• কুড়মি নেতার ছেলে প্রার্থী! বিজেপির উপর ক্ষুব্ধ আদিবাসীরা
    বর্তমান | ৩১ মার্চ ২০২৬
  • তন্ময় মল্লিক, পুরুলিয়া: উত্তরবঙ্গে একটা কথা চালু আছে—অনন্ত মহারাজ যেদিকে, রাজবংশী ভোট সেদিকে। সেই জন্যই অনন্ত মহারাজকে নিয়ে বিজেপি-তৃণমূলে এত টানাটানি। বিজেপি তাঁকে রাজ্যসভার সাংসদ করেছে। আবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার বঙ্গবিভূষণ পুরস্কার দিয়েছে। একই অঙ্কে কুড়মি আন্দোলনের নেতা অজিত মাহাতর ছেলেকে টিকিট দিয়েছে বিজেপি। উদ্দেশ্য, কুড়মি ভোট বিজেপিতে টানা। গেরুয়া শিবির একে ‘মাস্টার স্ট্রোক’ ভাবলেও সেটাই হতে পারে ব্যুমেরাং। কারণ, এই সমীকরণেো জঙ্গলমহলের আদিবাসী ভোট বিজেপির হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা প্রবল।

    কুড়মিদের দাবিকে সামনে রেখে বারবার রেল ও রাস্তা অবরোধের ডাক দিয়েছেন অজিত মাহাত। তাতে হাজার হাজার কুড়মি আন্দোলনে শামিল হয়েছেন। এমনকি, কুড়মিসমাজ পঞ্চায়েতের আসনও জিতেছে। পুরুলিয়ার বলরামপুরের পেয়ারা পঞ্চায়েতটি কুড়মিসমাজ, বিজেপি ও সিপিএমের দখলে। এই পঞ্চায়েতের কাটাড়িতে বিনয় গড়াইয়ের লটারির দোকানের সামনে জটলার মাঝে জানতে চাই, কুড়মিদের ভোট কোনদিকে? বিনয় এক যুবকের দিকে ইশারা করে বলেন, ইনি কুড়মি। সেই যুবকের সাফ কথা, ‘ওটা ছিল কুড়মিসমাজের আন্দোলন। তাই আমরা এককাট্টা হয়েছিলাম। তার সঙ্গে ভোটের কোনো সম্পর্ক নেই।’ সেখানে হাজির হলেন বিজেপির পঞ্চায়েত সমিতির সদস্য বঙ্কিম কৈবর্ত্য। তাঁর দাবি, ‘পঞ্চায়েতে আমরা আলাদা লড়ে পরে জোট করেছি। বিধানসভায় সবাই ভোট দেবে বিজেপিকেই।’

    পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, পশ্চিম মেদিনীপুর ও ঝাড়গ্রামে প্রচুর কুড়মি সম্প্রদায়ের মানুষের বাস। ফলে কুড়মি আন্দোলনের মাথা অজিত মাহাতকে টানতে পারলেই কিস্তিমাত, এই আশাতেই তাঁর ছেলে বিশ্বজিৎকে পুরুলিয়ার জয়পুরে টিকিট দিয়েছে বিজেপি। এপ্রসঙ্গে অজিতবাবুর বক্তব্য, ‘দশ বছর তো তৃণমূলকে সমর্থন করলাম। কিন্তু কুড়মিরা কিছুই পায়নি। তাই বিজেপিকে সমর্থন। ছেলে প্রার্থী হয়েছে। কুড়মিরা এবার এককাট্টা।’

    জয়পুরের কোটশিলার বামনিয়ায় পবন কুমারের দশকর্মার দোকান। রামনবমীর দিন কয়েকজন যুবক সেখান থেকে পতাকা কিনছিলেন। ভোটের হাওয়া কোনদিকে? জানতে চাওয়ায় বাঁশের ডগায় পতাকা বাঁধতে বাঁধতেই উত্তর দেয়, ‘বলতে পারব না। আমরা হিন্দু। হিন্দুত্বকে রক্ষা করাই আমাদের উদ্দেশ্য।’ হিন্দু যখন, ভোট তো বিজেপির দিকেই? এবার ঘুরে তাকান যুবকরা। একজন বলেন, ‘এখানে কে প্রার্থী হয়েছে জানেন? অজিত মাহাতর ছেলে। মা দুর্গার ব্লাউজ কে করে, এই প্রশ্ন করেছিলেন তিনি। যিনি মাকে অসম্মান করেন, তাঁকে করব সমর্থন? অসম্ভব।’

    কয়েক পা দূরেই রাম্ভা স্টোর্স। মূলত পান বিক্রি হয়। ভরদুপুরেও দোকানে লোকজন রয়েছে। কেনাকাটার চেয়ে আড্ডাই বেশি। সেখানেও একই প্রশ্ন, ‘এখানে জিতবে কে?’ এবার উত্তর সরাসরি এবং স্পষ্ট, ‘এখানে যিনি বিজেপিকে নেতৃত্ব দেন, তাঁকে টিকিট না দেওয়ায় দলীয় কর্মীরা হতাশ। বিজেপি হয়তো কুড়মি ভোটের আশায় অজিত মাহাতর ছেলেকে প্রার্থী করেছে। তাতে আদিবাসীরা ক্ষুব্ধ।’ 

    ভদ্রলোকের আশঙ্কা যে অমূলক নয়, সেটা টের পাওয়া গেল আদিবাসী অধিকার রক্ষা আন্দোলনের নেতা রাজেন টুডুর কথায়। তিনি বলেন, ‘অজিতবাবুকে সামনে রেখে বিজেপি কুড়মি ভোট পেতে চাইছে। কিন্তু, বেশিরভাগ আদিবাসীই সেটা ভালো চোখে দেখছে না। কারণ কুড়মিরা আমাদের কৃষ্টি, সংস্কৃতি না মেনেই নিজেদের আদিবাসী দাবি করছে।’

    কথায় আছে, মানুষ ভাবে এক, হয় আর এক। লাভের গুড় খাওয়ার লোভে অজিতবাবুর ছেলেকে প্রার্থী করেছে বিজেপি। কিন্তু, সেই গুড় শেষপর্যন্ত পিঁপড়েয় না সাবাড় করে দেয়! 
  • Link to this news (বর্তমান)