্তাহ বা ২১ দিন ধরে বিভিন্ন মাত্রায় এই রাসায়নিকের সংস্পর্শে রাখা হয় তাদের। তার পরে রেজ়াল্ট যা পাওয়া গিয়েছে, তা বেশ উদ্বেগজনক। তাতে দেখা গিয়েছে, গ্লুফোসিনেট সরাসরি চিংড়ির শরীরে, বিশেষ করে তাদের হেপাটোপ্যানক্রিয়াস নামে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে জমা হচ্ছে। শুধু জমা হওয়াই নয়, সেই অঙ্গের গঠনেও স্পষ্ট পরিবর্তন দেখা গিয়েছে। কী রকম? কোষের ভিতরে ফাঁপা ভাব, টিস্যুর ক্ষতি, এমনকী অঙ্গের স্বাভাবিক কার্যকারিতাও বিঘ্নিত হচ্ছে।

    এর পাশাপাশি ধরা পড়েছে আর এক বড় সমস্যা— অক্সিডেটিভ স্ট্রেস। অর্থাৎ, শরীরে ক্ষতিকর রিঅ্যাক্টিভ অক্সিজেন স্পিসিস বেড়ে যাচ্ছে, যা ডেকে আনছে কোষের ক্ষতি। এর ফলে চিংড়ির স্বাভাবিক প্রতিরোধক্ষমতা বা ইমিউনিটি দুর্বল হয়ে পড়ছে। গুরুত্বপূর্ণ ইমিউন এনজ়াইমগুলির কার্যকারিতা কমে যাচ্ছে, রক্তকণিকার সংখ্যা কমছে আর শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে ধীরে ধীরে। গবেষকরা আরও জানিয়েছেন, শরীর প্রথমে এই বিষের বিরুদ্ধে লড়াই করার চেষ্টা করে— যার ফলে কিছু প্রতিরক্ষামূলক এনজ়াইমের মাত্রা বাড়ে। কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে সেই প্রতিরোধ ভেঙে পড়ে এবং ক্ষতিই বেশি হয়। অর্থাৎ, এই রাসায়নিকের প্রভাব বড় ধরনের ক্ষতি ডেকে আনতে পারে।

    সব চেয়ে বড় প্রশ্ন— এই প্রভাব কি শুধুই জলজ প্রাণীর মধ্যে সীমাবদ্ধ? গবেষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, গ্লুফোসিনেট আসলে একটি গুরুত্বপূর্ণ এনজ়াইম, গ্লুটামাইন সিন্থেটেস-কে আটকে দেয়, যা প্রাণীর দেহে অত্যন্ত জরুরি। এর ফলে মানুষ-সহ বিভিন্ন প্রাণীর শরীরে বিষাক্ত অ্যামোনিয়ার মাত্রা বাড়তে পারে এবং স্নায়ুতন্ত্রে স্থায়ী প্রভাব ফেলে। চাষের জমি থেকে এই রাসায়নিক পুকুর-নদীতে পড়ার ফলে সেটা মাছের শরীরে ঢুকছে এবং সেই মাছকেই খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করছে মানুষ।

    বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গিয়েছে, মানুষের ক্ষেত্রে উচ্চমাত্রায় এই রাসায়নিকের সংস্পর্শে খিঁচুনি, স্মৃতিভ্রংশ এমনকী, মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট অংশে ক্ষতির মতো গুরুতর সমস্যাও দেখা দিতে পারে। অন্য কিছু প্রাণীর দেহে এর প্রভাব আরও স্পষ্ট— ইঁদুর, মাছ, ব্যাঙ বা সরীসৃপের উপর পরীক্ষায় স্নায়ুজনিত সমস্যা, হরমোনের গোলমাল, প্রজনন–ক্ষতি এমনকি ভ্রূণের বিকৃতির ঘটনাও সামনে এসেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিতে এই ধরনের আগাছানাশকের ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়। কিন্তু এর ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশে এর ছড়িয়ে পড়া এবং খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে তার প্রভাব মানুষের শরীরেও পৌঁছনোর আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

    তা হলে উপায়?

    বিজ্ঞানীদের পরামর্শ, যতদিন না এর বিকল্প নিরাপদ রাসায়নিকের সন্ধান মিলছে, এর ব্যবহার নিয়ন্ত্রিত করা হোক।

  • Link to this news (এই সময়)