এই সময়: বাংলায় নির্বাচনী নির্ঘণ্ট প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয়েছিল রাজ্যের মুখ্যসচিব, স্বরাষ্ট্রসচিব, ডিজিপি থেকে শুরু করে বিডিও এবং থানার ওসি–আইসি স্তরে বদলির সিলসিলা। তা নিয়ে ইতিমধ্যেই দু’খেপে কলকাতা হাইকোর্টে দু’টি আলাদা মামলা দায়ের হয়েছে। তার মধ্যে পুলিশ–প্রশাসনের ৭৯ জন শীর্ষকর্তার বদলি নিয়ে হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি সুজয় পালের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চে যে মামলাটি আগেই দায়ের হয়েছিল, আজ, মঙ্গলবার তার রায় ঘোষণা হতে পারে। আরও ২৬৭ জন অফিসারের রদবদল নিয়ে সোমবার নতুন মামলা হয়েছে। আজই তার শুনানি হতে পারে। এরমধ্যে এ বার রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের (সিইও) দপ্তরের চার সিনিয়র আধিকারিককে এ দিন সরিয়ে দেওয়া হলো। এঁদের মধ্যে একজন ডেপুটি সিইও, একজন জয়েন্ট সিইও এবং দু’জন অ্যাডিশনাল সিইও পদমর্যাদার অফিসার রয়েছেন। নবান্ন সূত্রের খবর, সিইও–র প্রস্তাব মেনেই এই অফিসারদের রদবদল করা হয়েছে। নির্বাচনী নির্ঘণ্ট ঘোষিত হয়ে যাওয়ার পরে সিইও দপ্তরের চারজন সিনিয়র অফিসারকে একলপ্তে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনা বিরল বলেই মত প্রশাসনিক কর্তাদের একাংশের।
কেন অফিসারদের সরানোর সুপারিশ করা হয়েছিল, তা নিয়ে এ দিন কোনও মন্তব্য করেননি সিইও মনোজ আগরওয়াল। তবে এই মুহূর্তে প্রশাসনিক কোনও রদবদলই যে কমিশনের গ্রিন সিগন্যাল ছাড়া সম্ভব নয়, সেটা স্পষ্ট। এঁদের বদলির কারণ জানায়নি নবান্নও। তাদের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ২০০৫ ব্যাচের ডব্লিউবিসিএস (এগজি়কিউটিভ) অফিসার সুব্রত পালকে স্বাস্থ্য এবং পরিবার কল্যাণ দপ্তরের সিনিয়র ডেপুটি সচিব করে পাঠানো হয়েছে। সুব্রত ডেপুটি সিইও ছিলেন। ২০০১ ব্যাচের রাহুল নাথ ছিলেন স্বাস্থ্য এবং পরিবার কল্যাণ দপ্তরের অতিরিক্ত সচিব। তাঁকে যুগ্ম সিইও করে পাঠানো হয়েছে মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দপ্তরে। এ ছাড়া ১৯৯৮ ব্যাচের ডব্লিউবিসিএস অফিসার নরেন্দ্রনাথ দত্তকে শ্রম দপ্তরের অতিরিক্ত সচিব এবং ২০০০ ব্যাচের সুপ্রিয় দাসকে খাদ্য-প্রক্রিয়াকরণ ও উদ্যানপালন বিভাগের অতিরিক্ত সচিব করে পাঠানো হয়েছে। তাঁরা দু’জনেই সিইও দপ্তরে অ্যাডিশনাল সিইও পদে ছিলেন। ২০০৪ ব্যাচের মিঠু দত্তকে সংখ্যালঘু বিষয়ক এবং মাদ্রাসা শিক্ষা দপ্তরের যুগ্ম সচিব করে পাঠানো হল। তিনি জয়েন্ট সিইও পদে ছিলেন।
কমিশন সূত্রের খবর, এঁদের মধ্যে মিঠু দত্তকে কিছুদিন আগেই সিইও দপ্তরে পাঠানো হয়েছিল। হঠাৎ আবার তাঁকে সরানো হলো কেন, সেটাও বুঝতে পারছেন না সিইও দপ্তরের আধিকারিকদের একাংশ। সিইও দপ্তর সূত্রের দাবি, সোমবার অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ফর্ম–৬ জমা সংক্রান্ত একটি ভিডিয়ো (যার সত্যতা এই সময় যাচাই করেনি) পোস্ট করেছিলেন। তা আদৌ ফর্ম–৬ নয়। সেটা সিইও দপ্তরের অফিস বদল সংক্রান্ত আনা ফাইলের বান্ডিল। যাঁর ঘরের ছবি দেখানো হয়েছিল, সেটি ডেপুটি সিইও–র চেম্বার। কমিশনের একাংশের দাবি, সিইও দপ্তরের একাংশ আধিকারিক ভোট সংক্রান্ত বেশ কিছু বিভ্রান্তিকর তথ্য কিছু রাজনৈতিক দলের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন এ রকম অভিযোগও তাদের কাছে আসছিল। তার জেরেই এ দিনের বদলি কি না, তা নিয়ে জল্পনা চলছে।
নির্বাচন ঘোষণার পরেই রাজ্যের ৭৯ জন শীর্ষ আইএএস–আইপিএসকে বদলির নির্দেশ চ্যালেঞ্জ করে আগেই মামলা দায়ের হয়েছিল হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির বেঞ্চে। আজ সেই মামলারই রায় ঘোষণা হওয়ার কথা। গত কয়েকদিনে আবার থানা এবং ব্লক পর্যায়ে বদলি সংক্রান্ত কমিশনের নির্দেশ চ্যালেঞ্জ করে নতুন মামলা দায়ের হয়েছে হাইকোর্টে। সোমবার প্রধান বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চে মামলায় বলা হয়, গত কয়েকদিনে ২৬৭ জন ওসি, আইসি এবং বিডিওকে কমিশন বদলি করেছে। যা নিয়ে রাজ্যকে আগাম জানানো বা পরামর্শ নেওয়ারও প্রয়োজন বোধ করেনি তারা। ভোট ঘোষণার পরে এখন এলাকার ইতিহাস–ভূগোল না জানা অফিসারদের রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় দায়িত্ব দিয়ে পাঠানোয় কাজের গতি থমকে যাচ্ছে। এমনকী এরপরে কোনও আইন–শৃঙ্খলাজনিত সমস্যা হলেও তাঁদের ঘাড়ে দায় চাপাবে কমিশন। কমিশনের এই সিদ্ধান্ত হঠকারী বলে অভিযোগ তুলেই মামলা দায়ের করার আবেদন জানানো হয়। প্রধান বিচারপতি মামলা দায়েরের অনুমতি দিয়েছেন। একের পর এক বদলি নিয়ে বারবার কমিশনকে নিশানা করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়রা। এ দিন তৃণমূলের পাশে দাঁড়িয়ে সমাজবাদী পার্টির সাংসদ অখিলেশ যাদবের কটাক্ষ, ‘এগুলো নেহাত রুটিন বদলি নয়, বরং নির্বাচনী কারচুপি। বাংলায় বিজেপি যে ভাবে বিপুল সংখ্যায় পুলিশ আধিকারিক এবং বিডিও-দের রদবদল করছে, তাতেই প্রমাণিত হয় যে, এই রাজ্যে বিজেপির জয়ের স্বাদ অধরাই থাকতে চলেছে। দিদি আছেন, দিদিই থাকবেন!’