ফুটবল পাগল ছেলেটা চিরতরে মাঠ ছাড়ল! রাহুলের মৃত্যুতে ১৮ বছর আগের এক বুধবারের গল্প শোনালেন টোটা
আজকাল | ৩০ মার্চ ২০২৬
ওড়িশা–পশ্চিমবঙ্গ সীমান্তের তালসারি সমুদ্রসৈকতে শুটিং চলাকালীন জনপ্রিয় অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের মর্মান্তিক মৃত্যু ঘিরে উঠে আসছে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য।এহেন আবহে রবিবার সন্ধ্যা থেকেই তোলপাড় নেটমহল। শোকাচ্ছন্ন টলিপাড়া। এবার স্মৃতিচারণায় ডুব দিলেন পর্দার ‘ফেলুদা’ তথা অভিনেতা টোটা রায়চৌধুরী। বিজয়গড়ের সেই সাধারণ ছেলেটির ‘অরুণোদয়’ থেকে ‘স্টার’ হয়ে ওঠার যাত্রাপথ আর তাঁর ফুটবল প্রেমের অকথিত গল্প শোনালেন তিনি।
সোমবার দুপুরে সমাজমাধ্যমে একটি দীর্ঘ ও আবেগঘন পোস্টে রাহুলকে শ্রদ্ধা জানালেন টোটা রায়চৌধুরী। খবরটা প্রথম শুনে বিশ্বাসই করতে পারেননি তিনি, ভেবেছিলেন হয়তো কোনো ‘স্থূল রসিকতা’। কিন্তু রূঢ় বাস্তব সামনে আসতেই ভেসে উঠল ১৮ বছর আগের এক বুধবারের স্মৃতি। ২০০৮ সালে ‘চিরদিনই তুমি যে আমার’ মুক্তির ঠিক দুদিন আগে ইস্টবেঙ্গল মাঠে এক প্রদর্শনী ম্যাচে প্রথম দেখা হয়েছিল দু’জনের।
টোটা জানান, রাহুল ছিলেন আদ্যপান্ত ‘ফুটবল পাগল’। ১৯১১ সালের মোহনবাগানের ঐতিহাসিক শিল্ড জয় নিয়ে একটি ছবি করার পরিকল্পনা করেছিলেন রাহুল। সেখানে কিংবদন্তি গোষ্ঠ পালের চরিত্রের জন্য টোটাকেই পছন্দ ছিল তাঁর। বাজেট নিয়ে রাহুলের দ্বিধা দেখে টোটা হাসিমুখে বলেছিলেন, “তোমার পছন্দের সংখ্যা চেকে বসিয়ে দিও।” যদিও সেই ছবি আর আলোর মুখ দেখেনি।
সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের ‘দার্জিলিং জমজমাট’ সিরিজের শুটিংয়ের সময় রাহুলকে আরও কাছ থেকে চিনেছিলেন টোটা। শুটিংয়ের বিরতিতে রাহুলের ঘরে বসত আড্ডার আসর। সৃজিত মুখোপাধ্যায় ঘরে ঢুকতেই রাহুলের সেই বিখ্যাত সংলাপ— “সৃজিতদা, ওয়েলকাম টু নরক গুলজার!” আজও কানে বাজে টোটার। টোটার মতে, এই আমুদে মানুষটার ভেতরেই লুকিয়ে ছিল এক অত্যন্ত সংবেদনশীল বাবা, যার কণ্ঠস্বর ছেলের (সহজ) কথা বললেই কোমল হয়ে যেত।
টোটা আক্ষেপ করে লিখেছেন, কিছু মানুষ ইন্ডাস্ট্রি থেকে শুধু নিতে আসে, কিন্তু রাহুলের মতো কিছু মানুষের থেকে ইন্ডাস্ট্রির অনেক কিছু পাওয়ার ছিল। অভিনেতা, লেখক এবং মানুষ হিসেবে রাহুল ছিলেন এক অপূরণীয় সম্পদ। কিছু মানুষ আসে ইন্ডাস্ট্রি থেকে শুধু নিতে। কিছু মানুষ আসে যাদের কাছ থেকে ইন্ডাস্ট্রির অনেক কিছু পাওয়ার থাকে। রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায় ছিল দ্বিতীয় শ্রেণীর পর্যায়ভুক্ত। অ- নে- ক কিছু পাওয়ার ছিল ওর কাছ থেকে — অভিনেতা হিসেবে, লেখক হিসেবে, মানুষ হিসেবে। পোস্টের শেষে বড় আক্ষেপ নিয়ে টোটা লিখেছেন, “বড় তাড়াতাড়ি চলে গেলে ভাই, বড় তাড়াতাড়ি…”
এইমুহূর্তে ভিড় উপচে পড়েছে রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিজয়গড়ের বাড়ির নীচে। চোখের জলে 'বাবিন'কে শেষবার বিদায় জানাতে এসেছে প্রতিবেশীরা। রাহুলের মরদেহ নিয়ে শববাহী গাড়ি বেরিয়ে পড়ল কেওড়াতলা মহাশ্মশানের উদ্দেশ্যে। বেশ খানিকক্ষণ আগে ফুলে সাজানো শববাহী গাড়িতে করে আনা হয়েছে রাহুলের নিথর দেহ। 'বাবিন'কে একটিবার দেখার জন্য পাড়ার মানুষের আকুতির কাছে ভেঙে পড়ল ব্যারিকেড। এরপরেই সেখান থেকে ভিড় সরিয়ে, কোনওমতে রাহুলের মৃতদেহ নিয়ে যাওয়া হয়েছে বাড়ির তিনতলায়। তবে বাড়ির উপরে রাহুলের ফ্ল্যাটে কাউকে উঠতেই দেওয়া হচ্ছে না। সেখানে রাহুলের মা আছেন, প্রিয়াঙ্কা আছেন, তাঁদের সন্তান সহজ আছে। সেখানে কোনও সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধি অথবা বাইরের কাউকে ঘরে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। রাহুল-প্রিয়াঙ্কার সন্তান সহজের বয়স মাত্র ১১। তাই তার কথা মাথায় রেখেই পরিবার রাহুলের মৃতদেহ নিয়ে কোনওরকম আড়ম্বর চান না। তাঁদের ছবি প্রকাশ্যে আসুক, চান না প্রিয়ঙ্কা ও পরিবারের বাকিরাও। বাড়ি থেকে, একেবারে আড়ম্বরহীনভাবেই রাহুলের দেহ নিয়ে যাওয়া হবে শ্মশানে। মাঝখানে কোনও জায়গাতেই -স্টুডিও অথবা প্রেক্ষগৃহের চত্বর, কোথাও শায়িত থাকবে না রাহুলের দেহ।
বিজয়গড়ের মানুষের কাছে রাহুল কোনও বড় তারকা নন, ছিলেন শুধুই পাড়ার ছেলে ‘বাবিন’। তাঁর অমায়িক ব্যবহার আর হাসিমুখের স্মৃতি হাতড়ে এদিন কান্নায় ভেঙে পড়েন সকলে। পাড়ার মোড়ে মোড়ে এখন শুধুই প্রিয় অভিনেতাকে হারানোর হাহাকার।