সুব্রত ধর, শিলিগুড়ি: লড়াইটা মূলত দাঁড়িয়েছিল তৃণমূল বনাম বিজেপির। মাঝখানে ‘চাণক্য’ হয়ে বর্ষীয়ান সিপিএম নেতা অশোক ভট্টাচার্য অবতীর্ণ হওয়ায় একটু বদলেছে সমীকরণ। শিলিগুড়ি বিধানসভায় সেই হিসাব মেলানোর জন্য চলছে কৌশলগত অঙ্ক কষার পালা।
চব্বিশের লোকসভার লিড ধরে রাখার পরীক্ষা বিজেপির শংকর ঘোষের সামনে।তৃণমূলের গৌতম দেব এবার ফুরফুরে মেজাজে নিজেকে তুলে ধরছেন অভিভাবক হিসেবে। প্রচার করছেন মেয়র হিসেবে সাফল্যের কথা। আর শরদিন্দু চক্রবর্তীর হাত ধরে সিপিএম চাইছে হারানো ভোট ঘরে ফেরাতে। ত্রিমুখী এই লড়াই ঘিরে বিশ্লেষণে উঠে আসছে শিলিগুড়ির রাজনৈতিক ইতিহাসের কথাও।
সালটা ২০১১। তৃণমূল কংগ্রেসের বাজি ছিল আপাত নিরপেক্ষ চিকিৎসক রুদ্রনাথ ভট্টাচার্য। পেশার বাইরে রাজনীতির আঙিনায় তিনি ছিলেন অপরিচিত মুখ। মমতা সাইক্লোনে ওলোট-পালোট হয়ে যায় ‘লালদুর্গ’। প্রথম সবুজ আবির ওড়ে ‘মিনি ইন্ডিয়া’ শিলিগুড়ির আকাশে। তা ধরে রাখতে পারেনি তৃণমূল। ২০১৬-তে তৃণমূলের ফুটবলার প্রার্থী বাইচুং ভুটিয়াকে হারিয়ে ফের কেন্দ্রটি দখল করে সিপিএম। প্রাক্তন মন্ত্রী অশোক ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে এই এলাকা মাথা তোলে ‘লালদ্বীপ’ হিসাবে। ২০২১-এ ফের পালাবদল। সৌজন্যে অশোকের প্রাক্তন ‘শিষ্য’ শংকর ঘোষ। সেবার এখানে তৃণমূলের প্রার্থী ছিলেন অধ্যাপক ওমপ্রকাশ মিশ্র।
এবার মহারণ-২৬। ফের এখানে জোড়াফুল ফোটাতে মরিয়া তৃণমূল। তারা এজন্য চিকিৎসক, ফুটবলার কিংবা অধ্যাপককে টিকিট দেয়নি। এবার তাদের ‘তুরুপের তাস’ মেয়র গৌতম দেব। ডাবগ্রাম-ফুলবাড়িতে দাঁড় না করিয়ে তাঁকে এখানে প্রার্থী করা হয়েছে। এই কেন্দ্রে প্রথম ভোটে দাঁড়ালেও এখানকার রাজনীতির অলিগলি তাঁর হাতের তালুর মুঠোয়। এটা তাঁর জন্মভূমি। তাঁকে এখানকার ভোটের ময়দানে ‘অভিভাবক’হিসাবেই তুলে ধরছে তৃণমূল। তাদের স্লোগান‘এবার শহরের অভিভাবককেই চাই’।
রাজ্যের নজরকাড়া বিধানসভা কেন্দ্রগুলির মধ্যে শিলিগুড়ি অন্যতম। পাহাড় ও সমতলের সংযোগস্থলে এই কেন্দ্রের অবস্থান। মহানন্দা বেষ্টিত এখানকার মাটিতে বাঙালি, বিহারি, নেপালি, পাঞ্জাবি, মাড়োয়ারিসহ বিভিন্ন ভাষার মানুষের বসবাস। গৌতম বলেন, জন্মভূমির ঋণ শোধ করার স্বপ্ন নিয়েই এবার ভোট লড়ছি।
বর্তমানে কেন্দ্রটি বিজেপির কব্জায়। শহরের বিভিন্ন প্রান্তে উড়ছে গেরুয়া পতাকা। সেই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ছবিসহ পোস্টার, ব্যানারে ছেয়েছে শহর। তবে ভোটের ময়দানে তৃণমূলের ট্রাম্পকার্ড গৌতম। বাঙালি-অবাঙালি সর্বত্র তাঁর অবাধবিচরণ। এতেই চ্যালেঞ্জের মুখে পদ্মশিবির। এমন প্রেক্ষাপটে স্কুটারে, কখনও হেঁটে ময়দান চষে বেড়াচ্ছেন বিজেপি প্রার্থী শংকর। তৃণমূল শংকরকে ‘লালপদ্ম’, ‘টিভির নেতা’ বলে কটাক্ষ করলেও ইদানীং তিনি শহরে সক্রিয়তা বাড়িয়েছেন। মন্দিরে পুজো দেওয়া, বাড়ি বাড়ি গিয়ে জনসংযোগের পাশাপাশি বিভিন্ন ইস্যুতে আন্দোলন সংগঠিত করার চেষ্টা করছেন। দুদিন আগেই এক ছাত্রীর অস্বাভাবিক মৃত্যুকে কেন্দ্র করে তিনি অবস্থান বিক্ষোভ করেন। শংকর বলেন, তৃণমূলীদের বক্তব্য নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছি না। দুনীর্তি, অপশাসনের বিরুদ্ধে লড়াই। তাই এবারও এখানে পদ্মফুল ফুটবে।
এখানে গৌতম ও শংকর ছাড়াও সিপিএমের শরদিন্দু চক্রবর্তী ও কংগ্রেসের আইনজীবী অলোক ধাড়া লড়াই করছেন। ভোটের ময়দানে সবপক্ষই। তৃণমূল ও বিজেপির মতো সিপিএম প্রার্থী শরদিন্দু ওরফে জয়ও ‘ছুতমার্গ’ দূরে সরিয়ে মাথা ঠুকছেন মন্দিরে। তাঁর সারথি হিসাবে ময়দানে রয়েছেন প্রাক্তন মন্ত্রী অশোক ভট্টাচার্য। শরদিন্দুর কথায় আমাদের অভিভাবক অশোকদা। তাই বাম ভোট ফেরাতে তাঁকে নিয়েই লড়ছি।