• ‘ঠিক নেই কিছুই…’, ‘কমরেড রাহুলদা’ আর নেই, এখনও অবিশ্বাসে শতরূপ-দীপ্সিতারা
    এই সময় | ৩০ মার্চ ২০২৬
  • ‘আচ্ছা, ঠিক আছে। আসলে ঠিক নেই কিছুই। ফোন করেছিলাম, দেখতে পেলে কল ব্যাক করো! ঠিক আছে?’

    সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখেছেন CPIM নেত্রী দীপ্সিতা ধর। ছোট্ট প্রতিক্রিয়া, কিন্তু তাতেই ধরা পড়েছে এক বুক আবেগ এবং অসহায়তা। সঙ্গে একটি ছবি। দীপ্সিতার সঙ্গে প্রচার গাড়িতে রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়। ২০২১ সালের ছবি। সামনে ভোট, এ বারেও হয়তো তাঁর কাছের রাহুলদাকে ডাকতেন দীপ্সিতা, তাঁর হয়ে প্রচার করার জন্য। কিন্তু আর উপায় নেই।

    ছাত্রজীবন থেকেই রাহুল ছিলেন বামপন্থী মতাদর্শে বিশ্বাসী। নিজেই বিভিন্ন সময়ে জানিয়েছিলেন তিনি। আজকের রাজনীতিতে মতাদর্শ শব্দটা ক্রমে হারিয়ে গেলেও, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সেই মতাদর্শকে আঁকড়ে ছিলেন রাহুল। তাই হয়তো তাঁর অকাল প্রয়াণের খবরে তাঁর বন্ধু তথা সহকর্মী রুদ্রনীল ঘোষ তাঁর প্রতিক্রিয়ায় জানিয়েছেন, ‘প্রাপ্তির লোভে শিরদাঁড়া বাঁকানোর মানসিকতা ছিল না’।

    সরাসরি CPIM-এর সদস্য না হলেও, CPIM তথা বাম রাজনীতির প্রতি তাঁর আস্থা প্রকাশে কখনও মিনমিন করেননি রাহুল, শাসক দলের নেতানেত্রীরা কী মনে করবেন, কিংবা টলিউডে কাজ পেতে সমস্যা হবে কিনা--- এই সকল ভাবনা তাঁর পথে অন্তরায় হয়নি। বুক বাজিয়ে গিয়েছেন বামেদের বিভিন্ন কর্মসূচিতে।

    তাঁর অকাল প্রয়াণের পরে CPIM নেতানেত্রীদের, বিশেষ করে যুব নেতানেত্রীদের অনেকেই ভেঙে পড়েছেন। তাঁদের শোকবার্তায় ধরা পড়েছে, তাঁদের কতটা ঘনিষ্ঠ ছিলেন অভিনেতা। CPIM নেতা শতরূপ ঘোষ লিখেছেন, ‘এই খবরটাও শুনতে হল রাহুলদা? ... না ফেরার দেশে ভালো থেকো।’

    সঙ্গের ছবিতে দেখা যাচ্ছে শতরূপ, সৌরভ পালোধিদের সঙ্গে দোল খেলায় মেতেছিলেন রাহুল। মুখ লাল আবিরে রঞ্জিত।

    অথচ, ২০২১ সালে শতরূপের পোস্ট করা একটি ছবিকে কেন্দ্র করেই CPIM-এর সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল রাহুলের। ওই বছরের ১৬ অগস্ট যাদবপুরে সিপিএমের শ্রমজীবী ক্যান্টিনের ৫০০ দিন উদযাপনের অনুষ্ঠানে BJP নেত্রী তথা প্রাক্তন অভিনেত্রী রূপা ভট্টাচার্য এবং সদ্য বিজেপি ছেড়ে আসা অভিনেতা অনিন্দ্যপুলক বন্দ্যোপাধ্যায়-এর সঙ্গে ছবি তুলে শেয়ার করেছিলেন শতরূপ। সেই ছবি ভাইরাল হতেই ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন রাহুল। সোশ্যাল মিডিয়ায় তিনি CPIM-এর সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা করেছিলেন।

    স্পষ্ট বলেছিলেন, ‘আমি কোনও প্রলোভন বা power-এর কারণে রাজনীতি করি না। আমার রাজনীতি একান্তই আদর্শগত। সিপিএমের মঞ্চে যদি টিকিট না পাওয়া হতাশ বিজেপি জায়গা পায় তাহলে আমি আজ এই মুহূর্ত থেকে সিপিএমের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করলাম। আমার বামপন্থা সিপিএমের মুখাপেক্ষী নয়। যে একবারের জন্যও সাম্প্রদায়িক দলের সাথে জড়িয়েছে, বিশেষত সে যদি সেলিব্রিটি হয়, তার সাথে কোনওদিন এক মঞ্চে আমি থাকব না।’

    তবে রাহুলের সেই অভিমান, সেই ক্ষোভ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। বা CPIM-এ মোহভঙ্গ হয়ে প্রতীকুর রহমানের মতো তিনি তৃণমূল কংগ্রেসের দিকেও পা বাড়াননি। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে ফের CPIM-এর যুব নেতানেত্রীদের ডাকে ফিরে এসেছিলেন CPIM প্রার্থীদের প্রচারগাড়িতে।

    এ দিন সেই ছবি পোস্ট করেছেন আরও এক CPIM-এর তরুণ নেতা ময়ূখ বিশ্বাস। শ্রীরামপুরে প্রার্থী হয়েছিলেন দীপ্সিতা। তাঁর সমর্থনেই প্রচারে এসেছিলেন রাহুল। ছবিটিতে দীপ্সিতা এবং ময়ূখের সঙ্গে হুডখোলা জিপে দেখা যাচ্ছে বাদশা মৈত্র ও রাহুলকে। সঙ্গে ময়ূখ লিখেছেন, ‘অবিশ্বাস্য! রাহুল দা .......এই তো গত লোকসভা নির্বাচনের প্রচারের সময়!’

    দীপ্সিতা, শতরূপ বা ময়ূখরা তো প্রচারের আলোয় থাকা কয়েকটা নাম। এ ছাড়াও আরও অসংখ্য তরুণ CPIM নেতা-কর্মী-সমর্থকের কাছের লোক হয়ে উঠেছিলেন রাহুল। তাঁরা সকলেই এ দিন শোকাহত। তার থেকেও বোধহয় এখনও আছেন অবিশ্বাসের জগতে। প্রিয় ‘কমরেড’ আর নেই, বিশ্বাস করাটা যে খুবই কঠিন। বঙ্গবিভূষণ বা বঙ্গভূষণের মতো সরকারি পুরস্কার পাননি রাহুল, তবে এই প্রাপ্তিটাই বা কম কী?

  • Link to this news (এই সময়)