• ভোটে পক্ষপাত! জেলে যেতে হতে পারে সরকারি কর্মীদের
    এই সময় | ৩০ মার্চ ২০২৬
  • সুগত বন্দ্যোপাধ্যায়

    অবাধ ও শান্তিপূর্ণ ভোটের জন্য শুধু কেন্দ্রীয় বাহিনী, স্পেশাল অবজ়ার্ভার, পুলিশ অবজ়ার্ভার অথবা ওয়েবক্যামে নজরদারিই নয়, নির্বাচনের কাজের সঙ্গে যুক্ত সব স্তরের কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারি আধিকারিকদের আইনের পাঠ দিচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)!

    কোনও সরকারি কর্মী পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ করলে যে তাঁকে কোনও ভাবেই রেয়াত করা হবে না, সেটা কমিশন আগেই জানিয়েছিল। এও বলেছিল যে, শুধু ভোট চলাকালীন নয়, কেউ যদি মনে করেন যে ভোট মিটে গেলেই কমিশনের এক্তিয়ার শেষ এবং তিনি যা খুশি তাই করতে পারেন, তা হলে তিনি ভুল করছেন। সেই সরকারি কর্মচারী পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ বা ইচ্ছাকৃত গাফিলতি করেছেন— এটা প্রমাণিত হলে ভোট মেটার পরেও তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। এ বার জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের (আরপি অ্যাক্ট) ধারা স্মরণ করিয়ে ভোটের কাজে যুক্ত সব স্তরের সরকারি কর্মীকে কমিশন জানিয়ে দিল, শুধু বিভাগীয় শাস্তি নয়, অভিযোগ প্রমাণ হলে সংশ্লিষ্ট কর্মীকে জেলেও যেতে হতে পারে। হতে পারে জরিমানাও।

    কমিশনের সাফ কথা, স্বচ্ছ ও হিংসা–রক্তপাতহীন ভোট করতে প্রতিটি সরকারি কর্মীকেই নিরপেক্ষ ভাবে কাজ করতে হবে, কোনও ভোটার কোনও অভিযোগ জানালে তা খুঁটিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করতে হবে এবং সেটা না–করলে তা আইন লঙ্ঘন বলে ধরে নেওয়া হবে। কারণ, নির্বাচন প্রক্রিয়া চলাকালীন এই সব সরকারি কর্মচারী কমিশনেরই নিয়ন্ত্রণাধীন। এ বার ভোট প্রক্রিয়া শুরুর আগেই স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (সার) চলাকালীন গাফিলতির অভিযোগে রাজ্যের অনেক বিএলও, এইআরও বা ইআরও স্তরের আধিকারিকের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করেছে কমিশন। শুধু তাই নয়, ‘সার’ শুরুর আগে ‘ভূতুড়ে ভোটার’ ইস্যুতেও গাফিলতি প্রমাণিত হওয়ায় দুই এইআরও, দুই ইআরও এবং এক ডেটা এন্ট্রি অপারেটরের বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তিমূলক পদক্ষেপ, সাসপেনশনের পাশাপাশি ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এই সব বিষয় স্মরণ করিয়ে কমিশন বুঝিয়ে দিয়েছে, ভোট চলাকালীনও বিন্দুমাত্র গাফিলতি বা পক্ষপাতের অভিযোগ মেনে নেওয়া হবে না। ভোটের নির্ঘণ্ট শুরুর আগেই রাজ্যের মুখ্যসচিব, স্বরাষ্ট্রসচিব, ডিজিপি, কলকাতার সিপি থেকে শুরু করে একঝাঁক পুলিশ–আমলাকে বদলি করেছে কমিশন। তবে কমিশনের বক্তব্য, শুধু বদলি নয়, আরপি অ্যাক্ট অনুযায়ী পক্ষপাতদুষ্ট সরকারি আধিকারিকদের বিরুদ্ধে কঠোরতর ব্যবস্থা নেওয়ার সংস্থান রয়েছে।

    কমিশনের এই তৎপরতা নিয়ে অবশ্য সরকারি কর্মচারীরা ভিন্নমত। ‘ভোট কর্মী ঐক্য মঞ্চে’র সাধারণ সম্পাদক স্বপন মণ্ডলের কথায়, ‘গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে ভোটকর্মীদের নিরপেক্ষ ভূমিকা নিতে হবে। এটাই স্বাভাবিক। কেন তাঁরা ভোটারদের প্রভাবিত করবেন? যদি কেউ রাজনৈতিক স্বার্থে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেন, তাঁদের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনের কঠোর শাস্তিমূলক পদক্ষেপ করাই উচিত।’ যদিও ‘শিক্ষানুরাগী ঐক্য মঞ্চে’র সাধারণ সম্পাদক কিঙ্কর অধিকারীর পাল্টা দাবি, ‘ভোটকর্মীরা নিরপেক্ষতার সঙ্গেই কাজ করেন। কখনও কখনও নির্বাচন কমিশনের মধ্যেই নিরপেক্ষতার অভাব দেখা যায়। আমরা চাই, ভোটার ও ভোটকর্মীদের নিরাপত্তা নিরপেক্ষ ভাবে সুনিশ্চিত করুক কমিশন।’

    জনপ্রতিনিধিত্ব আইনটি নতুন নয়। এ বারে নতুন হলো, কমিশন এই আইনের ১২৯ নম্বর ধারা কঠোর ভাবে প্রয়োগ করতে চায়। এই ধারা অনুযায়ী, যে কোনও রাজনৈতিক দল বা কোনও প্রার্থীর হয়ে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় যুক্ত সরকারি কর্মী ভোটারকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করলে আইন মেনে তাঁদের ছ’মাসের জেল এবং জরিমানা হতে দুটোই হতে পারে। ভোটারকে ভোট দিতে বাধা দিলে বা ভোট না দেওয়ার জন্য উৎসাহিত করলে অথবা কোনও ভোটার বাধা দেওয়ার অভিযোগ করলে তা চেপে গেলে অথবা ব্যবস্থা না–নিলেও তা পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ বলে ধরে নেওয়া যেতে পারে। অতীতেও যে এলাকায় যে দল বা প্রার্থীর জোর বেশি, সেখানে তার হয়ে ‘কাজ’ করার অভিযোগ উঠেছে সরকারি কর্মচারীদের একাংশের বিরুদ্ধে। তবে সে ভাবে কারও কঠোর শাস্তি হয়েছে, এমনটা স্মরণাতীত কালে মনে করতে পারছেন না প্রবীণ প্রশাসনিক আধিকারিকরা। এ বার সেটারই বদল চায় ইসি।

    রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক (সিইও) মনোজ আগরওয়াল এবং কমিশনের বিশেষ পর্যবেক্ষক সুব্রত গুপ্ত শনিবার ভোট প্রস্তুতি নিয়ে বৈঠকে স্পষ্ট বলেছেন, কমিশনের লক্ষ্যই হলো, অবাধ রক্তপাতহীন ও শান্তিপূর্ণ ভোট। এর আগে ‘সার’ করতে গিয়ে কমিশনকে প্রতি পদে পদে রাজ্য সরকারের একশ্রেণির কর্মীদের অসহযোগিতায় বিপাকে পড়তে হয়েছে। এ বার সেটা হবে না। শুধু রাজ্য বা কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারী নন, পর্যবেক্ষক, মাইক্রো অবজ়ার্ভার, কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানদেরও এই বার্তা দেওয়া হয়েছে। কমিশনের ভাষায়, ‘কেউ যদি গোলমাল পাকানোর চেষ্টা করেন, তিনি নিজ দায়িত্বে সব কিছু করবেন। অভিযোগ পাওয়া মাত্র আইন মেনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

    এর বাইরেও কমিশনের সিদ্ধান্ত, প্রত্যেক বুথের বাইরে সংশ্লিষ্ট বুথ সংক্রান্ত তথ্য টাঙিয়ে রাখা হবে। ভোটকক্ষে প্রবেশের মুখে মোতায়েন থাকবেন কেন্দ্রীয় বাহিনীর এক জন জওয়ান। বুথের মধ্যে শুধুমাত্র প্রিসাইডিং অফিসারের কাছে মোবাইল থাকবে। সেই মোবাইলে প্রয়োজনে সেক্টর অফিস থেকে নির্বাচন কমিশনের আধিকারিকরা যোগাযোগ করতে পারবেন। বুথে আর কোনও ভোটকর্মীর কাছে মোবাইল থাকবে না। ভোটারকেও মোবাইল জমা রেখে বুথে প্রবেশ করতে হবে। কমিশন আশ্বস্ত করেছে, কোথাও কোনও অসুবিধা হলে সঙ্গে সঙ্গে পদক্ষেপ করা হবে। ভোটের লাইনে ভোটারদের পরিচয়পত্র যাচাইয়ের কাজ করবেন বুথ লেভেল অফিসারেরা।

    এ ছাড়াও প্রতিটি বুথ নজরদারিতে এ বার কৃত্রিম মেধা (এআই প্রযুক্তি) ব্যবহার করা হবে। বুথের ভিতরে ও বাইেরে থাকবে ৩৬০ ডিগ্রি নজরদারি চালানোর ক্যামেরা। বুথের মধ্যে কোনও উত্তেজনা তৈরি হলে সঙ্গে সঙ্গে খবর যাবে সেক্টর অফিস ও কন্ট্রোলরুমের কাছে। সেই মতো কুইক রেসপন্স টিম সক্রিয় হবে। কিন্তু বুথের দায়িত্বে থাকা প্রিসাইডিং অফিসার বা কেন্দ্রীয় জওয়ান বা বাইরে থাকা পুলিশ কারও কাছে ভোটারদের বাধাদান বা প্রভাবিত করার অভিযোগ এলে যদি তাঁরা ব্যবস্থা না–নেন বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে না–জানান, তা হলেই সংশ্লিষ্ট আধিকারিককে শাস্তির মুখে পড়তে হতে পারে।

  • Link to this news (এই সময়)