• ‘অনিন্দ্যদা আমি ঠিক লিখে ফেলব…’, লেখক অরুণোদয়কে নিয়ে স্মৃতিচারণা অনিন্দ্যর
    প্রতিদিন | ৩০ মার্চ ২০২৬
  • থিয়েটার, সিনেমা, লেখালেখি, বাংলা সংস্কৃতি জগতের ক্ষণজন্মা বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়। মাত্র বিয়াল্লিশেই চিরঘুমের দেশে পাড়ি দিলেন অভিনেতা। অথচ জীবদ্দশার চার দশকে বিভিন্ন মাধ্যমে যেভাবে নিজের বহুমুখী সত্ত্বার পরিচয় করিয়েছেন রাহুল, তার প্রয়াণে আজ সেসব ‘স্মৃতি’ই জীবন্ত হয়ে উঠেছে। ‘রোববার’-এর হাত ধরেই লেখক হিসেবে পথচলা থেকে ‘সাবালক’ হয়ে ওঠা তাঁর। অভিনেতা থেকে লেখক ‘অরুণোদয়’ হয়ে ওঠার এই সফরের শুরুয়াত কীভাবে? অভিনেতার প্রয়াণে স্মৃতির মণিকোঠা থেকে সেসব কথাই সংবাদ প্রতিদিন-এর কাছে তুলে ধরলেন অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়।

    স্মৃতির পাতা উলটে ‘রোববার’-এর সম্পাদক তথা গায়ক-পরিচালক জানালেন, “অভিনেতা রাহুল বন্দ্যোপাধ্যায়কে যতটা চিনতাম, তার থেকে আরও বেশি চিনতাম লেখক অরুণোদয়কে। আমার মনে আছে, বেশ কিছু বছর আগে ওঁর প্রথম লেখার কথা। ছাপার অক্ষরে ওঁর নাম। সেটায় ও মূলত বেড়ে ওঠার গল্প লিখেছিল। যে কলোনি থেকে ও বড় হয়েছে, সেই বিজয়গড় কলোনির গল্প নিয়ে। হেডিংটা আমি করেছিলাম- ‘কলোনি থেকে রাজপথ।’ সে লেখা বেরিয়েছিল সদ্য পপকর্ন-এ। তখন আমাদের পপকর্ন নতুন করে তৈরি হয়েছে। সেই লেখা থেকেই মোটামুটিভাবে ‘লেখক অরুণোদয়ে’র জন্ম। লেখাটা পড়ে আমরা বুঝেছিলাম, ওঁর লেখনীর মধ্যে যে শক্তি রয়েছে, আগামী দিনে আরও অনেক লেখা ও লিখবে।”

    ‘রোববার’-এ লেখালেখির বহু আগে থেকেই অবশ্য ভ্রাতৃসম রাহুলের সঙ্গে পরিচয় অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়ের। স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে তিনি ফিরে গেলেন অভিনেতা রাহুলের গোড়ার দিনগুলিতে। “যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে চন্দ্রবিন্দু শো করছে। সেসময়ে দু’টি বাচ্চা ছেলেমেয়ে এসে আলাপ করে আমাদের সাথে। তাদের একজন রাহুল। আরেকজন প্রিয়াঙ্কা। ওই প্রথম আলাপ। বলেছিল, আমরা একটা সিনেমার শুটিং করছি। সিনেমার নাম- ‘চিরদিনই তুমি যে আমার’। রাজ চক্রবর্তীর ছবি। কবে মুক্তি পাবে, জানা নেই। তবে ওঁরা দু’জনেই যে আমাদের গান শোনে সেটা বলেছিল। সেই ছোট্ট একটা আলাপ অনেকটা আত্মীয়তাসূত্রে আবদ্ধ করল। তারপর পরবর্তী সময়ে কারণে-অকারণে অনেক গল্প হয়েছে। সে গল্পের মধ্যে কখনও এসেছে কমল মজুমদার, কখনও সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, এসেছে চন্দ্রবিন্দুর গান, সুমনের গান। একটা মানুষ সংস্কৃতির এতগুলো দিকের সঙ্গে জড়িয়ে, অর্থাৎ ঠিক গান শোনা, ঠিক লেখা পড়া, তাতে কোথাও আমার মনে হয়েছিল রাহুলের বড় হওয়াটা আমাদের মতোই। এবং যে বাঙালি চরিত্রটা ওর মধ্যে ছিল, তাতে সেনসেটিভি, অনেকটা ইমোশন ছিল। ওঁর লেখা যদি সবগুলো পড়া যায়, তার মধ্যে সেটা বারবারে ফিরে এসেছে। লেখক হিসেবে ওঁর এগিয়ে চলার সঙ্গে কিছুটা আমি জড়়িয়ে। তার কারণ রোববারের অসংখ্য লেখা ও লিখেছে। পরবর্তীকালে ও রোববার ডিজিটাল-এ কলাম লিখেছে। প্রথম যখন রাহুল ‘রোববার’-এ কলাম লিখতে শুরু করে, আমায় জিজ্ঞেস করেছিল- কী লিখব অনিন্দ্যদা? আমি বলেছিলাম- যে জীবনটা জানিস সে জীবনটা লেখ। সেটার মধ্যে একটা সত্যি আছে। ফলে সেই সত্যিটুকুর জন্যেই লেখাগুলো অন্যরকম হয়ে উঠবে। ও রোববারের শেষপাতায় একটা কলাম লিখতে শুরু করল। সেটা মূলত কলোনিতে ওঁর বেড়ে ওঠার গল্প।”

    খানিক থেমে অনিন্দ্য যোগ করলেন, “সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় বলেছিলেন, কোনও এক লেখকের যেমন একটাই লেখা থাকে। সেটা সে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে লেখে। রাহুলের অনেকরকম লেখা ছিল। কিন্তু তার মধ্যে ওঁর বেড়ে ওঠার গল্পগুলো সবথেকে মর্মস্পর্শী এবং একইসঙ্গে খুব উপভোগ্য ছিল। ওঁর লড়াই, ওঁর বন্ধুত্ব যে একটা বড় সংযোগ, ও যেভাবে বেঁচে থাকে সেই বেঁচে থাকার মধ্যে কতটা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বা কতটা সুমনের গানের প্রভাব রয়েছে? সেগুলো ওর লেখায় খুব থাকত। কলামটার নামকরণও আমার করা। নাম দিয়েছিলাম ‘কলোনি কল্লোলিনী’। এহেন নাম দেওয়ার নেপথ্যে একটাই ভাবনা কাজ করেছিল। যে শহরটাকে ও চেনে, সেই শহরের আতশকাচটা ওর বড় হওয়ার রাস্তাটুকুও। সেই মহল্লা, সেই এলাকাটা নিয়েই যে শহরটা গড়ে উঠেছে, সেটারই জন্য গল্প লিখেছিল ও। লেখক হিসেবে ওর যে পরিমিতি বোধ এবং একইসঙ্গে ও আস্তে আস্তে কতটা পরিণত হয়ে উঠছিল, সেটা পরেরদিকে রাহুলের লেখায় আমি টের পাই। লেখাগুলো পাঠিয়ে কখনও কখনও জিজ্ঞেস করত- ‘কেমন হয়েছে?’ আমি সত্যি অবাক হয়ে যাচ্ছিলাম ওর শব্দের ব্যবহার, ওর রসবোধ দেখে। যেভাবে একটা ঘটনাকে ও নিজের মতো করে দেখত, খুব যত্ন করে অনেকরকমের অ্যাঙ্গেলও শিখেছিল। একদিন আমাকে ফোন করে বলল- ‘অনিন্দ্যদা, আমার প্রথম বই বেরচ্ছে। তুমি যদি এসে উদ্বোধন করো।’ বইমেলায় ওঁর বই উদ্বোধন করতে গিয়েছিলাম। ওর ব্যাপারে আমি বরাবরই বায়াসড। ফলে খুব নৈর্ব্যক্তিকভাবে বলতে পারিনি। কিছুটা আবেগপ্রবণ ছিলাম। তার কারণ চোখের সামনে একজন লেখককে এভাবে বেড়ে উঠতে দেখাটা সেটাও এক আশ্চর্য ঘটনা বটে!”

    অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়ের কথায়, “অভিনয়ের জগতেও কিন্তু রাহুল আনপ্যারালাল ছিল। ওর জীবন শুরু হয়েছিল ব্লকবাস্টার একটা সিনেমা দিয়ে। যেখানে ও সত্যি সত্যি সুপারস্টার। কিন্তু সেখান থেকে নিজের জীবনের স্টিয়ারিংটা ও অন্যদিকে ঘুরিয়েছিল। ওর সারাজীবনে লড়াইটা ছিল একদিকে ও সুপারস্টার, আরেকদিকে ও একজন এমনি মানুষ। সুপারস্টার থেকে অভিনেতা হেয় ওঠার যাত্রাটা খুব সহজ ছিল না ওর কাছে। নানাধরণের মাধ্যমে কাজ করেছে। সিনেমা, সিরিয়ালে, নাটকে, এমনকী ও যাত্রাতেও কাজ করবে ভেবেছিল। রাহুল যখন রোবাবার-এ লেখে, এমনও দিন হয়েছে যে ওর লেখাটা লাগবে, দেরি হয়ে গেছে লেখা দিতে, আমি বলেছি- ওর বাড়ি থেকে লেখাটা তুলে নিয়ে যাব। ও অবাক হয়ে বলেছিল, তুমি বিজয়গড়ে আসবে লেখা তুলে নিয়ে যেতে! আমি ওর বাড়ি গিয়ে লেখা নিয়েও এসেছিলাম। বাড়িতে সেই প্রথম ওর সঙ্গে দেখা আমার। অবাক হয়ে দেখছিলাম, এই জায়গা থেকেই রাহুল বড় হয়ে উঠেছে। এই রাস্তাঘাট যেগুলোর সঙ্গে লেখার মাধ্যমেই আমার পরিচয় ঘটেছে, সেগুলোকে নিজে চোখে দেখা। সে-ও একটা প্রাপ্তিই তো বটেই। তার অনেক পরে রাহুল যখন সহজকথা পডকাস্ট শুরু করে, একটা পর্বে আমিও ছিলাম। সেদিন ওর বাড়ি গিয়েছিলাম। বাড়ির ভিতরই ওর সেট ফেলেছিল। শুটিং তো যেরকম হওয়ার হল। শেষ হওয়ার পর আমায় জানাল- ‘তুমি একটু দাঁড়বে, মা আসছে।’ ওঁর মায়ের সঙ্গে আলাপ হল। আমি মিষ্টি খেতে ভালোবাসি বলে মাসিমা আমার জন্য রসবড়া বানিয়েছিলেন। সেই কথাগুলো বারবার মনে পড়ছে। মানুষকে আশ্চর্য ভালোবাসা দেওয়ার ক্ষমতা ছিল রাহুলের মধ্যে। রাহুল-প্রিয়াঙ্কার বিয়ের কার্ডও আমার লেখা। ফলে ওর বেড়ে ওঠার সঙ্গে আমি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিলাম আমি।”

    লেখালেখি, গান শোনা কিংবা মঞ্চ কতটা আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ছিল অভিনেতা রাহুল বন্দ্যোপাধ্যায়কে? কথাপ্রসঙ্গে অনিন্দ্য জানালেন, “যত ব্যস্তই থাক না কেন, আমাদের গানের অনুষ্ঠানে চলে আসত। রাহুলের মধ্যে যে লেখক মন ছিল, সেটা ভীষণ আকর্ষণীয়। যে মনটা সব শিল্পীর থাকে না। আমাকে বহুবার ‘জানলাগুলোর আকাশ ছিল’ নাটকটা দেখতে যেতে বলেছিল। আমি গিয়েওছিলাম। অনেকদিন পর কোনও নাটক দেখে ‘অরিজিন্যাল’ বলে মনে হয়েছিল আমার। এবং খুব গর্ব হচ্ছিল সেদিন ওর জন্য। রাহুল যখন মঞ্চ থেকে নেমে দাঁড়াল, আমি ওকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেয়েছিলাম। সেটা ও জনে জনে বলেছিল। ওর যে লেখা দুটো নিয়ে নাটকটা তৈরি, সেগুলো ওকে পাঠাতে বলেছিলাম, কিন্তু ওর সময় হয়ে ওঠেনি। কথার খেলাপ ও কক্ষণও করত না। ওর নাটকের যে চরিত্র ‘টুবাইদা’, সেটাও খুব আকস্মিকভাবে মারা যায়। বয়সে ছোট কাউকে মঞ্চে এহেন দৃশ্যে দেখলে মনে খুব ধাক্কা দেয়। তার পর তো ও নিজেই সত্যি সত্যি চলে গেল! ওর আরও লেখা বাকি ছিল। বিভিন্ন মাধ্যমে নিজেকে ছড়িয়ে দিতে পারত। আমি মিস করব ওর ফোনগুলো। বিপদের মাঝেও ওকে কত অ্যাসাইনমেন্ট ধরিয়ে দিতাম। ও বলত- ‘অনিন্দ্যদা আমি ঠিক লিখে ফেলব।’ রাহুল অরুণোদয় ব্যানার্জি, সেই লেখক সত্ত্বাকে যে এভাবে হারিয়ে ফেলব, বুঝতে পারিনি।”
  • Link to this news (প্রতিদিন)