বনগাঁয় একটি বুথে ১৮৬ জনের মধ্যে ১৮৩ নাম বাদ! উৎকণ্ঠা
আজকাল | ২৯ মার্চ ২০২৬
আজকাল ওয়েবডেস্ক: বনগাঁ দক্ষিণ বিধানসভার চাঁদপাড়া গ্রাম পঞ্চায়েতের ১৭৩ নম্বর বুথে ভোটার তালিকা নিয়ে তীব্র চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, মোট ১৮৬ জনের নাম ‘বিবেচনাধীন’-এর তালিকায় ছিল। শুক্রবার দ্বিতীয় সাপ্লিমেন্টারি তালিকা প্রকাশের পর দেখা যায়, ১৮৪ জনের নামের মীমাংসা হয়েছে, তবে এখনও দু’জনের নাম বিচারধীন অবস্থায় রয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়, যাদের নাম মীমাংসা হয়েছে সেই ১৮৪ জনের মধ্যে ১৮৩ জনের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। আর এই বাদ পড়া ভোটারদের মধ্যে অধিকাংশই মতুয়া সম্প্রদায়ের বলে অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাকে ঘিরে ইতিমধ্যেই এলাকায় চাপা উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপ ও সমস্যার সমাধানের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ায় চরম উৎকণ্ঠায় রয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের প্রশ্ন, এভাবে ভোট কেটে দিলে তাঁদের ও সন্তানদের ভবিষ্যৎ কী হবে? অনেকেই দাবি করেছেন, তাঁদের কাছে ১৯৮৪ সালের বর্ডার স্লিপ রয়েছে, আবার কারও কাছে ১৯৮৮ সালের ভোটার তালিকায় নামও আছে। সমস্ত প্রমাণপত্র দেখানোর পরও কেন তাঁদের নাম বাদ দেওয়া হল, তা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন। এলাকার বাসিন্দাদের স্পষ্ট বক্তব্য, তারা এই এলাকা ছেড়ে কোথাও যাবেন না। দীর্ঘদিন ধরে এখানে বসবাস করছেন, তাই তাঁদের নাগরিকত্ব স্বীকৃতি দিতে হবে বলেই দাবি তুলেছেন তারা।
জানা গিয়েছে, এই বুথে ১৮৬ জনের নাম বি ছিল, তার মধ্যে ১৮৩ জনের নামই বাদ চলে গিয়েছে৷ এই ঘটনায় ক্ষুব্ধ মতুয়ারা৷ তারা জানাচ্ছেন, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী শান্তনু ঠাকুর আশ্বাস দিয়েছিলেন কোনও হিন্দু মতুয়া উদ্বাস্তুদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ যাবে না৷ আমরা মন থেকে ভরসা করেছিলাম৷ তাহলে কেন আমাদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ গেল৷ এর জবাব কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকে দিতে হবে৷ ১৭৩ নম্বর বুথের ঢাকুরিয়ার বাসিন্দার দেবপ্রসাদ বালা বলেন, “আমার পরিবার যুগ যুগ ধরে ভোট দিয়ে আসছে তবু আমার নাম বাদ গেল। আমরা মতুয়া, আমাদের পাড়ার প্রায় সব লোকেরই নাম বাদ গিয়েছে৷ শান্তনু ঠাকুরের কথা বিশ্বাস করে আমরা ভুল করেছি।”
ওই এলাকার বাসিন্দা বৃদ্ধা লক্ষ্মী রানী সিংহ লস্কর বলেন, “আমি বহুদিন ধরে ভোট দিয়ে আসছি৷ এ দেশের নাগরিক বলেই ভোট দিয়েছি। বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের সুবিধা পাই। আমি ১৯৬৫ সালের বাবার কাগজ দিয়েছি, জমির কাগজ দিয়েছি তারপরেও আমার নাম কেন বাদ দেওয়া হল?”
নিরঞ্জন শীল বলেন, “আমার পরিবারের সবার নাম বাদ গিয়েছে। আমরা এখন কোথায় যাব? কী করব জানি না। আমরা তো আদি বাসিন্দা। তথাপি আমাদের সঙ্গে এমন কেন করা হলো? কার কাছে উত্তর চাইব?”
এই ঘটনা নিয়ে মহকুমা জুড়ে প্রচার শুরু করেছে তৃণমূল৷ পাল্টা বিজেপিকে আক্রমণ শুরু করেছে শাসকদল। তৃণমূলের বনগাঁ সাংগঠনিক জেলা সভাপতি বিশ্বজিৎ দাস বলেন, “বিজেপি মতুয়াদের ভোটের স্বার্থে ব্যবহার করে৷ এর আগে ’২১ সালে ’২৪ সালে এদের ভোট নিয়ে ওরা বনগাঁতে জয়লাভ করেছিল। এখন চক্রান্ত করে তাদের নামই বাদ দিয়ে দিয়েছে৷ ডিটেনশন ক্যাম্পে পাঠানোর চেষ্টা করছে৷ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যতদিন আছে এই মানুষগুলির কোনও ক্ষতি হতে দেবে না৷ কোনও সরকারি ভাতা বন্ধ হবে না।”
এই বিষয়ে বনগাঁ সাংগঠনিক জেলার বিজেপি সভাপতি বিকাশ ঘোষ বলেন, “টিএমসির চক্রান্তে করেছে বিএলওদের দিয়ে৷ সেই কারণেই অনেকের নাম বাদ যাচ্ছে৷ যাঁরা হিন্দু সনাতন মতুয়া তাঁদের ভয়ের কিছু নেই৷ তাঁদের সবার নাম উঠে যাবে৷ কীভাবে ওনাদের নাম তাড়াতাড়ি ওঠে সে বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে আমরাও কথা বলছি।”
এর আগে বাগদার পুরাতন হেলেঞ্চা এলাকায় ৪৩ জন বিবেচনাধীনের মধ্যে ৪২ জনের নাম বাদ দিয়েছিল। ফলে বনগাঁ মহকুমা জুড়েই মতুয়াদের ক্ষোভ তীব্র হচ্ছে৷ তাঁদের বক্তব্য, বিধানসভা ভোটে এর জবাব দিয়ে বিজেপিকে ভাল করে বুঝিয়ে দেবেন।
সমস্যাটি নতুন নয়, প্রথম সাপ্লিমেন্টারি তালিকা প্রকাশের পরে একই ছবি দেখা গিয়েছিল বনগাঁর মতুয়া সম্প্রদায়ের মানুষদের মধ্যে। ২৮ ফেব্রুয়ারি চূড়ান্ত ভোটার তালিকা থেকে বনগাঁ মহকুমায় প্রায় ৩৭ হাজার উদ্বাস্তু মতয়াদের নাম বাদ গিয়েছিল৷ প্রায় ৫০ হাজার মানুষ বিবেচনাধীন ছিল৷ গত সোমবার প্রথম সাপ্লিমেন্টারি ভোটার তালিকা থেকে বনগাঁ মহকুমার বহু মতুয়াদের নাম বাদ গিয়েছে বলে৷ একাধিক বুথে বিবেচনাধীন কারও নাম ওঠেনি বলে অভিযোগ উঠেছে।
মতুয়া অধ্যুষিত বাগদায় প্রায় ১৩ হাজার নাম বিবেচনাধীন ছিল৷ নতুন তালিকায় হেলেঞ্চা গ্রাম পঞ্চায়েতের মন্ডপঘাটা ১২৭ নম্বর পার্টে বিচারাধীন থাকা ৪৭ জন ভোটারের নামই চূড়ান্ত তালিকা থেকে বাদ৷ পুরাতন হেলেঞ্চার ১৩৩ নম্বর বুথে ৪৩ জন বিবেচনাধীন ছিলেন। তার মধ্যে ৪২ জনের নাম বাদ যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। যার ফলে মতুয়া উদ্বাস্তুদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে৷ স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, মহকুমায় বিবেচনাধীন তালিকায় প্রায় পঞ্চাশ হাজার ব্যক্তির নাম ছিল৷ যে তালিকা প্রকাশ হয়েছে তাতে বনগাঁ মহাকুমার বাগদায় ১৯৯৩ জনের নাম বাদ গিয়েছে ৷ বনগাঁ উত্তরে ২৬৪ জনের নাম বাদ।
এই ঘটনায় বিজেপির দিকে আঙুল তুলেছেন মতুয়া উদ্বাস্তুদের একাংশ। তাঁদের বক্তব্য, তাঁরা শুনেছিলেন রোহিঙ্গা মুসলিমদের নাম বাদ যাবে৷ কিন্তু তাঁরা দেখলেন হিন্দু মতুয়া উদ্বাস্তুদের নামই বাদ চলে গিয়েছে৷ স্থানীয় যুবক অম্বিক বিশ্বাস বলেন, “আমার বাবা-মা ঠাকুমা সবাই ২০০২ সাল থেকে ভোট দেয়৷ আমরা এখানে জন্মেছি পড়াশোনা করেছি৷ ভাই চাকরির পরীক্ষা দিচ্ছে৷ আমরা লিংক জমা দেয়ার পরেও দেখলাম আমাদের পরিবারের চারজনার নাম বাদ দিয়ে দেওয়া হল।”