• ভাঙন, বন্যাক্লিষ্ট মানিকচক মনে রেখেছে ভূতনি ব্রিজ করে মমতার প্রতিশ্রুতি রক্ষা
    বর্তমান | ৩১ মার্চ ২০২৬
  • সৌম্য দে সরকার, মালদহ: মানিকচক নামটা শুনলেই চকচকে রত্নের কথা ভেসে উঠতে পারে। অন্তত যাঁরা কখনও মালদহের পশ্চিম প্রান্তের এই বিধানসভা কেন্দ্রে কখনই পা রাখেননি, তাঁদের মনে। আসল ছবিটা কিন্তু উলটো।

    নদী ভাঙনে ভিটেমাটি হারানো হাজার হাজার মানুষের চাপা আর্তনাদ গুমরে মরে এই মানিকচকে। সেই যন্ত্রণাকে ধুইয়ে দেয় না ভয়াবহ বন্যা। বরং দীর্ঘতর করে জলকে ঘিরে ভয় আর উদ্বেগ। নদী ভাঙন আর বন্যা সঙ্গী করে বেঁচে থাকা বারোমাস্যা মানিকচকের বাসিন্দাদের। কিন্তু মানিকচকে শোনা যায় এক প্রতিশ্রুতি পূরণের কথা। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ২০১১ সালে মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার আগে মানিকচকের মাটিতে দাঁড়িয়ে বলে গিয়েছিলেন ভূতনি ব্রিজ হবে। কথা রেখেছেন তিনি। 

    মানিকচকের  বড় অংশের মানুষ নির্বাচন এলেই বিভক্ত হয়ে যান একাধিক রাজনৈতিক দলের পরিচয়ে। এবারও ব্যতিক্রম নয়। তবে পালটে গিয়েছে রাজনৈতিক মুখগুলি। নতুন প্রজন্ম উঠে এসেছে এখানকার রাজনৈতিক ময়দানে।

    এক সময় কংগ্রেস এবং সিপিএম প্রার্থীরা বিধানসভায় যেতেন মানিকচক থেকে জিতে। কখনো জিততেন কংগ্রেসের যোখিলাল মণ্ডল, রামপ্রবেশ মণ্ডলরা। আবার ছিনিয়ে নিতেন সিপিএমের সুবোধ চৌধুরী কিংবা অসীমা চৌধুরী। বাম আমলে পরিবহণ দপ্তরের প্রতিমন্ত্রী হয়েছিলেন সুবোধ চৌধুরী। আবার ২০১১ সালে মালদহের প্রথম এবং একমাত্র তৃণমূল বিধায়ক নির্বাচিত হয়েই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্ত্রিসভায় ঠাঁই পেয়েছিলেন সাবিত্রী মিত্র। প্রথমবার পূর্ণ মন্ত্রীত্ব পেয়েছিল মানিকচক। 

    মানিকচকে দলের সাফল্যে খুশি মমতা কথা রেখেছেন। দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ করে ভূতনি ব্রিজ উপহার দিয়েছিলেন তিনি। জেলার মূল ভূখণ্ড থেকে কার্যত পৃথক ভূতনিকে তিনি যুক্ত করেছিলেন এই সেতু দিয়ে।

    তারপরেও ২০১৬ সালে মানিকচকে তৃণমূলের সাবিত্রীকে হারান কংগ্রেসের মোত্তাকিন আলম। ২০২১ সালে আবার পালাবদল। ফের জেতেন তৃণমূলের সাবিত্রী। কংগ্রেস ছেড়ে তৃণমূলে যোগ দেন প্রাক্তন বিধায়ক রামপ্রবেশ মণ্ডলও। কিন্তু ২০২৬ সালের ভোটচিত্র বদলে গিয়েছে অনেকটা। বিদায়ী বিধায়ক সাবিত্রী অসুস্থ। রামপ্রবেশ মণ্ডল প্রয়াত হয়েছেন আগেই। তাঁর ছেলে বিশ্বজিৎ এখন তৃণমূলের যুব নেতা।

    জেলা পরিষদের সদস্য কবিতা মণ্ডল এক সময় পঞ্চায়েত সমিতিও চালিয়েছেন। এবার কম কথার মানুষ কবিতা মানিকচকের তৃণমূল প্রার্থী। তৃণমূলের আমলে জেলা পরিষদের সভাধিপতির গুরুদায়িত্বে থাকা গৌরচন্দ্র মণ্ডল বিজেপিতে গিয়ে ভোটে লড়ে হারেন ২০২১ সালে। এবারও তাঁকেই প্রার্থী করেছে গেরুয়া শিবির। মানিকচকের ভূমিপুত্র শ্রমিক সংগঠন সিটুর জেলা সম্পাদক দেবজ্যোতি সিনহা এবার সিপিএমের হয়ে লড়ছেন মানিকচকে। দীর্ঘদিনের সঙ্গী আনসারুল হককে প্রার্থী করেছে কংগ্রেস।  

    ছুটছেন সকলেই। প্রচার চলছে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত। ঘুরেফিরে আসছে ভূতনি ব্রিজের কথা। তৃণমূল প্রার্থী বলছেন, ভাঙন রোধে কেন্দ্রের বঞ্চনার কথা। 

    বিজেপির গৌর বলছেন, কেন্দ্রের বঞ্চনা নয়, রাজ্য সরকারের লুটের কারণেই ভাঙন ও বন্যায় দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গিয়েছে মানিকচকের। 

    আর দেবজ্যোতি, যাঁকে তাঁর কমরেডরা ‘বাবু’ বলে ডাকতেই স্বছন্দ, তিনি দুষছেন তৃণমূল ও বিজেপিকে। 

    মানিকচক, গোপালপুর, মথুরাপুর, নাজিরপুর, ধরমপুর, নুরপুর, উত্তর ও দক্ষিণ চণ্ডীপুর, হীরানন্দপুর সহ ১৪টি গ্রাম পঞ্চায়েতের বাসিন্দারা শুনছেন তিনদলের কথা। কিন্তু ভাবছেন নিজেদের মতো।  

    উত্তর চণ্ডীপুরের বাঁধে চায়ের দোকান করেন অঙ্গনা মাহাতো। সেখানে চায়ের গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে বীরবল মাহাতো, কাউসার শেখরা বলছেন, ভোট মিটে যাবে। কিন্তু ভাঙন কি আদৌ থামাবেন রাজনীতিকরা। তবে, তাঁরা কথায় কথায় বলছেন, ভূতনি ব্রিজ এখন বাস্তব। 

    মমতা কথার খেলাপ করেন না। ভূতনি ব্রিজ তারই প্রমাণ। প্রচারে বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে তৃণমূলও। 
  • Link to this news (বর্তমান)