• কাগজ দেখিয়েও নাম ওঠেনি তালিকায়, দিবারাত্রি সঙ্গী ভয়
    এই সময় | ০১ এপ্রিল ২০২৬
  • জয় সাহা

    সময়টা ২০১৯। সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল একটা স্লোগান—‘কাগজ আমরা দেখাব না’ (কাগজ় হাম নেহি দিখায়েঙ্গে)! সে বার এনআরসি বিরোধী আন্দোলনের মূল সুরটা বেঁধে দিয়েছিল এই স্লোগানই। বাংলাতেও বহু মানুষ এই স্লোগান সামনে রেখেই উত্তাল করেছিলেন রাজপথ। তার পরে অবশ্য করোনাকাল শুরু হয়। সব কিছুর সঙ্গেই থমকে যায় সেই কাগজ না দেখানোর আন্দোলনও। তার ঠিক সাত বছর পরে বাংলায় ‘সার’ প্রক্রিয়া ঘিরে সেই স্লোগানটাই আবার অন্য ভাবে ফিরে এসেছে। মূলত গেরুয়া শিবিরের পক্ষ থেকে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল—‘কাগজ এ বার দেখাতেই হবে, নইলে দেশ ছাড়তে হবে!’ দীর্ঘ ‘সার’ প্রক্রিয়ায় নির্বাচন কমিশনের ঠেলায় নিজেদের নাগরিক প্রমাণে সত্যিই এ বার কাগজ দেখাতে হয়েছে বেবাক নাগরিককে। কিন্তু কাগজ দেখানোর পরেও রাজ্যজুড়ে এমন বহু মানুষ রয়েছেন যাঁদের নাম নেই ভোটার তালিকায়। তাঁদের অনেকেরই আশঙ্কা, নাগরিকত্ব থাকবে তো! ইলেকশন কমিশনের নির্দিষ্ট করা কাগজ দেখানোর পরেও তাঁরা ভোটার লিস্টের বাইরে থেকে গিয়েছেন। উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠাই এখন তাঁদের নিত্যসঙ্গী। সবারই প্রশ্ন, ‘আর কত কাগজ দেখাতে হবে?’

    হুগলির খানাকুলের হেলান গ্রামের বছর ৩১–এর শেখ মিজানুর রহমানের নাম বাদ পড়েছে। মিজানুর জানাচ্ছেন, প্রথম দফায় নাম বাদ পড়ার পরে তিনি হিয়ারিংয়ে ডাক পেয়েছিলেন। সেখানে গিয়ে নিজের ভোটার, প্যান, আধার কার্ড ছাড়াও মাধ্যমিকের অ্যাডমিট কার্ড, বাড়ির দলিল ও অন্য কাগজপত্র জমা করেন। তার পরেও তাঁর নাম তালিকায় নেই। মিজানুরদের গ্রামে এমন ২০০ জনের মতো রয়েছেন যাঁরা কাগজ দেখানোর পরেও বাদ পড়েছেন। অসহায় মিজানুরের বক্তব্য, ‘প্রায় একই কাগজে আমার বাড়ির বাকি ৫ জনের নাম এলেও আমার নাম বাদ পড়েছে। বার বার বিএলও–র সঙ্গে যোগাযোগ করছি। কিন্তু তিনিও কোনও দিশা দেখাতে পারছেন না। কী ভাবে প্রমাণ করব আমি কে?’

    মিজানুরের জেলাতেই রামমোহনপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের বাসিন্দা ৬৮ বছরের নেপিসা বেগম আধার–ভোটার বাদ দিয়েও ওবিসি সার্টিফিকেট, ওয়ারিশন সার্টিফিকেট, বাবার ডেথ সার্টিফিকেট, জমির দলিল দেখিয়েছেন। কিন্তু নাম ওঠেনি। ১১ জনের পরিবারে নেপিসা ও আর এক জনের নাম ওঠেনি। নেপিসা জানাচ্ছেন, তাঁদের গ্রামে এমন ১৯৪ জন রয়েছেন, যাঁদের জন্ম সেখানেই। কাগজপত্র দেখানোর পরেও নাম ওঠেনি তালিকায়। তিনি বলেন, ‘গ্রামের সবাই মিলে ভোট বয়কটের কথা বলছে। কিন্তু সেটা তো সমাধান নয়। আমি এ দেশে জন্মেছি। এ দেশের নাগরিক হয়েই মরতে চাই।’

    শ্রীরামপুরের তৃণমূল প্রার্থী তন্ময় ঘোষের প্রচারে গিয়ে নিজের ক্ষোভ উগরে দেন সেখানকার বধূ স্বপ্না বড়ুয়া। তাঁর দাবি, তিনি ২০০৬–এ ওই এলাকায় আসেন বিয়ের পরে। ছোটবেলা কেটেছে ধানবাদে। বাবা–মা ছোটবেলায় মারা যান। তখন তিনি এতটাই ছোট যে বাবা–মায়ের মৃত্যুর কাগজপত্র যে রেখে দিতে হয়, সেই জ্ঞান ছিল না। ২০০২–এ তিনি ধানবাদের ভোটার ছিলেন। সেই কাগজ দেখানোর পরেও স্বপ্নার নাম ওঠেনি। তাঁর প্রশ্ন, ‘দেশের নাগরিক হয়ে কেন আমাকে প্রমাণ করতে হবে যে আমি এ দেশেই জন্মেছি?’

    এমন আরও অনেক উদাহরণ রয়েছে। যেমন ভাঙরের বাপি মোল্লা বা কলকাতার বড়বাজারের বিরজু শঙ্কর, তাঁর স্ত্রী প্রতিমা শঙ্কর, ভাই বীরু শঙ্কর আর বৃদ্ধা মা। তাঁরাও কমিশনের নির্দিষ্ট করে দেওয়া নানা কাগজ দেখিয়েছেন। কিন্তু লাভ হয়নি। প্রতিমা বলছেন, ‘আজকে ৭০–৮০ বছর ধরে এখানে আছি। জন্মকর্ম সব এখানেই। আর কোন কাগজ দেখালে নাম উঠবে?’ সদুত্তর এখনও খুঁজে পাননি কেউই।

  • Link to this news (এই সময়)