এই সময়: ‘আন্ডার অ্যাজুডিকেশন’ বা ‘বিচারাধীন’ তালিকায় থাকা ১১ জন তৃণমূল প্রার্থীর নথির নিষ্পত্তি যাতে দ্রুত করা হয়, তা নিশ্চিত করার জন্য শুক্রবারই কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতিকে ই–মেল করেছিলেন জোড়াফুল নেতৃত্ব। শুক্রবার রাতেই প্রকাশিত হয়েছে দ্বিতীয় সাপ্লিমেন্টারি তালিকা। সেই তালিকায় নাম উঠল রাজ্যের মন্ত্রী তথা উত্তর কলকাতার শ্যামপুকুর কেন্দ্রের প্রার্থী শশী পাঁজা ও বীরভূমের হাসনের তৃণমূল প্রার্থী কাজল শেখের। ‘অ্যাজুডিকেশন’ তালিকাভুক্তদের নথির নিষ্পত্তি না–হওয়া পর্যন্ত তাঁদের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যা ছিল।
রাজ্যে স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (সার) শুরু হওয়ার পর থেকে যাঁদের নাম ‘লজিকাল ডিসক্রিপেন্সি’ এবং ‘আন্ডার অ্যাজুডিকেশন’ তালিকায় চলে গিয়েছিল, তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন বিশ্বকাপজয়ী মহিলা ক্রিকেট দলের সদস্য শিলিগুড়ির রিচা ঘোষ। দ্বিতীয় সাপ্লিমেন্টারি লিস্টে তাঁর নামও উঠেছে। কলকাতা হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি ও রাজ্য ওয়াকফ বোর্ডের চেয়ারপার্সন শহিদুল্লাহ মুন্সি ও তাঁর পরিবারের সদস্যরাও শুক্রবার প্রকাশিত দ্বিতীয় সাপ্লিমেন্টারি তালিকায় ঠাঁই পেয়েছেন।
আবার দ্বিতীয় লিস্টে দক্ষিণ ২৪ পরগনার জয়নগরের প্রাক্তন সাংসদ ও এসইউসি নেতা তরুণ মণ্ডলের নাম বাদ যাওয়া নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। পেশায় চিকিৎসক ওই প্রাক্তন সাংসদ দক্ষিণ হাওড়া বিধানসভা কেন্দ্রের বাসিন্দা, সেখানকার ২৭৯ নম্বর বুথের ভোটার। তরুণ ও তাঁর স্ত্রী মহুয়া— দু’জনেরই নাম ছিল ‘অ্যাজুডিকেশন’ তালিকায়। দ্বিতীয় সাপ্লিমেন্টারি ভোটার তালিকায় স্ত্রীর নাম বৈধ ভোটার হিসেবে মান্যতা পেয়েছে। তবে ‘ডিলিট’ হয়েছে তরুণের নাম। আবার রাজ্যের মন্ত্রী তথা উত্তর দিনাজপুরের গোয়লপোখরের তৃণমূল প্রার্থী গোলাম রব্বানির নাম দ্বিতীয় সাপ্লিমেন্টারি তালিকাতেও ওঠেনি। ফলে তাঁকে পরের তালিকার জন্য আবার অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
তাৎপর্যপূর্ণ হলো, মালদার একটি পঞ্চায়েতের প্রধান, তৃণমূলের লাভলি খাতুনের নাগরিকত্ব নিয়ে কলকাতা হাইকোর্টে এর আগে মামলা হয়েছিল। যার জেরে আদালত তাঁকে বাংলাদেশি হিসেবে চিহ্নিত করার পরে তাঁকে পঞ্চায়েত প্রধানের পদ থেকে ইস্তফা দিতে হয়। ‘সার’–এর ‘অ্যাজুডিকেশন’ তালিকায় তাঁরও নাম ছিল। তবে দ্বিতীয় সাপ্লিমেন্টারি তালিকায় তাঁর নাম উঠেছে! অর্থাৎ, কমিশনের নথি অনুযায়ী, তিনি আর বাংলাদেশি নন!
শুক্রবার রাতে সাপ্লিমেন্টারি ভোটার তালিকা প্রকাশিত হওয়ার পরে শনিবার পর্যন্ত বহু বুথে তালিকা টাঙানো হয়নি। তবে প্রথমবারের চেয়ে এ বার ওয়েবসাইটে সাপ্লিমেন্টারি ভোটার তালিকার পিডিএফ খোলা নিয়ে জটিলতা অনেকটাই কেটেছে। নিষ্পত্তি হওয়া প্রায় ২১ লক্ষ নামের ভিত্তিতে দ্বিতীয় তালিকা প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে কত নাম বাদ পড়েছে, তা অবশ্য কমিশন স্পষ্ট করে জানায়নি। সূত্রের খবর, দু’টি সাপ্লিমেন্টারি তালিকায় মোট প্রায় ৩১ লক্ষ নিষ্পত্তি হওয়া ‘অ্যাজুডিকেশন’–এর নাম প্রকাশিত হলো। কমিশন সূত্রের দাবি, এর প্রায় ৪০ শতাংশের বেশি, অর্থাৎ প্রায় ১৩ লক্ষ নামই অবৈধ অর্থাৎ বাদের তালিকায়। তাঁদের ট্রাইব্যুনালের দ্বারস্থ হওয়া ছাড়া অন্য কোনও উপায় নেই। মুর্শিদাবাদের সামশেরগঞ্জ বিধানসভার ৬ নম্বর বুথে ৭০৩ জনের নাম ‘বিচারাধীন’ বা ‘অ্যাজুডিকেশন’ তালিকাভুক্ত ছিল।
দ্বিতীয় সাপ্লিমেন্টারি ভোটার তালিকা প্রকাশের পরে দেখা যায়, ৫৪১ জনের নামই বাদ গেছে। বাদ যাওয়া ভোটারদের মধ্যে অনেকেরই নাম ২০০২–এর ‘সার’ তালিকায় ছিল। আবার রঘুনাথগঞ্জের ২৩৬ নম্বর পার্টে ৬৪৫ জন ভোটার ছিলেন। এর মধ্যে ২০২ জনের নাম ‘অ্যাজুডিকেশন’ তালিকাভুক্ত হয়। দ্বিতীয় সাপ্লিমেন্টারি তালিকা প্রকাশের পরে দেখা যায়, ৮৪ জনের নামই বাদ পড়েছে। এই বুথের ভোটার, এসআই (স্কুল) তৈবুর শেখ জানান, এ বার ভোটে প্রিসাইডিং অফিসার হিসেবে ট্রেনিংয়ে ডাক পেয়েছেন তিনি। কিন্তু তাঁর নামও ‘ডিলিট’ হয়েছে।
এসইউসি–র প্রাক্তন সাংসদ তরুণ মণ্ডল ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়া নিয়ে শনিবারই রাজ্যের সিইও মনোজ আগরওয়ালের সঙ্গে দেখা করে স্মারকলিপি দিয়ে বলেন, ‘আমি সরকারি চাকরি করতাম, পেনশন পাই, সাংসদ ছিলাম। এক ডজন নথি দিয়েছি। কিন্তু উনি বললেন, এখন যা করার ট্রাইব্যুনাল করবে।’ তিনি নথি সমেত চিঠি পাঠাচ্ছেন লোকসভার অধ্যক্ষ ওম বিড়লা এবং রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুকেও। ‘ভোটকর্মী ও বিএলও ঐক্য মঞ্চে’র তরফে স্বপন মণ্ডলের প্রশ্ন, ‘২০০২-এর সার–তালিকায় নাম থাকা সত্ত্বেও বহু নাম বাদ পড়ছে কী করে? এই কেলেঙ্কারির সঙ্গে রাজ্য সরকারের একশ্রেণির অফিসার জড়িত নন তো?’