কামদুনি (Kamduni Incident) বললেই দু’টি মুখ ভেসে ওঠে। টুম্পা কয়াল আর মৌসুমী কয়াল (Mousumi Koyal)। যেন হরিহর আত্মা। একসঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আন্দোলন করেছেন। রাস্তায় পড়ে থেকেছেন। গর্জে উঠেছেন প্রতিবাদে। রবিবার বিকেলে সল্টলেকে বিজেপির (BJP) পার্টি অফিসে লকেট চট্টোপাধ্যায়ের (Locket Chatterjee) হাত ধরে সেই টুম্পা যোগ দিয়েছেন বিজেপিতে। ঠিক তখন কামদুনিতে নিজের ঘরে বসে মৌসুমী। এই সময় অনলাইন-কে ফোনে বললেন, ‘টুম্পাকে অনেক শুভেচ্ছা, অনেক অভিনন্দন। ওর ভালো হোক।’ সেই কথায় মধ্যে কোথাও যেন ঝরে পড়ল অভিমানও।
আন্দোলনের নান্দীমুখটা অবশ্য মৌসুমির হাত ধরেই হয়েছিল। সেটা ২০১৩ সাল। উত্তর ২৪ পরগনার কামদুনির এক কলেজ ছাত্রীকে অপহরণ করে দুষ্কৃতীরা। তার পরে গণধর্ষণ কর নৃশংস ভাবে খুন করা হয় তাঁকে। একটি ফাঁকা জায়গা থেকে উদ্ধার হয় ছাত্রীর দেহ।
সেই ঘটনায় উত্তাল হয়ে উঠেছিল গোটা রাজ্য। অভিযুক্তদের শাস্তির দাবিতে রাস্তায় পথে নামেন গ্রামবাসীরা। শুরু হয় বিক্ষোভ, প্রতিবাদ। এই আন্দোলনের পুরোভাগে ছিলেন এক গৃহবধূ। তিনি মৌসুমী কয়াল। তিনি দাবি তোলেন, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কামদুনিতে আসতে হবে। ১৩ দিন পথই ছিল তাঁর ঘরবাড়ি। ঠিক এই সময় থেকে মৌসুমীর হাত ধরেন টুম্পা।
এ দিন টুম্পার বিজেপিতে যোগ দিলেও, মৌসুমী রাজনীতিতে আসার কথা ভাবছেন না। ফোনে বললেন, ‘আগে কামদুনির বিচার চাই। সুপ্রিম কোর্টে মামলা চলছে। খুব শীঘ্রই শুনানির দিন পড়ে। আমরা দিল্লি যাব। এখন মাথায় শুধু এটাই ঘুরছে।’
তাঁর রাজনীতিতে আসা না আসা নির্ভর করছে সহ-আন্দোলনকারীদের উপরে। মৌসুমীর কথায়, ‘টুম্পা যোগ দিয়েছেন, সেটা তাঁর ব্যক্তিগত। কিন্তু আমি এ ভাবে রাজনীতিতে আসতে পারব না। আমরা যাঁরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আন্দোলন করেছি, তাঁরা যদি অনুমতি দেন, তখন ভেবে দেখব।’ টুম্পার সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ রয়েছে। ফোনে কথাও হয় মাঝে মধ্যে। তবে ২১ মার্ট টুম্পা যখন বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন, তখন জানতে পারেনি মৌসুমি। বললেন, ‘অন্যদের মুখে শুনেছি।’
মৌসুমী গৃহবধূ। এখন বাড়িতেই থাকেন। তবে অন্যায় দেখলে গর্জে ওঠেন। আরজি কর আন্দোলন, শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতির বিরুদ্ধেও পথে নেমেছিলেন তিনি। মৌসুমীর কথায়, ‘অন্যায় দেখলে আমি প্রতিবাদ করবই। তবে রাজনীতিকে সচেতন ভাবেই এড়িয়ে চলি। কেউ আমন্ত্রণ জানালে যাই। কিন্তু বলে রাখি, কোনও রাজনৈতিক দলের ঝান্ডা রাখবেন না।’
কয়েক দিন আগে এলাকার একটি মন্দির উদ্বোধনে গিয়েছিলেন। রামনবমীও পালন করেছেন ধুমধাম করে। টুম্পার কথায়, ‘আমি হিন্দু বাড়ির মেয়ে। হিন্দু বাড়ির বধূ। এতে অন্য কিছু খোঁজা অর্থহীন।’ তবে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর প্রশংসাও শোনা গেল তাঁর গলায়, ‘কামদুনির নির্যাতিতার পরিবারকে ন্যায়বিচার পাইয়ে দেওয়ার জন্য তিনি আমাদের পাশে রয়েছেন। সব রকম ভাবে সাহায্য করছেন।’
তা হলে কি টুম্পার মতো বিজেপিতে যোগ দেবেন মৌসুমীও? সেটা অবশ্য সময়ের উপরেই ছেড়ে দিচ্ছেন তিনি। তবে যদি বিজেপি আমন্ত্রণ জানায় তা হলে? টুম্পা বললেন, ‘চেষ্টা করব।’ তবে তৃণমূলে যোগ দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না বলেও জানিয়ে বললেন, ‘দুর্নীতিগ্রস্ত, চোরেদের দলে কোনও দিন যাব না।’
কামদুনি আন্দোলনের অন্যতম মুখগুলি এক এক করে রাজনীতিতে পা রাখছেন। টুম্পা বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন, মাস্টারমশাই প্রদীপ মুখোপাধ্যায় সিপিএমে, ভাস্কর মণ্ডলও বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন। একা পড়ে রয়েছেন মৌসুমী। কিছুটা অভিমানের সুরেই বললেন, ‘সবাই তো ছেড়ে চলে গিয়েছে। এখন আমিই একা।’ আন্দোলনের ময়দানে একাকী যোদ্ধা মৌসুমীর লড়াইটা কি ক্রমশ শক্ত হচ্ছে?