এই সময়: রামনবমী ঘিরে মুর্শিদাবাদের রঘুনাথগঞ্জে অশান্তির নেপথ্যে যারা রয়েছে, তাদের এক জনকেও ছাড় দেওয়া হবে না বলে কড়া বার্তা দিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। গত ১৫ মার্চ ভোট ঘোষণার পরপরই নির্বাচন কমিশন রাজ্যের পুলিশ–প্রশাসনে ঢালাও বদলি করেছে। সরিয়ে দেওয়া হয়েছে রাজ্যের মুখ্যসচিব, স্বরাষ্ট্রসচিব, ডিজিপি থেকে শুরু করে বিভিন্ন জেলার ডিএম–এসপিদের। শনিবার নির্বাচনী সভা থেকে মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ, গেরুয়া শিবির যাতে দাঙ্গা–অশান্তি পাকাতে পারে, তার জন্যই এই বদলি করা হয়েছে। আর অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পর্যবেক্ষণ, রাজ্যের পুলিশ–প্রশাসনের কর্তাদের বদল করার ফলেই ধর্মীয় উত্তেজনার পরিস্থিতি এবং অশান্তির আবহ তৈরি হয়েছে। তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদকের প্রশ্ন, বাংলায় দুর্গাপুজো, কালীপুজো, ইদ, বড়দিন শান্তিতে পালিত হলে রামনবমীতে কেন অশান্তি হয়?
বাংলায় বিধানসভা ভোটের আবহে রামনবমী উপলক্ষে বৃহস্পতি ও শুক্রবার বিজেপির ছোট–বড় বিভিন্ন স্তরের নেতা গেরুয়া ঝান্ডা নিয়ে ময়দানে নেমে পড়েছিলেন। কোনও কোনও জায়গায় গেরুয়া শিবির আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে মিছিল করেছে বলেও অভিযোগ রাজ্যের শাসকদলের। রামনবমীর মিছিল ঘিরে শুক্রবার মুর্শিদাবাদের রঘুনাথগঞ্জ অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠায় এ দিন রানিগঞ্জে নির্বাচনী সভায় মুখ্যমন্ত্রী গেরুয়া ব্রিগেডকে নিশানা করে বলেন, ‘রঘুনাথগঞ্জে দোকান ভেঙেছ, লুটপাট করেছ। কারও বাড়ি ভাঙচুরের অধিকার কে দিল? দাঙ্গা করার অধিকার কে দিল? তোমরা একতরফা সব করেছ। মিছিল থেকে বেরিয়ে দোকান লুট করেছ। বাড়ি পুড়িয়েছ। আজ নয় কাল, একটাকেও ছাড়ব না।’
মুখ্যমন্ত্রীর পর্যবেক্ষণ, নির্বাচন কমিশন জেলায় জেলায় পুলিশ–প্রশাসনে যাঁদের নিয়োগ করেছে, তাঁদের কেউ কেউ সঠিক সময়ে পদক্ষেপ করেননি। এ দিন মমতা বলেন, ‘তোমরা (গেরুয়া শিবির) পরশুদিন (বৃহস্পতিবার) সিউড়িতে মিছিল করেছ। বন্দুক উঁচিয়ে মিছিল করেছ। আমি জানি না, কেন প্রশাসন পদক্ষেপ করেনি! আপনারা আমাকে দোষ দেবেন না, আমার থেকে সব (প্রশাসনিক ক্ষমতা) কেড়ে নিয়েছে! নিজেদের মতো অফিসার রিক্রুট করেছে। উকুন বাছার মতো বিজেপির লোক বেছেছে। আমরা চাই, সবাই নিরপেক্ষ ভাবে কাজ করুন। আমার হাত থেকে লোক সরিয়ে নিয়ে রঘুনাথগঞ্জে গতকাল (শুক্রবার) দাঙ্গা বিজেপি করেছে।’
অভিষেকও একই সুরে অভিযোগ করেছেন, নির্বাচন কমিশন পাইকারি হারে অফিসারদের বদল করার ফলেই রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হচ্ছে। এক্স হ্যান্ডলে শনিবার তিনি বলেছেন, ‘ভোট ঘোষণার পরেই নির্বাচন কমিশন মুখ্যসচিব, স্বরাষ্ট্রসচিব, ডিজিপি, একাধিক এডিজি, আইজি, এসপি, ডিএম এবং কলকাতার সিপি–কে বদল করেছে। এরপরেই অত্যন্ত উদ্বেগজনক ঘটনা ঘটছে। হুমকি দেওয়ার ঘটনা, দোকান লুটপাট, ধর্মের নামে উত্তেজনা বৃদ্ধি পাচ্ছে। সাধারণ মানুষকে ভুগতে হচ্ছে। আমাদের বুলডোজ়ার মডেল দরকার নেই। আমদানি করা বিদ্বেষ ও হিংসার রাজনীতি দরকার নেই।’ যদিও বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী মুর্শিদাবাদে অশান্তির জন্য তৃণমূল নেতৃত্বকেই দায়ী করেছেন। তাঁর অভিযোগ, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘তোষণের রাজনীতি’র কারণে পরিকল্পিত ভাবে রামনবমীর দিন সনাতনী ভাবাবেগে আঘাত দেওয়া হয়েছে। তৃণমূল নেতৃত্বের পাল্টা প্রশ্ন, যে রাজ্যে বারো মাসে তেরো পার্বণ রয়েছে, সেখানে কেন শুধু রামনবমীতে অশান্তি হয়?
এ দিন বীরভূমের লাভপুরের সভায় অভিষেক বলেন, ‘বিভিন্ন জায়গায় এরা রামনবমীর নামে দাঙ্গা লাগানো শুরু করেছে। রাজ্যে ১০ দিন ধরে দুর্গাপুজো হয়, কোথায় দাঙ্গা হয়? কালীপুজো হয়, কোথায় দাঙ্গার খবর পান? ইদ পালন হয়, দাঙ্গার খবর পান? বড়দিন হয় দাঙ্গার খবর পান? আসলে বিজেপি মানেই দাঙ্গাবাজ।’ সিউড়িতে বন্দুক নিয়ে কী ভাবে মিছিল হয়েছে— এ নিয়ে যেমন মমতা প্রশ্ন তুলেছেন, তেমনই অভিষেকের প্রশ্ন, মদ্যপ অবস্থায় কী ভাবে রামনবমী পালন করা যায়? অভিষেকের কথায়, ‘আপনি নিজের পাড়ায় দেখবেন কোনও সভ্য, শিক্ষিত লোক বিজেপি করে না। মদ খেয়ে রামনবমী করেছে! তরোয়াল নিয়ে রামনবমী করেছে! এই কারণে যেখানে রামমন্দির হয়েছে, সেই অযোধ্যায় বিজেপি ভোটে (লোকসভা) হেরেছে।’ মমতা ও অভিষেকের দু’জনেরই যুক্তি, মুখ্যসচিব থেকে শুরু করে জেলায় জেলায় এসপি–ডিএম বদল করার ফলে পুলিশ–প্রশাসনের খোলনলচে বদলে গিয়েছে। অনেক জায়গায় এমন অফিসার নিয়োগ করা হয়েছে, যাঁরা সেই এলাকা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নন। রাজ্যের পুলিশ–প্রশাসনের দক্ষ ওয়াকিবহাল অফিসারদের তামিলনাড়ু, কেরালায় ভোটে পর্যবেক্ষক করে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিজেপি যাতে টাকা ঢোকাতে পারে, তার জন্য এই বদলি বলে আগেই মমতা অভিযোগ করেছিলেন। রানিগঞ্জে এ দিন তৃণমূলনেত্রী বলেন, ‘প্রায় ৫০ থেকে ১০০ জন অফিসারকে তামিলনাড়ু, কেরালায় পাঠিয়েছে, যাতে এখানে টাকা ঢুকতে পারে, গুন্ডা ঢুকতে পারে, বুলডোজ়ার চলতে পারে, দাঙ্গা করতে পারে! নতুন অফিসার যাঁরা পোস্টিং পেয়েছেন, তাঁদের বলব, আপনারা রাজ্যের প্রশাসনে রয়েছেন। যদি কাজ করতে চান, ভালো করে মানুষকে দেখুন। আমাকে দেখার দরকার নেই।’