এই সময়: শিশু শ্রমিকের অস্তিত্ব নেই। বন্ডেড লেবার বা দাস শ্রমিকও নেই — বেশ কয়েক বছর ধরে এ কথাই বলে এসেছে রাজ্য সরকার। কিন্তু শহরের কারখানা হোক বা শহরতলির কোনও দোকান, বা হাইওয়ের পাশে ধাবা বা ইটভাটা — তাদের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো বেশি। কেউ এ রাজ্যের, কেউ আবার ভিন রাজ্যের। কেউ শিশু শ্রমিক আবার কেউ বা মালিকের সৌজন্যে পরিবার–সহ ‘বন্ডেড লেবার।’ তা হলে এরা কারা? ওঁরা প্রত্যেকেই নির্যাতিত শ্রমিক, কেউ ১৮–র নীচে, কেউ তার উপরে। এর বাস্তবতা একটি আলোচনাচক্রে মেনে নিল রাজ্য সরকারের প্রতিনিধিরা ও রাজ্য মানবাধিকার কমিশন।
সোমবার কলকাতার ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অফ জুরিডিক্যাল সায়েন্সেস’ (WBNUJS)-এ আয়োজিত এক উচ্চস্তরের কনসাল্টেশনে উঠে আসে বাস্তবে শ্রম শোষণের পরিমাণ অনেক বেশি হলেও সরকারি নথিতে তার প্রতিফলন খুবই সীমিত। ইটভাটা, গৃহস্থালী কাজ, নির্মাণ ক্ষেত্র ও অভিবাসন-নির্ভর কর্মসংস্থানে শ্রম পাচার ছড়িয়ে থাকলেও বিভিন্ন দপ্তরের আলাদা ডেটা ব্যবস্থার কারণে প্রকৃত চিত্র পুরোটা সামনে আসে না। কারণ, সমন্বয়ের অভাব। ফলে অনেক কিছু নজর এড়িয়ে যায়। WBNUJS এবং ইন্ডিয়ান সোসাইটি অফ ক্রিমিনোলজির যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই আলোচনা সভায় লেবার ট্র্যাফিকিং ও বন্ডেড লেবার রুখতে প্রতিরোধ, উদ্ধার, পুনর্বাসন, ক্ষতিপূরণ ট্র্যাকিং এবং অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে সেন্ট্রালাইজ়ড, নির্ভরযোগ্য ও ইনটিগ্রেটেড ডেটা সিস্টেম গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তায় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গ মানবাধিকার কমিশনের সদস্য তথা প্রাক্তন মুখ্যসচিব বসুদেব বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘রাজ্য ও কেন্দ্রের বিভিন্ন দপ্তর — শ্রম, মহিলা ও শিশু কল্যাণ, পুলিশ, বিচারব্যবস্থা — সব জায়গাতেই আলাদা আলাদা তথ্যভাণ্ডার রয়েছে। ফলে সমন্বয়ের অভাব থেকেই যাচ্ছে।’ তিনি স্পষ্ট জানান, গ্রামীণ স্তরে বহু অপরাধের রিপোর্টই হয় না। লজ্জা বা সামাজিক চাপে অনেকেই অভিযোগ জানাতে চান না। তাই আন্ডার রিপোর্টিংয়ের বিষয়টি মাথায় রেখে এমন ব্যবস্থা গড়তে হবে, যাতে মানুষ অভিযোগ করতে উৎসাহিত হন।
প্রায় সব বক্তাই সহমত হন যে, সরকারি হিসেবে বন্ডেড লেবার–এর ঘটনা কম দেখা গেলেও নিখোঁজ ব্যক্তি, ইরেগুলার মাইগ্রেশন বা না জানিয়ে অন্যত্র চলে যাওয়া ও ভালনারেবল ডিস্ট্রিক্ট–এ আন্ডার রিপোর্টিং ও তথ্য না দেওয়া বড় সঙ্কটের ইঙ্গিত দেয়। পশ্চিমবঙ্গ মানবাধিকার কমিশনের সদস্য ও অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মধুমতী মিত্র বলেন, ‘ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ১৪৩ ধারায় মানব পাচারের সংজ্ঞা অত্যন্ত বিস্তৃত — জোর করে শ্রম, যৌন শোষণ সবই এর অন্তর্ভুক্ত। এফআইআর দায়ের করার সময়ে ভিক্টিম–এর লিঙ্গ, অবস্থান, বাড়ির ঠিকানা উল্লেখ করা জরুরি। ভবিষ্যতে এই এফআইআর ডেটাও গুরুত্বপূর্ণ উৎস হতে পারে।’কলকাতা পুলিশের ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টের এসিপি তন্দ্রিমা গুপ্ত নিজের অভিজ্ঞতা থেকে জানান, গলদটা অন্যত্র। অনেক সময়েই পরিবার মনে করে শিশুশ্রম ভুল নয়, তাই অভিযোগই করে না। কড়া আইন ও সচেতনতা— দুটোই দরকার। সব দায় শুধু পুলিশ বা আদালতের উপর চাপানো যায় না।
শ্রম দপ্তরের বিশেষ সচিব শাওন সেন স্পষ্টই বলেন, ‘শিশুশ্রম ও পাচারের মধ্যে অনেক ক্ষেত্রেই ওভারল্যাপিং থাকে। ফলে ডেটা সংগ্রহ জটিল হয়ে পড়ে।’ তিনি জানান, ন্যাশনাল চাইল্ড লেবার প্রজেক্ট (এনসিএলপি) ২০২২–এ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিপুল তথ্য হারিয়ে গিয়েছে। এই সূত্রেই প্রতীচী ট্রাস্ট–এর প্রোগ্রাম ডিরেক্টর সাবির আহমেদের সংযোজন, ‘স্কুলের তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মুর্শিদাবাদ, দিনাজপুর, মালদার মতো জেলায় স্কুলছুট ছেলেদের সংখ্যা বাড়ছে। ব্লক স্তরের DISE ডেটা দিয়ে এই প্রবণতা ধরা সম্ভব।’ তিনি মনে করছেন, স্যাটেলাইট ইমেজিং ব্যবহার করেও শিশুশ্রম বা পাচারপ্রবণ জায়গা চিহ্নিত করা যেতে পারে। বড় ডেটাসেটকে সঠিকভাবে ব্যবহার করলে কার্যকর তথ্য পাওয়া সম্ভব।
ক্যালকাটা গার্লস’ কলেজের অর্থনীতি বিভাগের অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর ক্রান্তি দেওয়ান বলেন, ‘সরকারি নির্দেশ বা বাধ্যবাধকতা না থাকলে কোনও আধিকারিকই ঝুঁকি নিয়ে তথ্য শেয়ার করতে চান না। স্বচ্ছতা না বাড়ালে বাস্তব পরিবর্তন সম্ভব নয়।’ রাজ্যের জুডিশিয়াল সার্ভিস–এর প্রিন্সিপ্যাল সেক্রেটারি শুভ্রদীপ মিত্র মনে করছেন, ‘গ্রাম স্তর থেকেই কাজ শুরু করতে হবে। জেলা পর্যায়ে কেন্দ্রীয় কমিটি নিখোঁজদের খুঁজে বের করে কোথায় গ্যাপ সেটা বের করবে। অর্থাৎ কত কেস নথিভুক্ত হয়েছে ও কতগুলির ক্ষেত্রে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছে।’ এই নিয়ে বিশ্লেষণ এবং গবেষণা চালানো জরুরি বলে মনে করেন তিনি।
ভারতের আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি এবং বাস্তব ডেটার মধ্যে ফারাক নিয়েও আলোচনা হয়। কলকাতা সোসাইটি ফর প্রফেশনাল অ্যাকশন ইন ডেভেলপমেন্ট-এর সিনিয়র ম্যানেজার জয়ন্ত মুন্সি পরিংসখ্যান তুলে ধরে জানান, ভারত সরকার সাস্টেনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল ৮.৭ অনুযায়ী স্থির করেছিল, ২০২৫–এর মধ্যে জোর করে শ্রম, আধুনিক দাসত্ব ও মানব পাচার নির্মূল করা হবে। সেই মতো প্রায় ১ কোটি ৮৪ লক্ষ বন্ডেড লেবারের মুক্ত হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে কী হয়েছে তার কোনও নির্ভরযোগ্য ডেটা নেই!
২০১৮–এ রাজ্যে বন্ডেড লেবার–এর ইন্টিগ্রেটেড ডেটাবেস তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। শ্রম দপ্তরের নেতৃত্বে জেলা স্তরে নজরদারি কমিটি গঠন এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সঙ্গে সহযোগিতার পরিকল্পনাও ছিল।
তবে সেই উদ্যোগ এখনও পূর্ণাঙ্গ, রিয়েল-টাইম ডেটা ব্যবস্থায় পরিণত হয়নি — যা প্রতিরোধ, আইন প্রয়োগ বা পুনর্বাসনে কার্যকর ভূমিকা নিতে পারে। ফলে, দপ্তরগুলির মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি, নিখোঁজ ব্যক্তি ও পাচার সংক্রান্ত তথ্য একত্র করা, পঞ্চায়েত স্তরে ডেটা সংগ্রহ এবং পুরনো আইনি কাঠামো পুনর্বিবেচনার মতো একাধিক সুপারিশ উঠে আসে। এ ক্ষেত্রে তামিলনাড়ুর বন্ডেড লেবার ডেটাবেস এবং কেরালার মাইগ্রেশন সার্ভেকে সফল মডেল হিসেবে উল্লেখ করা হয়।