ভোটার তালিকা সংশোধনকে ঘিরে রাজ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, নির্বাচন কমিশনের সদিচ্ছা নিয়েই প্রশ্ন উঠছে। যেভাবে যোগ্য ও জীবিত ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে, উপযুক্ত নথিপত্র জমা দিয়েও চূড়ান্ত তালিকায় নাম ওঠেনি, তাতে বিভিন্ন জেলায় বাড়ছে মানুষের বিক্ষোভ। রাস্তা অবরোধ করে, টায়ার জ্বালিয়ে এই ক্ষোভের প্রদর্শন দেখা যাচ্ছে।
নির্বাচন কমিশন আপিল জানানোর জন্য অনলাইন পোর্টাল চালু করলেও, অফলাইনে আবেদন কীভাবে করা যাবে তা নিয়ে স্পষ্ট নির্দেশ দেয়নি। ফলে বিভ্রান্তিতে পড়েছেন বহু ভোটার।
কমিশনের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এই অনিশ্চয়তা বিশেষ করে গ্রামীণ ও প্রযুক্তিতে অনভ্যস্ত মানুষের ক্ষেত্রে সমস্যার কারণ হতে পারে। তাঁদের আশঙ্কা, পর্যাপ্ত নির্দেশিকা না থাকলে বহু মানুষ সময়সীমার মধ্যে আপিল জানাতে না পেরে ভোটাধিকার হারাতে পারেন।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৬০ লক্ষ নাম যাচাইয়ের জন্য পাঠানো হয়েছিল। তার মধ্যে ৪০ লক্ষ মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে। এই নিষ্পত্তির মধ্যে প্রায় ১৮ লক্ষ আবেদন খারিজ হয়েছে। চারটি সম্পূরক তালিকায় মোট প্রায় ৩৫ লক্ষ নাম প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে কিছু ভোটার তাঁদের অধিকার ফিরে পেয়েছেন, আবার অনেকে তা হারিয়েছেন। এখনও প্রায় ৫ লক্ষ নাম চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
তালিকার শীর্ষে উল্লেখ করা হয়েছে, নাম বাদ পড়লে ১৫ দিনের মধ্যে আপিল জানাতে হবে। তবে এই সময়সীমা কবে থেকে গণনা শুরু হবে, তা নিয়ে কমিশনের পক্ষ থেকে এখনও স্পষ্ট কিছু জানানো হয়নি। ফলে অনেকেই নির্দিষ্ট সময়সীমা নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন।
কমিশনের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, অফলাইনে আবেদন জমা দেওয়া যাবে জেলাশাসক (ডিএম) বা মহকুমাশাসকের (এসডিও/ এসডিএম) দপ্তরে। তবে বাস্তবে সেই প্রক্রিয়া এখনও পুরোপুরি চালু হয়নি বলে অভিযোগ উঠছে। কীভাবে আবেদন জমা দিতে হবে, কী কী নথি প্রয়োজন, এসব বিষয়েও স্পষ্ট নির্দেশের
অভাব রয়েছে।
গ্রামীণ এলাকায় এই সমস্যা আরও প্রকট। পূর্ব বর্ধমানের এক বাসিন্দা জানিয়েছেন, তিনি অনলাইনে আবেদন করতে জানেন না এবং এখনও অফলাইন প্রক্রিয়া চালু হয়েছে কিনা সে বিষয়ে নিশ্চিত নন। মুর্শিদাবাদের কয়েকজন বাসিন্দাও জানিয়েছেন, তাঁরা জেলা প্রশাসনের দপ্তরে যোগাযোগ করেও স্পষ্ট নির্দেশ পাননি। প্রসঙ্গত, একাধিক মুসলিম-অধ্যুষিত এলাকায় উপযুক্ত নথি ও প্রমাণপত্র থাকা সত্ত্বেও বহু মানুষের নাম বাদ গিয়েছে। বাদ গিয়েছে বহু আদিবাসী, প্রান্তিক মানুষ ও নারীদের নাম।
নামের বানানগত ত্রুটি বা তথ্যগত অসঙ্গতির কারণে বহু মানুষের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে বলে জানা যাচ্ছে। সংশোধনের সুযোগ না পেলে এই ভোটারদের ভোটাধিকার হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
শহর কলকাতাতেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। জোড়াসাঁকো বিধানসভা কেন্দ্রের একাধিক বাসিন্দা জানিয়েছেন, তাঁদের বা তাঁদের পরিবারের সদস্যদের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। আপিল প্রক্রিয়া সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা না থাকায় তাঁরা উদ্বেগে রয়েছেন।
এদিকে বুথ লেভেল অফিসারদের (বিএলও) ওপরও চাপ বাড়ছে। তাঁরা জানিয়েছেন, ভোটারদের কাছ থেকে নিয়ম মেনে নথি সংগ্রহ ও আপলোড করা হলেও এখন নাম বাদ পড়ায় তাঁদের কাছেই জবাব চাইছেন সাধারণ মানুষ। একাধিক বিএলও জানিয়েছেন, তাঁরা প্রতিদিন বহু ফোন ও প্রশ্নের মুখোমুখি হচ্ছেন।
নির্বাচন কমিশন আপিল শুনানির জন্য ১৯টি ট্রাইব্যুনাল গঠন করেছে। তবে সব ট্রাইব্যুনালের বিচারকরা কলকাতার জোকায় একটি নির্দিষ্ট কেন্দ্রে, ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ ম্যানেজমেন্ট (আইআইএম)-এ, বসবেন বলে জানা গিয়েছে। এর ফলে দূরবর্তী জেলার বাসিন্দাদের সেখানে গিয়ে শুনানিতে অংশ নেওয়া কঠিন হবে।
সমগ্র পরিস্থিতি নিয়ে ইতিমধ্যেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে— প্রক্রিয়াটি শুরু করার আগে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছিল কি না এবং প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থার পাশাপাশি বিকল্প ব্যবস্থা যথেষ্ট ছিল কি না।
নাগরিকদের একাংশের মতে, দ্রুত স্পষ্ট নির্দেশিকা প্রকাশ, অফলাইন আবেদন প্রক্রিয়া সক্রিয় করা এবং স্থানীয় স্তরে সহায়তা ব্যবস্থার উন্নয়ন না হলে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বহু ভোটারই অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন— তাঁদের নাম তালিকায় ফিরবে কি না এবং সময়মতো আপিল জানাতে পারবেন কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনও স্পষ্ট নয়। দ্রুত নির্দেশিকা জারি ও প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা না এলে এই অনিশ্চয়তা আরও বাড়বে।