এই সময়: নির্বাচন কমিশনে (ইসি) বস্তা ভর্তি ফর্ম–৬ জমা দিয়ে ভিন রাজ্যের ৩০ হাজার লোকের নাম ভোটার তালিকায় তোলার চেষ্টা হচ্ছে বলে সোমবারই অভিযোগ করেছিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই অভিযোগ নিয়ে কিছু ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল কমিশন। তবে তাতে বিতর্ক তো চাপা পড়েইনি, উল্টে মঙ্গলবার এ নিয়ে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠল। এ দিন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক নতুন করে অভিযোগ করলেন, নিয়ম বহির্ভূত ভাবে ফর্ম–৬ ব্যবহার করে বিহারের ৮০০ লোকের নাম ভোটার তালিকায় যুক্ত করার চেষ্টা হচ্ছে। খোদ রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের (সিইও) দপ্তরে এই ভাবে ফর্ম–৬ গ্রহণ সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের সম্পূর্ণ বিরোধী বলে উল্লেখ করে এ দিনই দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারকে কড়া চিঠি দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও। চিঠিতে তিনি অভিযোগ তুলেছেন, কমিশনে ফর্ম–৬ জমা দিয়ে যাঁদের নাম ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা হচ্ছে, তাঁরা বাংলার বাসিন্দা নন।
বস্তুত ফর্ম–৬ ইস্যুতেই বিজেপি ও তৃণমূল সমর্থকদের সংঘাতের জেরে এ দিন স্ট্র্যান্ড রোডে শিপিং কর্পোরেশনের বিল্ডিংয়ে সিইও দপ্তরের সামনে ধুন্ধুমার বেধে যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বড় পুলিশ বাহিনী মোতায়েন করা হয়। পাঠানো হয় কেন্দ্রীয় বাহিনীকেও। দু’পক্ষের মধ্যে ইট–পাটকেল ছোড়াছুড়ি শুরু হলে পুলিশ লাঠি উঁচিয়ে দু’পক্ষকে ধাওয়া করে। শুধু প্রতিবাদ বা সিইসি–কে চিঠি নয়, ভুয়ো ফর্ম–৬ জমার অভিযোগ তুলে এ দিন পুলিশেও অভিযোগ দায়ের করেছে তৃণমূল। হেয়ার স্ট্রিট থানায় তৃণমূল নেতা বৈশ্বানর চট্টোপাধ্যায়ের অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, ‘সিইও অফিসে বিজেপির তরফ থেকে বেআইনি ভাবে গণ হারে ফর্ম–৬ জমা পড়েছে।’ এ নিয়ে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার প্রতারণা, জালিয়াতি সংক্রান্ত একাধিক ধারার পাশাপাশি জনপ্রতিনিধিত্ব আইনেও মামলা রুজুর আর্জি জানানো হয়েছে। দিনের শেষে ফর্ম–৬ নিয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছেন সিইও মনোজ আগরওয়াল। ফর্ম–৬ পূরণ করে ভিন রাজ্যের ভোটারদের নাম তোলার চেষ্টা হচ্ছে বলে যে অভিযোগ তুলেছেন জোড়াফুল নেতৃত্ব, তা–ও খারিজ করেছেন সিইও।
সিইও অফিসের সামনে তৃণমূলপন্থী বিএলও–দের একাংশের বিক্ষোভ–অবস্থান আগে থেকেই চলছিল। এক ব্যক্তি এ দিন সকালে সন্দেহজনক কিছু কাগজের বান্ডিল নিয়ে ঢুকছিলেন, এই অভিযোগে তাঁকে পাকড়াও করেন এই বিএলও–রা। এ নিয়েই শুরু হয় অশান্তি। সেই সময়ে বিজেপি নেতা সন্তোষ পাঠকের নেতৃত্বে গেরুয়া শিবিরের একদল কর্মী–সমর্থক চলে এলে বিএলও সংগঠনের সদস্যদের সঙ্গে তাঁদের মারামারি শুরু হয়ে যায়। এই পরিস্থিতিতে পুলিশ বলপ্রয়োগ করে বলে অভিযোগ উঠেছে। সিইও মনোজ তৃণমূলের অভিযোগ খারিজ করে দিলেও এ দিন সন্ধেয় রাজ্যের শিল্পমন্ত্রী শশী পাঁজা সাংবাদিক বৈঠক করে একাধিক ভিডিয়ো দেখিয়েছেন (যার সত্যতা ‘এই সময়’ যাচাই করেনি)। সেই ভিডিয়োতে দেখা যাচ্ছে, কপালে গেরুয়া তিলক থাকা এক ব্যক্তি ব্যাগে করে বান্ডিল বান্ডিল কাগজ নিয়ে সিইও অফিসে ঢুকছেন। এই ঘটনাপরম্পরা দেখেই তৃণমূল নেতৃত্ব আরও জোরালো ভাবে ভোটার তালিকায় ভিন রাজ্যের লোকের নাম ঢোকানোর অভিযোগে সরব হয়েছেন।
দক্ষিণ দিনাজপুরের বালুরঘাটের সভায় অভিষেক এ নিয়ে তোপ দেগেছেন। তাঁর কথায়, ‘সিইও দপ্তরে আমি গতকাল (সোমবার) সন্ধ্যায় পৌঁছে এদের চুরি হাতেনাতে ধরেছি। আমি মঙ্গলবার যখন বালুরঘাটের উদ্দেশে রওনা দিচ্ছিলাম, তখন আমার কাছে খবর আসে আজও (মঙ্গলবার) প্রায় ৮০০ অবৈধ বিহারের ভোটারকে মেদিনীপুরে অ্যাড করার চেষ্টা হয়েছে। বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে বিজেপি পুরোপুরি জনবিন্যাস বদল করে দিতে চাইছে।’ সন্ধেয় এক্স হ্যান্ডলে একটি পোস্ট করেন তৃণমূলের লোকসভার দলনেতা। সেখানে মহারাষ্ট্র–সহ অন্য কয়েকটি রাজ্যে বিধানসভা ভোটের আগে একই ভাবে ভিন রাজ্যের ভোটারের নাম লিস্টে তোলার চেষ্টা করেছিল বিজেপি— এই অভিযোগ করেছেন তিনি। অভিষেক লিখেছেন, ‘ভোটার তালিকায় কারচুপির নোংরা খেলায় বিজেপি এখন সিদ্ধহস্ত। দিল্লি ও মহারাষ্ট্রে ওয়ার্ম-আপের পরে এখন তারা বাংলায় আসল ম্যাচ খেলছে। মহারাষ্ট্রে ৫ বছরে ৪৩,৮৪,৮১৪ জন ভোটার যুক্ত হওয়ার পরে, মাত্র ৫ মাসে আরও ৪০,৮১,২২৯ জন যুক্ত হয়েছেন। দিল্লিতে ৪ বছরে ৪,১৬,৬৪৮ জনের পরে, মাত্র ৭ মাসে বেড়েছে আরও ৩,৯৯,৩৬২ জন। আমি আগেই সতর্ক করেছিলাম যে আসল কারচুপি ইভিএমে নয়, হয় ভোটার তালিকায়। বাংলা এখন ঠিক সেটাই দেখছে।’ তাঁর সংযোজন, ‘বিজেপি যখন ‘পাল্টানো দরকার’ বলেছিল, তারা আসলে ‘ভোটার তালিকা পাল্টানো দরকার’ বুঝিয়েছিল। তাদের ‘পরিবর্তন’-এর অর্থ আসলে বাংলার নিজস্ব ভোটারদের সরিয়ে বিজেপি-শাসিত রাজ্য থেকে আনা বহিরাগতদের জায়গা দেওয়া।’
তৃণমূলনেত্রী মমতাও এ দিন তাঁর তিনটি নির্বাচনী সভায় ফর্ম–৬ নিয়ে সরব হয়েছেন। পশ্চিম মেদিনীপুরের চন্দ্রকোণায় মমতা বলেন, ‘অভিষেক সোমবার তাড়াতাড়ি মিটিং ছেড়ে চলে এলো। আমি জিজ্ঞেস করলাম কী হয়েছে? বলল, দিদি তুমি জানো না, নতুন করে ৩০ হাজার ফর্ম জমা দিয়েছে! আমি বললাম সে কী!’ তাঁর সংযোজন, ‘বিহার থেকে নতুন করে নাম এনে ঢোকাচ্ছে। রাজস্থান, হরিয়ানা, উত্তরপ্রদেশের লোকের নামও ঢোকাচ্ছে। বিহারে যে ভাবে রেলে করে লোক নিয়ে এসে ভোট করিয়েছিল, সেই ভাবে বাংলাতেও ট্রেনে করে (লোক) নিয়ে এসে এরা (বিজেপি) খড়্গপুরে, আসানসোলে ভোট দেওয়াবে।’ যদিও তৃণমূল নেতৃত্বের এই অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে কেন্দ্রীয় শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার বলেছেন, ‘আপনাদের কাছে তথ্যপ্রমাণ থাকলে কোর্টে গিয়ে জমা দিন। কেন কোর্টে যাচ্ছেন না? আপনাদের তো বড় বড় আইনজীবী রয়েছে। আপনারা–ই প্রচুর অনুপ্রবেশকারী রাজ্যে ঢুকিয়েছেন।’
সিইসি–কে মমতা যে দীর্ঘ চিঠি লিখেছেন, সেখানে তিনি এই ভাবে ফর্ম–৬ জমা দেওয়া কেন অবৈধ, তা ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর বক্তব্য, ‘সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট জানিয়েছে, নাম সংযোজন অথবা বিয়োজনের বিষয়ে একমাত্র সিদ্ধান্ত নেবেন অ্যাজুডিকেটিং অফিসার। সে ক্ষেত্রে ভোটার তালিকায় নাম তোলার জন্য সিইও অফিসের প্রায় ৩০ হাজার আবেদন গ্রহণ সম্পূর্ণ বেআইনি। এই ধরনের আবেদনে সাড়া না দেওয়ার জন্য অনুরোধ করছি।’ তাঁর সংযোজন, ‘বিজেপির এজেন্টরা সিইও অফিস এবং জেলায় জেলায় বিপুল সংখ্যায় ফর্ম–৬ জমা দিয়েছে। এগুলো (নাম তোলার) রুটিন আবেদন নয়। পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা নয়, এমন লোকের নাম জালিয়াতির মাধ্যমে ভোটার তালিকায় যুক্ত করার চেষ্টা হচ্ছে। বিহার, হরিয়ানা, দিল্লি, মহারাষ্ট্রে বিধানসভা নির্বাচনের আগেও একই প্যাটার্ন দেখতে পাওয়া গিয়েছিল।’
সন্ধেয় সাংবাদিক বৈঠকে শশীর দাবি, ‘যাদের নামে ফর্ম–৬ জমা পড়ছে, তারা কারা? কোন জেলার ফর্ম? এগুলো ভুয়ো ফর্ম–৬। বিহার, ঝাড়খণ্ড থেকে আনা হচ্ছে।’ বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী, বিজেপি–র রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য, দলীয় নেতা শিশির বাজোরিয়া মঙ্গলবার দুপুরে সিইও অফিসে স্মারকলিপি জমা দিতে গিয়েছিলেন। শশী পাঁজার অভিযোগ, ‘সেই সময়ে বান্ডিল বান্ডিল ফর্ম ঢুকেছে। পূর্ব মেদিনীপুরের একজনকে ওখানে অনেকে ধরেছে। ৪০০ ফর্ম–৬ নিয়ে এসেছিল।’ যদিও শিশিরের পাল্টা বক্তব্য, ‘সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন অভিযোগ। ওখানে সমস্ত মিডিয়া উপস্থিত ছিল। আমরা যদি বস্তায় করে ফর্ম–৬ নিয়ে যেতাম, সবাই দেখতে পেত।’
দিনভর তোলপাড়ের পরে সন্ধেয় সিইও মনোজ ব্যাখ্যা দেন, সারা বছর ফর্ম–৬ এর মাধ্যমে আবেদন করা যায়। নতুন ভোটার বা যাঁদের নাম তালিকায় নেই, তাঁরা এই আবেদন করতে পারেন। তাঁর সংযোজন, ‘আমি কারও নাম তালিকায় জুড়তে বা বাদ দিতে পারি না। এই ক্ষমতা সিইও বা ডিইও–র নেই। শুধুমাত্র ইআরও–র আছে।’ তা হলে এত বান্ডিল বান্ডিল ফর্ম যে সিইও অফিসে আসছে, সেগুলো কী? মনোজের ব্যাখ্যা, ‘যে কোনও সরকারি দপ্তরে প্রতিদিনই প্রচুর নথিপত্র আসে। সেগুলো ডকিং (তালিকাভুক্ত) করা হয়, রেকর্ডও রাখা হয়। সিনিয়র অফিসাররা সেই আবেদন বিবেচনা করে নিজেরা গ্রহণ বা বাতিল করেন অথবা আমার কাছে পাঠান। আমি জেনেছি, কিছু ফর্ম আমার অফিসে জমা পড়েছে। অফিসাররা তা খতিয়ে দেখছেন। প্রাথমিক ভাবে কিছু ফর্ম দেখা হয়েছে। তাতে দেখা গিয়েছে, নোয়াপাড়া থেকে ১০৭টি আবেদন জমা পড়েছে। তার মধ্যে ফর্ম–৬ও আছে।’
তা হলে তো ভিন রাজ্যের ভোটারদের নাম ফর্ম–৬ এর মাধ্যমে তোলার যে অভিযোগ অভিষেক করেছিলেন, তার সত্যতা রয়েছে?
সিইও–র দাবি, ‘সেটা ঠিক নয়। ২৮ ফেব্রুয়ারি চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় যাঁদের নাম বাদ পড়েছে, এগুলো তাঁদেরই আবেদন। নিয়ম মেনে তাঁরা ডিইও–র কাছে আবেদন করেছিলেন। তাঁরা সিইও–র কাছেও আবেদন করতে পারেন। আলাদা করে ভোটার তালিকায় নাম তোলার ফর্ম–৬ এগুলো নয়। যাঁদের নাম বাদ পড়েছিল, তাঁদের পাশাপাশি কিছু নতুন (ফ্রেশ) ভোটারও নাম তোলার জন্য আবেদন করেছিলেন ইআরও–র কাছে। সেগুলির নিষ্পত্তি না–হওয়ায় সিইও অফিসে পাঠিয়েছেন।’ তবে তিনি জানান, আইনমাফিক কোনও কেন্দ্রে ভোটের মনোনয়ন জমার শেষ তারিখের দশ দিন আগে থেকে ফর্ম–৬ গ্রহণ করা হয় না। সেই মতো প্রথম পর্যায়ের ভোটের ক্ষেত্রে ২৭ মার্চের পরে ও দ্বিতীয় পর্যায়ের ক্ষেত্রে ৩০ এপ্রিলের পরে নতুন ফর্ম–৬ গ্রহণ করা হয়নি।’