তৃণমূলের গত ১৫ বছরের শাসনের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ বিজেপির। সেই সব অভিযোগের সংকলন হিসেবেই শনিবার কলকাতা থেকে ৪০ পাতার ‘চার্জশিট’ পেশ করলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ (Amit Shah)। যার নাম দেওয়া হয়েছে, ‘তৃণমূলের ১৫ বছরের অপশাসন, রক্তাক্ত পশ্চিমবঙ্গের অভিশপ্ত অধ্যায়’। কী কী রয়েছে সেই চার্জশিটে?
তৃণমূলের বিরুদ্ধে একাধিক দুর্নীতির অভিযোগ, রাজ্যের সার্বিক নিরাপত্তা, নারী সুরক্ষা, অর্থনৈতিক ও শিল্পায়নের ‘অধোগতি’, সামাজিক কাঠামোর ‘চুরমার দশা’কে তুলে ধরা হয়েছে এই চার্জশিটে। চার্জশিটে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে বাংলায় অনুপ্রবেশ সমস্যার কথা।
অনুপ্রবেশ কথা
চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলা অনুপ্রবেশের নিরাপদ চারণভূমি। গরু পাচার থেকে জাল নোটের রমরমা চলে এই অনুপ্রবেশকারীদের হাত ধরে। বিজেপির অভিযোগ, তার পরেও তৃণমূল তোষণ করে চলেছে এই অনুপ্রবেশকারীদের। শুধুমাত্র ভোটব্যাঙ্ক সুরক্ষিত রাখতেই এই পদক্ষেপ বাংলার শাসকদলের।
অনুপ্রবেশ-প্রসঙ্গে বার বারই তৃণমূল প্রশ্ন তুলেছে BSF-এর ভূমিকা নিয়ে। অমিত শাহ এ দিন সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে বলেন, ‘BSF তখনই আটকাতে পারে, যখন বর্ডারে কাঁটাতার লাগানোর জন্য আমাদের ভূমি দেবেন। ৬০০ কিলোমিটার কাঁটাতার লাগানো যায়নি। আমাদের হোম সেক্রেটারি পর্যন্ত এসে আপনার সঙ্গে দেখা করে গিয়েছে। আমি নিজে আপনার অফিসে দেখা করে গিয়েছি। আমরা কোনও পলিটিকাল ইগো রাখিনি। আপনি জমি দেননি। কারণ, অনুপ্রবেশকারীদের ভোটব্যাঙ্ক। কোনও ব্যাপার নয় মমতাদিদি। আপনার হাতে খুবই কম সময় আছে। ৬ মে বিজেপির সরকার হবে। ৪৫ দিনের মধ্যে সব জমি যা কাঁটাতারের জন্য দরকার, তা ভারত সরকারকে বাংলার বিজেপি সরকার দেবে। আমরা অনুপ্রবেশ আটকাব।’
‘দুর্নীতি ও কেলেঙ্কারির শীর্ষে তৃণমূল’
বিজেপির চার্জশিটে দাবি করা হয়েছে, তৃণমূল একাধিক দুর্নীতির কেন্দ্রবিন্দু। চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘এই পচন শিকড় থেকে শুরু করে শীর্ষ নেতৃত্ব পর্যন্ত বিস্তৃত।’ বিজেপির অভিযোগ, কোটি কোটি টাকার কয়লা পাচার কেলেঙ্কারি, ১০,০০০ কোটি টাকার রেশন দুর্নীতি, স্কুল সার্ভিস কমিশন দুর্নীতিতে ২৬ হাজার চাকরি বাতিল, ১০০ দিনের কাজে জবকার্ড দুর্নীতি, লটারি কেলেঙ্কারি, মিডডে মিল কেলেঙ্কারি, ৪০ হাজার কোটি টাকার অধিক চিটফান্ড কেলেঙ্কারি, প্রধানমন্ত্রী গ্রামীণ সড়ক যোজনা দুর্নীতি, সীমান্তে গরু পাচার কেলেঙ্কারির মতো ঘটনায় যুক্ত তৃণমূলের লোকেরা।
‘রাজনৈতিক অপশাসন’
DA থেকে সপ্তম বেতন কমিশন চালু না হওয়া, ভোটার তালিকা সংশোধনে বাধার মতো অভিযোগ রয়েছে চার্জশিটে। উল্লেখ করা হয়েছে, ‘তৃণমূল সরকারের চূড়ান্ত উদাসীনতার জন্যই সরকারি কর্মচারীরা আজ আর্থিক ও মানসিক কষ্টের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।’
‘আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি’
চার্জশিটে বলা হয়েছে, আইনের শাসন পুরোপুরি শেষ হয়ে গিয়েছে। এখন চলছে ‘শাসকের আইন।’ রাজ্য পুলিশকে উল্লেখ করা হয়েছে ‘তৃণমূলের দলদাস’ হিসেবে। এ রাজ্যে ‘সরকারি ব্যবস্থার পতন ও প্রশাসনিক অরাজকতা চলছে বলেও উল্লেখ রয়েছে সেই চার্জশিটে।’
‘গণতন্ত্রের উপর আঘাত’
বলা হয়েছে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভাকে ‘অপশাসনের হাতিয়ার’ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। বিধানসভার কোনও স্ট্যান্ডিং কমিটি বা অন্য কোনও কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে বিরোধী দল বিজেপির কাউকে রাখা হয়নি। ভোটার তালিকা থেকে ভুয়ো, বেআইনি ভোটারদের নাম বাদ দিতে SIR চালু হলেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বার বার বাধা সৃষ্টি করেছেন, সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াকে বিলম্বিত করেছেন, তেমনই দাবি করা হয়েছে চার্জশিটে।
আরজি কর, সন্দেশখালি, পার্ক স্ট্রিট ধর্ষণ কাণ্ড, কামদুনি গণধর্ষণ, হাঁসখালি ধর্ষণের প্রসঙ্গ তুলে নারীদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। এ ছাড়াও মানব পাচার, সিন্ডিকেটের মুক্তাঞ্চল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে রাঢ় বঙ্গকে। চা শ্রমিকদের সুরক্ষা ও চা শিল্পে অবহেলা, জনবিন্যাস পরিবর্তন ও তোষণনীতি, স্বাস্থ্য-শিক্ষার অবনতির অভিযোগও তোলা হয়েছে এই চার্জশিটে।