• নকশালবাদ কি খতম, মানছে না নকশালবাড়ি
    এই সময় | ০১ এপ্রিল ২০২৬
  • সঞ্জয় চক্রবর্তী, নকশালবাড়ি

    সোমবার সংসদে দাঁড়িয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ঘোষণা করেছেন, ৩১ মার্চ, মঙ্গলবার থেকে ভারত 'নকশাল–মুক্ত'। তবে ভোটের ব্যস্ততার মাঝে নকশাল আন্দোলনের আঁতুড় শিলিগুড়ির নকশালবাড়ি শাহি–ঘোষণায় বিশেষ আমল দিতে চাইছে না।

    ২৩ এপ্রিলের নির্বাচন নিয়ে নকশালবাড়ি এখন ব্যস্ত। এরই মাঝে ভরদুপুরে বেঙ্গাইজোতে কমিউনিস্ট নেতাদের মূর্তির সামনে পড়ে থাকা শুকনো পাতা সরাচ্ছিলেন পলিন সিংহ। ২২ এপ্রিল এখানে পালিত হবে লেনিনের জন্মদিন। দেশের নানা প্রান্তের কমিউনিস্ট নেতারা আসবেন। তারই প্রস্তুতি চলছে। শাহর 'নকশাল–মুক্ত ভারত' নিয়ে পলিনের মন্তব্য, '২২ এপ্রিল বেঙ্গাইজোতে এলেই ভুল ভেঙে যাবে।'

    ১৯৬৭–র ২৪ মে। আদিবাসী কৃষকদের বিক্ষোভ থেকে ছোড়া তিরে পুলিশ ইনস্পেক্টর সোনম ওয়াংদির মৃত্যু হয়। ২৫ মে নকশালবাড়ির প্রসাদুজোতে কৃষকদের জমায়েতে গুলি চালায় পুলিশ। নিহত হন আট মহিলা, দুই শিশু–সহ ১১ জন। ঘটনার পরে শিলিগুড়ি সংলগ্ন নকশালবাড়ি থেকে যে গণ অভ্যুত্থানের সূচনা হয়েছিল, তা–ই পরবর্তীতে নকশালবাড়ি আন্দোলন নামে বাংলা–সহ ভারতের নানা রাজ্যে ছড়িয়েছে। চিনের পিকিং রেডিও তখন বলেছিল, 'বসন্তের বজ্রনির্ঘোষ'। আন্দোলনকারীরা 'নকশাল' নামে পরিচিতি পান। চারু মজুমদার, কানু সান্যাল, জঙ্গল সাঁওতাল, শান্তি মুন্ডা, খোকন মজুমদার, মুজিবর রহমান, খুদন মল্লিকরা সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তবে বর্তমানে নকশালরা শতধাবিভক্ত। অজস্র দল, গোষ্ঠী, সংগঠন আজও নকশালবাড়ির 'পথ' কিংবা 'স্পিরিট'–কে সামনে রেখে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। মাওবাদী আন্দোলনের রেশ কোনও কালেই সে ভাবে পড়েনি নকশালবাড়িতে। শপিং মল, ঝাঁ চকচকে হাইওয়ে, কলেজ, রেস্তোরাঁ— অন্য চেহারা। তবে এ সবের মধ্যেও একটা নকশালবাড়ি রয়েছে— যেখানে দারিদ্রই মানুষের নিত্যসঙ্গী। একসময়ে 'লাঙল যার জমি তার' স্লোগানে জোতদারদের উপরে আক্রমণ চলত। পরে অনেকে জমির মালিকানাও পেয়েছিলেন। কিন্তু বর্তমানে সেই জমিতে চাষবাস খুব একটা হচ্ছে না। কাজের খোঁজে ভিনর‍াজ্যে পাড়ি দেওয়ার ভিড় ক্রমশ বাড়ছে।

    নকশালবাড়ির কাছে হাতিঘিসার সেবদেল্লাজোত গ্রাম, যা পরিচিত নকশাল নেতা প্রয়াত কানু সান্যালের জন্য। একটা সময়ে কাঁচা রাস্তা ছিল। পাকা হয়েছে। পানীয় জল, বিদ্যুতের ব্যবস্থা রয়েছে। রয়েছে স্বাস্থ্যকেন্দ্রও। কানুর বাড়িটাই 'সিপিআই (এমএল), কানু সান্যালপন্থী' দলের কার্যালয়। আজও নিয়ম করে মিটিং হয়। পাশেই কানুর এক সময়ের সহযোগী শান্তি মুন্ডার বাড়ি। 'নকশালবাদ খতম' হয়েছে কি না জানতে চাইতেই অশীতিপর বৃদ্ধার চোখ দুটো জ্বলে উঠল। বললেন, 'নকশালবাদ খতম করবে কে? যতদিন মানুষের অভাব থাকবে, নকশালবাদও থাকবে।' নকশালবাদ এবং মাওবাদকে এক করে দেখতে নারাজ সেবদেল্লাজোতের বাসিন্দা, আর এক নকশালনেত্রী দীপু হালদার। তাঁর কথায়, 'স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কথায় গুরুত্ব দিতে চাই না। নকশালবাদের সঙ্গে মাওবাদকে গুলিয়ে ফেলেছেন। নকশালবাড়ি ভুলবে না সেই আন্দোলনকে।'

    চারু মজুমদারের ছেলে, সিপিআই (এমএল) লিবারেশনের পলিটব্যুরো সদস্য অভিজিৎ মজুমদার অবশ্য মনে করেন, 'শাসকরা এ ভাবেই কথা বলে।' তাঁর কথায়, '৬৭–র নকশাল আন্দোলনের সময়েও কংগ্রেস রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস নামিয়ে নকশালদের খুন করে। কংগ্রেস জমানাতেই আমার বাবা পুলিশি নির্যাতনে প্রাণ হারান। তার পরে নকশালবাদ খতম বলে ঘোষণা করা হয়। অমিত শাহও সেটাই করেছেন। এত সহজে কোনও আদর্শ শেষ হয় না।' 'নকশাল–মুক্ত ভারত' ঘোষণার আড়ালে ছত্তিসগড়ের খনিজ সম্পদ বেসরকারি পুঁজিপতিদের হাতে তুলে দেওয়াই কেন্দ্রের উদ্দেশ্য বলে অভিযোগ করেন তিনি।

    সিপিএমের সঙ্গে একসময়ে আদায়-কাঁচকলায় সম্পর্ক ছিল নকশালদের। সেই সিপিএমও ছত্তিসগড়ে 'নকশাল–দমন'–এর বিরোধিতা করেছে। নকশালবাড়ির সিপিএম নেতা গৌতম ঘোষ বলেন, 'আমাদের সঙ্গে নকশালদের আন্দোলনের ধারা আলাদা। কিন্তু তাই বলে কোনও আদর্শকে শেষ করা সহজ নয়। ছত্তিসগড়ে যা চলছে, তা মানা যায় না। অমিত শাহ যদি ভোটপ্রচারে নকশালবাড়িতে আসেন, কেউ না–হোক, আমি ব্যক্তিগত ভাবে কালো পতাকা দেখাতে যাব।'

  • Link to this news (এই সময়)