• ডুবেই মৃত্যু রাহুলের, দায়–গাফিলতি কার?
    এই সময় | ৩১ মার্চ ২০২৬
  • এই সময়, কলকাতা ও তমলুক: ফুসফুস, শ্বাসনালী ও পাকস্থলীতে প্রচুর পরিমাণে বালি আর নোনা জল। বালি এতটাই ঢুকেছে যে, দুটো ফুসফুস ফুলে তাদের স্বাভাবিক আকারের প্রায় দ্বিগুণ। তার পরেই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু বলে তাম্রলিপ্ত সরকারি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের দেহের ময়না–তদন্তের প্রাথমিক রিপোর্টে জানা গিয়েছে— এমনটাই পুলিশ সূত্রের খবর। পুলিশের বক্তব্য, এর থেকে ইঙ্গিত যে, দীর্ঘ সময় ধরে তিনি জলে ডুবে ছিলেন। অর্থাৎ, সমুদ্রে পড়ার পরে রাহুলকে উদ্ধার করতে অনেকটা সময় লেগেছিল।

    এখানেই প্রশ্ন উঠেছে, রবিবার বিকেলে দিঘার কাছে ওডিশার তালসারির সমুদ্র সৈকতে মেগা সিরিয়ালের শুটিং চলাকালীন ওই ঘটনা যখন ঘটল, রাহুলকে তখন কেন দ্রুত উদ্ধার করা গেল না? সিরিয়ালের পরিচালক রবিবার দাবি করেছিলেন, ঘটনার সময়ে শুটিং–ইউনিটের ৩০–৪০ জন সেখানে ছিলেন এবং তাঁদের মধ্যে সাঁতার জানা ১০–১২ জন এগিয়ে যান নায়ক রাহুল ও নায়িকা শ্বেতা মিশ্রকে উদ্ধার করতে। কিন্তু সত্যিই কি অত জন সেখানে ছিলেন, নাকি ওই দৃশ্যাবলির শুটিং চলছিল খুব কম সংখ্যক কলাকুশলী নিয়ে? পূর্ব মেদিনীপুর জেলার পুলিশ সুপার অংশুমান সাহা জানান, দিঘা থানার পুলিশ রবিবার রাতে অস্বাভাবিক মৃত্যুর একটি মামলা রুজু করে তদন্তে নেমেছে। এসপি–র বক্তব্য, তার প্রেক্ষিতে খোঁজ নিয়ে পূর্ব মেদিনীপুর জেলা পুলিশ ওডিশার বালেশ্বর জেলা (তালসারি ওই জেলারই অন্তর্গত) পুলিশের কাছ থেকে প্রাথমিক ভাবে জেনেছে যে, তালসারি সি বিচে শুটিং হবে, এমন কোনও তথ্য সেখানকার জেলা পুলিশের কাছে ছিল না। ঘটনাস্থল পশ্চিমবঙ্গের সীমানা থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে। বালেশ্বরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার গায়ত্রী প্রধানও এ দিন সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘তালসারি বিচে শুটিংয়ের জন্য পুলিশের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় অনুমতি প্রোডাকশন ক্রু–র তরফে নেওয়া হয়নি।’

    রবিবার সন্ধেয় রাহুলকে মৃত অবস্থায় দিঘা স্টেট জেনারেল হাসপাতালে আনার অব্যবহিত পরে পূর্ব মেদিনীপুর জেলা পুলিশ জেনেছিল যে, শুটিংয়ের সময়ে বোট উল্টে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটেছে। তবে পুলিশ সূত্রের খবর, পরে তাদের কাছে শুটিংয়ের যে ভিডিয়ো ফুটেজ এসেছে, তাতে দেখা যাচ্ছে, রাহুল ও শ্বেতা দু’জনে সমুদ্রের দিকে হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে যাচ্ছেন, তখন হঠাৎই জল বেড়ে গেল, একগলা পর্যন্ত উঠে গেল জল। সূত্রের খবর, প্রথমে পড়ে গেলেন শ্বেতা, তার পরে রাহুলও পড়ে গেলেন। দৌড়ে গিয়ে এক জন— সম্ভবত শুটিং ইউনিটের কেউ— ধরলেন শ্বেতাকে। কিন্তু ঢেউ টেনে নিল রাহুলকে। যদিও বালেশ্বরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের বক্তব্য, ‘জলের মধ্যে নাচের দৃশ্যের শুটিং চলার সময়ে রাহুল একটা খন্দে (পিট) পড়ে যান।’

    তা হলে ঠিক কী হয়েছিল? সেটা নিশ্চিত ভাবে জানতে শুটিংয়ে ব্যবহৃত ড্রোন ক্যামেরার ফুটেজ খুঁটিয়ে দেখবেন পূর্ব মেদিনীপুর জেলা পুলিশের তদন্তকারীরা।

    অভিনেতা রাহুলের গাড়ির চালক, ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী বাবলু দাসের মতে, ‘দাদা (রাহুল) জলের গভীরতা বুঝতে পারেননি, ভারসাম্য রাখতে পারেননি। অনেকটা জল ছিল, ভালো রকম গভীরতা ছিল। যতটা আমরা আন্দাজ করেছিলাম, তার চেয়ে অনেক বেশি জল। সেই সময়ে জোয়ার এসে গিয়েছিল। স্রোত ছিল। টেকশিয়ানরা, উপস্থিত সকলেই বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলেন। ছ’–সাত জন নিজের জীবন বাজি রেখে দাদাকে বাঁচাতে জলে ঝাঁপ দেন। কিন্তু কিছু করা যায়নি। দাদা অনেকটাই জল খেয়ে ফেলেছিলেন। উদ্ধার করলেও তখন অনেকটা দেরি হয়ে গিয়েছিল।’ বাবলুর কথায়, ‘দাদা সাঁতার জানতেন। কিন্তু সেই সময়ে সম্ভবত নার্ভাস হয়ে গিয়ে সাঁতরাতে পারেননি।’ বাবলু জানান, সমুদ্রতটে শুটিংয়ের সময়ে সেখানে কোনও লাইফ সেভার বা ডুবুরি, নুলিয়া ছিলেন না, পুলিশেরও কাউকে তাঁর চোখে পড়েনি। পুলিশ সূত্রের খবর, ইতিমধ্যেই কয়েক জন প্রত্যক্ষদর্শীর সঙ্গে কথা বলেছেন তদন্তকারীরা। পুলিশ সূত্রের খবর, বাবলুর মতো কয়েক জন প্রত্যক্ষদর্শী, সিরিয়ালের নায়িকা শ্বেতা, পরিচালক শুভাশিস মণ্ডলের বয়ান মিলিয়ে দেখা হবে।

    টলিউডের কলাকুশলীদের ফেডারেশনের সভাপতি স্বরূপ বিশ্বাস সোমবার বলেন, ‘কোনও আউটডোর শুটিংয়ের আগে যখন আমরা বার বার জানতে চাই যে, কী ধরনের সতর্কতা নেওয়া হচ্ছে, তখন আমাদের সমালোচনা করা হয়। বলা হয়, ফেডারেশন এত প্রশ্ন করছে? কেন সেই প্রশ্নগুলো করা হয়, এ বার বুঝে দেখুন।’ স্বরূপের সংযোজন, ‘দ্রুত মিটিং ডেকে গোটা বিষয়টা নিয়ে আলোচনা করব। সতর্কতার নির্দিষ্ট পদক্ষেপ স্থির করতেই হবে। একজন গুণী শিল্পীকে এ ভাবে হারানোটা মেনে নেওয়া যায় না।’

    অভিনেত্রী সুদীপ্তা চক্রবর্তী, রপাঞ্জনা মিত্র–সহ টলিউডের বেশ কয়েক জন শুটিং স্পটে রাহুলের অস্বাভাবিক মৃত্যুর ‘পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ পুলিশি তদন্তের’ দাবি করেছেন।

    রাহুলের পরিবারের তরফে সোমবার রাত পর্যন্ত কোনও অভিযোগ দায়ের করা হয়নি বলে পূর্ব মেদিনীপুর জেলা পুলিশ জানিয়েছে।

    রবিবার রাতেই দিঘার হাসপাতাল থেকে রাহুলের দেহ তাম্রলিপ্ত সরকারি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আনা হয়। সোমবার সকাল সাড়ে ১১টা নাগাদ রাহুলের দেহের ময়না–তদন্ত শুরু হয়, চলে দুপুর প্রায় পৌনে ১টা পর্যন্ত। রাহুলের দেহ থেকে কিছু নমুনা সংগ্রহ করে ভিসেরা পরীক্ষার জন্য রাজ্য ফরেন্সিক ল্যাবে পাঠানো হয়েছে। তা ছাড়া, তাঁর শরীরে পুরোনো কোনও সমস্যা ছিল কি না, সেটা জানতে পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে তাম্রলিপ্ত গভর্নমেন্ট মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের হিস্টোপ্যাথলজি বিভাগেও।

    সোমবার ময়না–তদন্তের সময়ে হাসপাতালে উপস্থিত ছিলেন রাহুলের মামা ও মামি এবং কয়েক জন ঘনিষ্ঠ বন্ধু। শোকে ভেঙে পড়েন তাঁরা। পূর্ব মেদিনীপুরের এসপি–সহ পুলিশকর্তারাও ছিলেন হাসপাতালে। এ দিন সকাল থেকে দুপুর, ওই হাসপাতাল চত্বর ছিল ভিড়ে ঠাসা। কারও হাতে ফুলের মালা, কারও চোখে জল। প্রিয় অভিনেতাকে তাঁরা এসেছিলেন চিরবিদায় জানাতে। অভিনেতা রাহুলকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের তরফে তৃণমূল কর্মীরা এবং শুভেন্দু অধিকারীর তরফে বিজেপি কর্মীরা শ্রদ্ধা জানান। রবিবার রাতেই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সামাজিক মাধ্যমে তাঁর শোকবার্তা জানিয়েছেন। অভিনেতা–সাংসদ দেব এ দিন কোচবিহারে বলেন, ‘খবরটা প্রথম যখন শুনি, তখন বিশ্বাস করতে পারিনি। খুব দুঃখজনক ঘটনা, খুব তাড়াতাড়ি চলে গেল রাহুল।’

  • Link to this news (এই সময়)