লোকসভা নির্বাচনে জয়ের রেশ ধরেই রঘুনাথপুরে লড়ছে তৃণমূল
বর্তমান | ৩০ মার্চ ২০২৬
প্রীতেশ বসু, রঘুনাথপুর: গতবার রঘুনাথপুর আসন বিজেপি জিতেছিল মাত্র ৫,৪৩২ ভোটে। চব্বিশে লোকসভার ভোটে এই বিধানসভা কেন্দ্রে বিজেপিকে পিছনে ফেলে ৪৫৫ ভোটে এগিয়ে রয়েছে তৃণমূল। সেই রেশ ধরেই দলের সাংগঠনিক মেলবন্ধন অটুট রেখে মার্জিন বাড়াতে মরিয়া মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল।
ঢেউ খেলানো জমি এবং ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা টিলা পেরিয়ে বিস্তীর্ণ দ্বীপের মতো একটি ভাতের হোটেল। সকাল সাড়ে ১০টা। কয়েকজনকে দেখা গেল কাঠের বেঞ্চে বসে শালপাতায় গরম ভাত ডাল মেখে তৃপ্তি করে মধ্যাহ্নভোজ সারছেন। পাশে ছোটো একটি প্লেটে ডিমের কারি। তাঁরা সকলেই স্থানীয় বাসিন্দা। সামনের একটি ফ্যাক্টরিতে কাজ করেন। ১১টায় কাজে যোগ দেওয়ার আগে পেট ভোরে দুপুরের খাওয়াদাওয়া সেরে নিচ্ছেন। বললেন, কাজের জন্য এখন আর আগের মতো বাইরের রাজ্যে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ছে না। এখানেই কাজ পাওয়া যাচ্ছে। রঘুনাথপুর শিল্পতালুক নিয়ে তাঁরা বেজায় খুশি।
আবার রাস্তার ধারের এই খাবারের দোকানের ছোটো রান্না ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে হোটেলেরই দুই কর্মীকে দেখা গেল প্লাস্টিকের গ্লাসে কিছু একটা সাদা পানীয় খাচ্ছেন। প্রথমে দেখে মনে হল, তীব্র দাবদাহে দইয়ের স্বাদ ঘোলে মেটাচ্ছেন। কৌতূহল বসত জানতে চাওয়ায়, উত্তর দিলেন—‘না দাদা, এটা ঘোল নয়। এটা ভাতের মাড়। শহুরে লোকরা যাকে ফ্যান বলে ফেলে দেয় কিংবা জামাকাপড়ে মাড় দিতে কাজে লাগায়। সেটাই খাচ্ছি।’
সে আবার কী? ভাত থাকতে ফ্যান কেন?
একজন বলেন, ‘ভাতের মাড় যেমন স্বাস্থ্যের জন্য ভালো, তেমনই খিদে বাড়ায়।’
বোঝা গেল, পুরুলিয়ার মতো জেলায় একসময়ের খাদ্য সংকট এখন অতীত। রাস্তাঘাটও তেমন খারাপ নয়। পানীয় জলের সমস্যা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা গিয়েছে। কর্মসংস্থান বেড়েছে। বিদ্যুৎ সংস্থার কর্মীরা রাস্তায় বাতিস্তভ লাগানোর কাজে ব্যস্ত। অর্থাৎ, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ সুনিশ্চিত হয়েছে খরাপ্রবণ এই জেলা তথা রঘুনাথপুর বিধানসভা কেন্দ্র এলাকাতেও।
তাহলে এখানে ভোটের ইস্যুটা কী?
ইস্যু একটাই—ভোটে জেতার পরে বিজেপি বিধায়ক বিবেকানন্দ বাউরিকে সাধারণ মানুষের পাশে সেই অর্থে দেখতেই পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ। অন্যদিকে, হেরে যাওয়া সত্ত্বেও এই কেন্দ্রে রাজ্য সরকারের উন্নয়নের খতিয়ান তুলে ধরেছে তৃণমূল। পাশাপাশি বিধায়কের অনুপস্থিতির ইস্যুকেও হাতিয়ার করছে তারা।
এখানে গণেশ বাউরিকে এবারও প্রার্থী করেছে সিপিএম। তবে রঘুনাথপুর পুরসভার বোর্ড ভেঙে দেওয়াসহ একেবারে এলাকাভিত্তিক ইস্যুকে সামনে রেখে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই দিতে মাঠে নেমেছে বিজেপিও।
এই কেন্দ্রে প্রার্থী বদল করেছে বিজেপি। এবার তাঁদের মুখ মামনি বাউরি। তৃণমূল ভরসা রেখেছে ২০২১ সালের পরাজিত প্রার্থী পেশায় স্কুল শিক্ষক হাজারী বাউরির উপরেই।
কিন্তু কার পাল্লা ভারী? পুরুলিয়া জেলার এই বিধানসভা ক্ষেত্রটি বাঁকুড়া লোকসভা আসনের সাতটি বিধানসভা কেন্দ্রের একটি। এই লোকসভা আসনটি ২০২৪-এ বিজেপির হাতছাড়া হয়েছিল। সেই রেশ ধরেই রঘুনাথপুরের বাসিন্দা মিঠুন ধীবর বলেন, ‘এবার চান্স ফিফটি ফিফটি। লোকসভা ভোটের পুনরাবৃত্তি যেন না হয়ে যায়।’
সরণি মোড়ের চায়ের দোকানে মিঠুনের বাকি সাথীরা আলোচনায় যোগ দিয়ে বললেন, ‘লোকসভা ভোটে সুভাষবাবুও (ডাঃ সুভাষ সরকার) হেরে গিয়েছেন। ওঁরও নাকি দেখা মিলত না। এঁরও (বিবেকানন্দ বাউরি) একই ব্যাপার। বদলেছে (প্রার্থী বদল)। দেখা যাক কী হয়।’ তৃণমূলও এই ইস্যুকে হাতিয়ার করে জোর প্রচার চালাচ্ছে। তবে এই সমস্ত ইস্যুকে গুরুত্ব দিতে নারাজ এবারের বিজেপি প্রার্থী।