আজকাল ওয়েবডেস্ক: মুর্শিদাবাদ জেলায় এসআইআর পর্বে ভোটার তালিকায় নাম বাদ যাওয়া ব্যক্তিদের জন্য গঠিত হল অ্যাপিলেট ট্রাইবুনাল। সোমবার রাতে মুর্শিদাবাদের অতিরিক্ত জেলাশাসক (নির্বাচন) এক নির্দেশিকা জারি করে সমস্ত মহকুমা শাসকদের নির্দেশ দিয়েছেন এসআইআর সংক্রান্ত শুনানির সময় জুডিশিয়াল অফিসাররা ভোটার তালিকায় নাম রাখা বা বাদ দেওয়া সংক্রান্ত যে সমস্ত নির্দেশিকা জারি করেছেন তার বিরুদ্ধে আবেদনের শুনানির জন্য অ্যাপিলেট ট্রাইবুনাল গঠন করা হচ্ছে।
মহকুমা শাসকদের আরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যদি কোনও ভোটারের এই সংক্রান্ত কোনও আবেদন থাকে তাহলে দ্রুত তা গ্রহণ করে সেই সংক্রান্ত ডিজিটাল নথি নির্বাচন কমিশনের পোর্টালে আপলোড করার জন্য।
অতিরিক্ত জেলাশাসকের জারি করা এই নির্দেশিকা ইতিমধ্যেই মুর্শিদাবাদের সমস্ত রিটার্নিং অফিসার এবং বিডিওকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।
নির্বাচন কমিশন সূত্রের খবর, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ এবং কলকাতা হাইকোর্টের সুপারিশ অনুযায়ী রাজ্য জুড়ে উনিশটি অ্যাপিলেট ট্রাইবুনাল গঠনের অংশ হিসেবে মুর্শিদাবাদেও এই ব্যবস্থা চালু হল। ভোটারদের আপত্তি শুনে তাঁদের নাম ভোটার তালিকায় পুনর্বহালের সুযোগ দেওয়া হবে এই ট্রাইব্যুনালে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন কমিশনের তরফ থেকে মুর্শিদাবাদ জেলার জন্য যে ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে তাতে ১১ লক্ষের বেশি ভোটারের নাম ‘বিচারাধীন’ তালিকায় ছিল। সোমবার থেকে মুর্শিদাবাদ জেলার বাইশটি বিধানসভা কেন্দ্রে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার কাজ শুরু হয়ে গিয়েছে। ২৮ ফেব্রুয়ারির পর নির্বাচন কমিশন কয়েক দফায় একাধিক সাপ্লিমেন্টারি ভোটার তালিকা প্রকাশ করেছে। তবে কোনও রাজনৈতিক দলের কাছে এখনও স্পষ্ট তথ্য নেই মুর্শিদাবাদ জেলায় মোট কত ভোটারের নাম স্থায়ীভাবে ভোটার তালিকা থেকে শুনানি পর্বে বাদ পড়েছে।
তবে রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের অভিযোগ, সংখ্যালঘু মানুষ অধ্যুষিত মুর্শিদাবাদ জেলার বেশিরভাগ বিধানসভা কেন্দ্রে বেছে বেছে সংখ্যালঘু ভোটারদের নাম তালিকা থেকে স্থায়ীভাবে বাদ দেওয়া হচ্ছে।
সূত্রের খবর, এসআইআর পর্বে ভোটার তালিকা প্রকাশের পর যাদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে বা ভোটার তালিকায় যুক্ত হয়নি তাঁরা উপযুক্ত নথি এসডিও অফিসে জমা করে অ্যাপিলেট ট্রাইবুনালের কাছে নিজেদের নাম ভোটার তালিকায় যুক্ত করার জন্য আবেদন করতে পারবেন।
তবে জেলা প্রশাসনের তরফ থেকে জারি করা নির্দেশিকায় অ্যাপিলেট ট্রাইবুনাল এই সমস্ত আবেদনের শুনানি কত দিনের মধ্যে শেষ করে ভোটারদের নাম তালিকায় তুলতে পারবে সেই সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্যের উল্লেখ নেই।
মুর্শিদাবাদ জেলা তৃণমূল কংগ্রেসের এক নেতা জানান, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ অধ্যুষিত এই জেলায় একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের মানুষদেরকে টার্গেট করে তাঁদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। ট্রাইবুনাল গঠনের সিদ্ধান্তকে আমরা স্বাগত জানাচ্ছি। কিন্তু দ্রুত শুনানি না হলে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে সাধারণ মানুষদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হবে।
অন্যদিকে বিজেপি নেতৃত্বের দাবি এসআইআর প্রক্রিয়া স্বচ্ছ। বেআইনিভাবে নাম বাদ দেওয়ার অভিযোগের কোনও ভিত্তি নেই। যাঁরা প্রকৃত ভারতের নাগরিক তাঁরা ‘ফর্ম ৬’ পূরণ করে অথবা ট্রাইবুনালে আবেদন করে উপযুক্ত নথি জমা দিতে পারলেই ভোটার তালিকায় নাম উঠে যাবে। অ্যাপিলেট ট্রাইবুনাল গঠনের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানালেও গোটা এসআইআর পর্বকে নির্বাচন কমিশনের ‘তুঘলকি কারবার’ বলে আখ্যা দিয়েছেন রাজ্যের বিদ্যুৎ দপ্তরের প্রতিমন্ত্রী তথা রঘুনাথগঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্রের প্রার্থী আখরুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘বিজেপির নির্দেশে নির্বাচন কমিশন যেভাবে মানুষকে হয়রানি, যন্ত্রণা ও মৃত্যুর মুখে ফেলে দিচ্ছে তার কোনও সমালোচনাই যথেষ্ট নয়। মুর্শিদাবাদ জেলার প্রচুর মানুষ পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে ভিন রাজ্যে কাজ করেন। তাঁদের পরিবার কয়েকশো বছর ধরে এই জেলায় বাস করছেন। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়ার পর আতঙ্কিত পরিযায়ী শ্রমিকরা শুনানির জন্য বারবার জেলায় এসেছেন। এখন অ্যাপিলেট ট্রাইবুনাল গঠনের পরও হয়তো তাঁদেরকে সেখানে হাজিরা দেওয়ার জন্য সশরীরে আসতে হবে।’
আখরুজ্জামান আরও বলেন, ‘অ্যাপিলেট ট্রাইবুনাল গঠন হলেও এতে বিচারক কারা থাকবেন, কীভাবে শুনানি হবে সেই বিষয়ে বিস্তারিত কোনও তথ্য আমরা জানিনা। বিজেপির নেতাদের ধারণা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ তাঁদের দলকে ভোট দেয় না। তাই বিজেপির নির্দেশে জাতীয় নির্বাচন কমিশন বেছে বেছে একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দিচ্ছে।’ তিনি আরও জানান, ‘আমার কেন্দ্রে ১.০৯ লক্ষের বেশি ভোটারের নাম ‘বিচারাধীন’ ছিল। তার মধ্যে মাত্র ৩৯ হাজার ‘কেস’ সমাধান হয়েছে। যার মধ্যে ১৫ হাজার ভোটারের নাম স্থায়ীভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে।’
কান্দির বিদায়ী তৃণমূল বিধায়ক তথা শাসক দলের বহরমপুর–মুর্শিদাবাদ সাংগঠনিক জেলা সভাপতি অপূর্ব সরকার বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে ট্রাইবুনাল গঠন করা হয়েছে। আমরা চাইব ট্রাইবুনালে যাঁরা আবেদন করবে তাঁদের শুনানি দ্রুত সম্পন্ন করে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে সকলে যাতে ভোট দিতে পারে তা সুনিশ্চিত করা হয়।’