‘সত্তা বা আত্মপরিচয় কোনো দয়া বা অনুদান নয়, এটি অধিকার।’ — রূপান্তরকামী বা ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তিদের অধিকার রক্ষায় সোমবার এক ঐতিহাসিক পর্যবেক্ষণ করল রাজস্থান হাইকোর্ট। একইসঙ্গে রাজ্যের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সরকারি চাকরিতে রূপান্তরকামীদের জন্য ৩ শতাংশ অতিরিক্ত ‘ওয়েটেজ’ (Weightage) বা নম্বর প্রদানের নির্দেশ দিয়েছে আদালত।
বিচারপতি যোগেন্দ্র কুমার পুরোহিত এবং বিচারপতি অরুণ মোঙ্গার ডিভিশন বেঞ্চ স্পষ্ট জানিয়েছে, ২০২৩ সালে রাজস্থান সরকার যে রূপান্তরকামীদের ওবিসি (OBC) তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছিল, সেটা ছিল আসলে ‘আইওয়াশ’ অর্থাৎ, লোক দেখানো পদক্ষেপ।
আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, আলাদা কোনও সংরক্ষণ কাঠামো না থাকায় এই প্রান্তিক মানুষেরা বাস্তবে কোনও সুযোগ-সুবিধাই পাচ্ছিলেন না। আইনি বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রায়ের ফলে এখন থেকে রাজস্থানের সমস্ত সরকারি নিয়োগ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির ক্ষেত্রে রূপান্তরকামীরা ৩ শতাংশ অতিরিক্ত নম্বর পাওয়ার সুবিধা পাবেন।
এ দিন আদালতের পর্যবেক্ষণের একটা বড় অংশ জুড়ে ছিল ‘ট্র্যান্সজেন্ডার ব্যক্তি (অধিকার সুরক্ষা) সংশোধনী বিল, ২০২৬’-এর সমালোচনা। বিলটি সদ্য সংসদে পেশ করেছে মোদী সরকার। রাজস্থান হাইকোর্টের মতে, প্রস্তাবিত এই বিলটি রূপান্তরকামীদের ‘স্ব-নির্ধারিত লিঙ্গ পরিচয়ের’ সাংবিধানিক অধিকারকে খর্ব করার ঝুঁকি তৈরি করেছে।
আদালত জানিয়েছে, যেখানে সুপ্রিম কোর্ট তার ‘নালসা’ (NALSA) রায়ে তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তিদের আত্মপরিচয়কে তাদের মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল, সেখানে নতুন বিলে লিঙ্গ পরিচয়ের জন্য প্রশাসনিক শংসাপত্র বা স্ক্রুটিনির শর্ত চাপানো হয়েছে। এটা সাংবিধানিক নিশ্চয়তার অবমাননা বলে নিন্দা করেছে আদালত।
২০১৪ সালের ঐতিহাসিক ‘নালসা বনাম ইউনিয়ন অফ ইন্ডিয়া’ মামলার প্রসঙ্গ টেনে আদালত জানায়, রূপান্তরকামীরা আজও সমাজচ্যুত এবং অর্থনৈতিক ভাবে চরম বিপন্ন। রাজস্থান হাইকোর্ট তার রায়ে মনে করিয়ে দিয়েছে যে, হিন্দু পুরাণ বা ঐতিহ্যে ‘অর্ধনারীশ্বর’ বা ‘শিখণ্ডী’-র মতো চরিত্রের মাধ্যমে লিঙ্গ বৈচিত্র্যের স্বীকৃতি রয়েছে। কিন্তু আধুনিক ভারতীয় সমাজ তাঁদের মর্যাদা দিতে ব্যর্থ হয়েছে।
সংবাদসংস্থা পিটিআই (PTI) সূত্রে খবর, আদালত রাজস্থান সরকারকে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের জন্য একটি সঠিক এবং সংবিধানসম্মত সংরক্ষণ কাঠামো তৈরির নির্দেশ দিয়েছে। যতদিন না সেই স্থায়ী নীতি তৈরি হচ্ছে, ততদিন এই ৩ শতাংশ অতিরিক্ত ওয়েটেজের অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশ কার্যকর থাকবে। এই রায় দেশের ট্র্যান্সজেন্ডার অধিকার আন্দোলনকে এক নতুন দিশা দেখাবে বলে মনে করছেন মানবাধিকার কর্মীরা।