এই সময়: একসঙ্গে ভবানীপুর এবং নন্দীগ্রাম থানার ওসি–দের বদলে দিল নির্বাচন কমিশন। রবিবার সন্ধেয় এক লপ্তে রাজ্যের ১৭৩টি থানার ওসি এবং আইসি–দের বদলির নির্দেশ জারি করে ইসি। তার মধ্যে শুধু কলকাতা পুলিশেরই ৩১টি থানা রয়েছে। শুধু পুলিশই নয়, এ দিন প্রশাসনিক স্তরেও বিপুল বদলির নির্দেশ দিয়েছে কমিশন। রবিবার ১৮টি জেলার ৮৩ জন বিডিও–কে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এঁরা সকলেই সহকারী রিটার্নিং অফিসার (এআরও) ছিলেন। এর মধ্যে রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর নির্বাচনী কেন্দ্র নন্দীগ্রাম ১ ও ৩ নম্বর ব্লকের বিডিও–রাও রয়েছেন। বস্তুত সবথেকে বেশি বদলি হয়েছে পূর্ব মেদিনীপুর জেলাতেই। এরই পাশাপাশি ভোটের ডিউটি দিতে এসে বীরভূমের সিউড়িতে তৃণমূলের পার্টি অফিসে ঢুকে নেতাকর্মীদের সঙ্গে ক্যারম খেলার জন্য সাসপেন্ড করা হয়েছে সিআরপিএফ–এর তিন জওয়ানকে।
আজ, সোমবার রাজ্যের প্রথম দফায় ১৫২টি বিধানসভা ভোটের বিজ্ঞপ্তি জারি হচ্ছে। অর্থাৎ, শুরু হচ্ছে প্রার্থীদের মনোনয়ন জমা দেওয়ার পর্ব। ঠিক তার আগেই রবিবার দু’দফায় পুলিশ ও প্রশাসনে এই বিপুল রদবদল রীতিমতো তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
প্রচারের শুরুতেই ভবানীপুরে পা রেখে সরাসরি থানায় চলে গিয়েছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর অভিযোগ ছিল, ভবানীপুর থানা থেকে ফোন করে বিজেপি–র নেতাকর্মীদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। ওসি–কে তিনি জানিয়ে এসেছিলেন, এই হুমকি চললে তিনি থানায় এসে ধর্নায় বসে যাবেন। এই প্রেক্ষাপটে ভবানীপুর থানার ওসি–র জায়গায় কলকাতা পুলিশের এসটিএফ থেকে আনা হলো সৌমিত্র বসুকে। চন্দননগর পুলিশ কমিশনারেট থেকে এনে নন্দীগ্রাম থানার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে শুভব্রত নাথকে। বদলে দেওয়া হয়েছে গিরিশ পার্ক থানার ওসি–কেও (কলকাতা পুলিশের এসসিও থেকে আনা হয়েছে সুমিতকুমার ঘোষকে)। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সভার দিন তুমুল অশান্তি হয়েছিল গিরিশ পার্কে। বদলে দেওয়া হয়েছে সম্প্রতি ভোটের প্রশিক্ষণকেন্দ্রে গোলমাল হওয়া হাঁসখালি থানার ওসি–কেও (শিয়ালদহ জিআরপি–র এসআই মনোতোষ গৌরকে আনা হয়েছে এই থানার দায়িত্বে)। এ ছাড়া উল্লেখযোগ্য বদলির তালিকায় রয়েছে কালীঘাট (গোয়েন্দা বিভাগ থেকে এখানে আনা হয়েছে উৎপলকুমার ঘোষকে), জোড়াসাঁকো (গোয়েন্দা বিভাগের সুশান্ত মণ্ডল এসেছেন এই থানায়), এন্টালি (গোয়েন্দা বিভাগ থেকে তপনকুমার মণ্ডল ওসি হয়েছেন), পোলেরহাট (আনা হয়েছে কলকাতা পুলিশের সাউথ–ইস্টার্ন ডিভিশনের শুভম গুহকে) বা ভাঙড়ের (পিটিএস থেকে এসেছেন দেবকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়) মতো থানা। এই পুলিশ অফিসারদের সঙ্গেই বদলে দেওয়া হয়েছে আটটি জেলা ও পুলিশ কমিশনারেটের গোয়ান্দা শাখার ভারপ্রাপ্ত ১১ ভারপ্রাপ্ত আধিকারিককে।
এর আগে এ দিন ৮৩ জন বিডিও–কেও বদলি করেছে কমিশন। এর মধ্যে উত্তরবঙ্গের কোচবিহার, জলপাইগুড়ি, উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুর, মালদা, মুর্শিদাবাদের মতো যে সব জেলায় প্রথম দফায় ভোট হবে, সেখানকার ব্লক ডেভেলপমেন্ট অফিসারেরা রয়েছেন, তেমনই দুই মেদিনীপুর, দুই বর্ধমান, দুই ২৪ পরগনা, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, হাওড়া, হুগলি, বীরভূম, নদিয়ার বেশ কয়েক জন বিডিও–ও রয়েছেন এই তালিকায়। এই বদলির তালিকায় সবথেকে নজর কেড়েছে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর কেন্দ্র। নন্দীগ্রাম ১ ও ৩ ব্লকের বিডিও–দের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। নন্দীগ্রাম ১–এর বর্তমান বিডিও নাজ়িরুদ্দিন সরকারের জায়গায় ইসি–র তরফে প্রস্তাব করা হয়েছে সঞ্জয় শিকদারের নাম। নন্দীগ্রাম ৩–এর বর্তমান বিডিও শুভদীপ চৌধুরীকে সরিয়ে আনা হচ্ছে দেবোত্তম সরকারকে। আগে রাজ্যের ৭৩ জন রিটার্নিং অফিসারকে (আরও) বদলি করেছিল ইসি। তার পরে এই বদলি হওয়া ৯ জেলার ১৪ জন আরও–কে আবার বদল করা হয়।
অবাধ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের লক্ষ্যে এ বার ভোটের অনেক আগেই বাংলায় কেন্দ্রীয় বাহিনী পাঠিয়েছে ইসি। উদ্দেশ্য, মানুষের মধ্যে ‘কনফিডেন্স বিল্ড আপ’ করা (আস্থাবৃদ্ধি)। ধাপে ধাপে আরও ১,৯২০ কোম্পানি বাহিনী আসবে রাজ্যে। বাহিনীর জওয়ানরা কোনও নির্দিষ্ট দল বা ব্যক্তির আতিথেয়তা নিলে বা ডিউটি না–করে অন্য কোথাও সময় কাটালে কড়া ব্যবস্থার হঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছিল ইসি। সেইমতো সিআরপিএফ, বিএসএফ–সহ বিভিন্ন আধাসামরিক বাহিনীর অফিসারেরা জওয়ানদের বিতর্ক থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। ভোটের ডিউটিতে কী করতে হবে আর কী নয় — সে বার্তাও খুব স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে জওয়ানদের।
কিন্তু যে ভিডিয়ো (যার সত্যতা যাচাই করেনি ‘এই সময়’) প্রকাশ্যে এসেছে, তাতে দেখা গিয়েছে রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের সিউড়ি শাখার পার্টি অফিসে উর্দি পরা এক সিআরপিএফ জওয়ান ক্যারম বোর্ডে ঘুঁটিতে টোকা মারছেন। তাঁর ঠিক পিছনে আরও এক জওয়ান দাঁড়িয়ে। কিছু দূরে একটি চেয়ারে বসে তৃতীয় জওয়ান। ক্যারম বোর্ড ঘিরে এবং পার্টি অফিসের অন্যত্র বেশ কয়েক জন যুবককেও দেখা গিয়েছে। নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা জওয়ানেরা কী ভাবে শাসকদলের কার্যালয়ে ঢুকে আড্ডা জমালেন, তা নিয়ে সরব হয় বিজেপি। কমিশনের নজরেও এই ভিডিয়ো আসে। অভিযোগের গুরুত্ব বুঝে তদন্ত করে তড়িঘড়ি কড়া পদক্ষেপ করল নির্বাচন কমিশন। রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক (সিইও) মনোজ আগরওয়াল এই শাস্তির কথা জানিয়েছেন।