• চার্জশিট সংঘাতে উত্তপ্ত রাজনীতি, শাহের নিশানায় বঙ্গের অনুপ্রবেশ, পাল্টা তৃণমূলের
    এই সময় | ২৯ মার্চ ২০২৬
  • এই সময়: ভোটযুদ্ধের আবহে ‘চার্জশিট যুদ্ধ’ বাধল তৃণমূ‍ল আর বিজেপির মধ্যে। যেখানে যুযুধা‍‍ন দু’পক্ষই একে অন্যের বিরুদ্ধে ‘চার্জশিট’ ফাইল করে বিচার চাইল জনতার আদালতে। কার ‘চার্জশিট’–এ ধার বেশি, তা অবশ্য ৪ মে বিধানসভা ভোটে জনতার রায় ঘোষণার পরেই বোঝা যাবে।

    শনিবার দুপুরে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ নিজেই কলকাতায় হাজির হয়েছিলেন তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে ‘চার্জশিট’ পেশ করতে। সেখানে অনুপ্রবেশ আর স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (এসআইআর বা সার) নিয়ে বিদ্ধ করা হয়েছে জোড়াফুলকে। শাহ ‘চার্জশিট’ পেশ করার ঘণ্টাখানেকের মধ্যে তৃণমূল ভবনে সাংবাদিক বৈঠক করে বিজেপির বিরুদ্ধে পাল্টা ‘চার্জশিট’ দাখিল করেন জোড়াফুল শিবিরের মহুয়া মৈত্র, ব্রাত্য বসু এবং কীর্তি আজ়াদ। পশ্চিম বর্ধমানের রানিগঞ্জের নির্বাচনী সভা থেকে তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও কড়া আক্রমণ করেছন বিজেপিকে। আবার এক্স হ্যান্ডলে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় লেখেন, ‘আজ এক জেলখাটা আসামি রাজ্যে এসে বাংলার বিরুদ্ধে চার্জশিট পেশ করেছেন, যা আদতে প্রতিটি বাঙালিকে অপরাধী তকমা দেওয়ার সামিল। বাঙালিদের বারবার অনুপ্রবেশকারী এবং আমাদের ভাষাকে বাংলাদেশি ডাকার ধৃষ্টতাই যেন যথেষ্ট ছিল না! ৪ মে পর্যন্ত অপেক্ষা করুন। সে দিন আসল চার্জশিট কোনও বহিরাগত নয়, বাংলার মানুষই পেশ করবে।’ তাঁর সংযোজন, ‘সেই চার্জশিট হবে বাংলা-বিরোধী দিল্লির জমিদারদের বিরুদ্ধে। বাংলার ন্যায্য পাওনা আটকে রাখা, বাংলার মনীষীদের অপমান, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের আকাশছোঁয়া দাম, ভোটারদের অধিকার কাড়ার ষড়যন্ত্র এবং বাংলায় সাম্প্রদায়িক বিষ ঢোকানোর বিরুদ্ধে এই চার্জশিট।’

    বিজেপিকে সুবিধা করে দেওয়ার জন‍্য রাজ্যে ‘সার’ প্রক্রিয়ায় নির্বাচন কমিশন বৈধ ভোটারদের বেছে বেছে তালিকা থেকে বাদ দিচ্ছে বলে তৃণমূলের অভিযোগ। এ দিন জোড়াফুলকে বিঁধে শাহ বলেন, ‘দেশের অন্যান্য রাজ্যে শান্তিপূর্ণ ভাবে এসআইআর হয়েছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যে, সুপ্রিম কোর্টকে জুডিশিয়াল অফিসার নিয়োগ করতে হয়েছে। এটি অত্যন্ত লজ্জাজনক।’ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মতে, অনুপ্রবেশকারীদের ভোটার তালিকায় রেখে দেওয়ার জন্য ‘সার’–এর বিরোধিতা করছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যয়। সংবাদিক বৈঠকে শাহের বক্তব্য, ‘কত কল–কারখানা বাং‍লা থেকে উঠে গেল, তা নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মাথাব্যথা নেই। ওঁর যত চিন্তা কতজন অনুপ্রবেশকারীর নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ল!’ তিনি এ দিন সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, তৃণমূল যতই ‘সার’–এর বিরোধিতা করুক, বাংলা থেকে অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করে দেশের বাইরে পাঠা‍নোই বিজেপির প্রধান অ্যাজেন্ডা। মমতাকে নিশানা করে শাহের প্রশ্ন, ‘এত অনুপ্রবেশকারী বাংলায় ঢুকে পড়‍ল! আপনি কি ঘুমোচ্ছিলেন?’ তৃণমূলনেত্রী অবশ্য মনে করছেন, ‘সার’–ই হলো বিজেপির মৃত্যুবাণ। এ দিন রানিগঞ্জের নির্বাচনী সভা থেকে তাঁর তোপ, ‘সব কিছুর একটা লক্ষণরেখা আছে। বিজেপি ইজ় ক্রসিং অল লিমিট। প্রথমে ৫৮ লক্ষ নাম বাদ ভোটার তা‍লিকা থেকে! তার পরে ৬০ লক্ষ লোককে লজিকাল ডিসক্রিপেন্সির তালিকায় ঢোকানো হলো। সব ভোটাদের নাম কেটে দাও!’ তাঁর সংযোজন, ‘সার হলো তোমাদের মৃত্যুবাণ, মনে রেখে দিও। এই মৃত্যুবাণই আগামী দিনে তোমাদের দেশ থেকে ক্ষমতাচ্যুত করবে।’ তবে অন্য রাজ্যে কেন ‘সার’ প্রক্রিয়ায় জুডিশিয়ারিকে হস্তক্ষেপ করতে হয়নি, শাহের এই প্রশ্নের জবাবে তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্র বলেন, ‘অন্য কোনও রাজ্যে এই ভাবে লজিকাল ডিসক্রিপেন্সি করা হয়নি। অমিত শাহ মরিয়া হয়ে বাংলা দখল করতে চাইছেন।’

    আগাগোড়াই বিজেপির অভিযোগ, রাজ্য সরকার জমি দিচ্ছে না বলে ভারত–বাংলাদেশ সীমান্তের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে কাঁটাতার দিতে পারছে না বিএসএফ। তৃণমূলের বিরুদ্ধে ‘চার্জশিট’ সেই প্রসঙ্গ উত্থাপন করে শাহের দাবি, ‘আমাদের জন্য সীমান্ত সুরক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই রাজ্যে প্রায় ৬০০ কিমি সীমান্ত এখনও অসুরক্ষিত। রাজ্য জমি না দেওয়ার কারণে সীমান্ত সুরক্ষার কাজ আটকে আছে। কিন্তু ৬ মে-র পরে বাংলায় বিজেপি সরকার গঠিত হলে তারা কেন্দ্রকে জমি দেবে। ৪৫ দিনের মধ্যে এই কাজ শুরু হবে।’ তৃণমূলও তাদের ‘চার্জশিট’–এ এর কড়া জবাব দিয়েছে। দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে নিশান‍া করে ব্রাত্য বলেন, ‘সীমান্তকে আপনি অসুরক্ষিত অবস্থায় রেখে দিয়েছেন। পহেলগামে যে পর্যটকরা নিহত হলেন, তাঁদের সুরক্ষার দায়িত্বে কে ছিলেন? দিল্লি পুলিশ আপনার নিয়ন্ত্রণে থাকা সত্ত্বে গাড়ি বোমা বিস্ফোরণ হলো কী ভাবে?’

    বিজেপি নেতারা মুখে লক্ষ লক্ষ অনুপ্রবেশকারীর বাংলায় ঘাঁটি গেড়ে থাকার দাবি করলেও ‘সার’ প্রক্রিয়ার মধ্যমে ঠিক কতজন রোহিঙ্গা বা বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীকে চিহ্নিত করা গিয়েছে, তার কো‍নও তথ্য–পরিসংখ্যান এখনও সামনে আসেনি। এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকারকে বিঁধে মহুয়ার প্রশ্ন, ‘সম্প্রতি সংসদে অমিত শাহের মন্ত্রক বলেছে গত ১০ বছরে বাংলায় সাকুল্যে সাড়ে তিন হাজার বাংলাদেশি পাওয়া গিয়েছে। তাদের বাংলাদেশে ফেরতও পাঠানো হয়েছে। তা হলে লক্ষ লক্ষ অনুপ্রবেশকারীর প্রসঙ্গ আসে কোথা থেকে?’

  • Link to this news (এই সময়)