নয়াদিল্লি: যাবতীয় অনুরোধ–প্রতিবাদ–চিঠি–আইনি বক্তব্যকে উপেক্ষা করে সংসদের দুই কক্ষে আগেই পাশ হয়ে গিয়েছিল রূপান্তরকামী বিল। এ বার তাতে সই করে দিলেন রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু। ফলে ‘ওয়ার্ল্ড ট্রান্সজেন্ডার ডে’–র প্রাক্কালে তা দেশের আইনে পরিণত হলো।
ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তিদের স্বীকৃতি, অধিকার ও সুরক্ষার আইনি কাঠামোয় ব্যাপক পরিবর্তন আনা ট্রান্সজেন্ডার পার্সনস (প্রোটেকশন অফ রাইটস) সংশোধনী আইনে বলা হয়েছে, নতুন আইনে কে ‘ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তি’ হিসেবে গণ্য হবেন, তার সংজ্ঞা নতুন করে নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি জোরপূর্বক পরিচয় চাপিয়ে দেওয়া বা শারীরিক ক্ষতির মতো গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে শাস্তির বিধান আরও কঠোর করা হয়েছে। নতুন আইনটি নিয়ে বিরোধী দলগুলি এবং LGBTQIA+ মহলের একাংশ তীব্র সমালোচনা করেছে। তাঁদের অভিযোগ, সংসদে বিলটি পেশ করার আগে সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে কোনও রকম পরামর্শই করা হয়নি। রাজ্যসভায় বিলটি পাশ হওয়ার দিনই ন্যাশনাল কাউন্সিল অফ ট্রান্সজেন্ডার পার্সনস (NCTP)-এর দুই সদস্য, কল্কি সুব্রহ্মণ্যম ও ঋতুপর্ণা নেওগ, তাঁদের পদ থেকে ইস্তফা দেন। ট্রান্সজেন্ডার অধিকারের বিষয়টি খতিয়ে দেখতে সুপ্রিম কোর্ট গঠিত একটি কমিটিও কেন্দ্রীয় সরকারকে বিলটি প্রত্যাহারের আর্জি জানিয়েছিল। অবসরপ্রাপ্ত দিল্লি হাই কোর্টের বিচারপতি আশা মেননের নেতৃত্বাধীন ওই কমিটি সমাজকল্যাণ মন্ত্রককে চিঠি দিয়ে সংশোধনীর একাধিক ধারা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে এবং আইনটি পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানায়।
আইনটি নিয়ে মূল আপত্তি উঠেছে ‘স্ব-পরিচয়’-এর অধিকার তুলে দেওয়া এবং মেডিক্যাল সার্টিফিকেশন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব নিয়ে। সমালোচকদের মতে, এই দুই বিষয়ই ২০১৪ সালের ন্যাশনাল লিগ্যাল সার্ভিসেস অথরিটি (NALSA) মামলায় সুপ্রিম কোর্ট নির্ধারিত নীতির পরিপন্থী। এ দিকে, সোমবার রাজস্থান হাই কোর্টও উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছে, এই সংশোধনী ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তিদের পরিচয়ের মতো ‘অলঙ্ঘনীয় ব্যক্তিসত্তার অংশ’-কে রাষ্ট্রনির্ভর অধিকারে পরিণত করার ঝুঁকি তৈরি করছে।
এই আইনে বলা হয়েছে যে কোনও ব্যক্তি নিজেকে ট্রান্সজেন্ডার হিসেবে দাবি করতে পারবেন না৷ কর্তৃপক্ষের নির্দেশে গঠিত একটি মেডিক্যাল বোর্ড সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির শারীরিক পরীক্ষার পরে তাঁর লিঙ্গ নির্ধারণ সংক্রান্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে৷ এই আইনের মাধ্যমে ‘ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তি’র সংজ্ঞা সীমাবদ্ধ করা, লিঙ্গ পরিচয় স্বীকৃতির পদ্ধতি সংশোধন করা এবং অঙ্গহানি বা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে ব্যক্তিদের জোরপূর্বক ট্রান্সজেন্ডার পরিচয়ে রূপান্তরিত করার অপরাধের জন্য কঠোরতর দণ্ডবিধি প্রবর্তন করা হয়েছে। প্রতিবাদ সেখানেই। ‘নালসা’ রায়ে সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছিল, কেউ রূপান্তরকামী কি না তা তাঁর নিজের সিদ্ধান্তের উপরেই নির্ভর করবে। এবং বলা হয়েছিল যে এটি বাহ্যিক, বিশেষত চিকিৎসাগত প্রমাণের উপর নির্ভরশীল নয়। নতুন বিলে বাদ পড়েছে জেন্ডার ফ্লুইডিটি–ও। অর্থাৎ ‘স্ব-অনুভূত’ পরিচয়ধারীদের আইন থেকে বাদ দেওয়ার ফলে সমাজের একটি বৃহৎ অংশ উপেক্ষিত হচ্ছে, যাঁরা নির্দিষ্ট ভাবে কোনও বায়োলজিক্যাল ক্লাসে পড়েন না। সোশিওলজিস্টদের একাংশের মতে, সামাজিক-সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর বাইরে থাকা ব্যক্তিদের জন্য এটা ভীতিপ্রদ। তাঁদের যুক্তি, যদিও হিজড়া বা কিন্নরদের মতো গোষ্ঠীকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, তবুও যারা এই প্রথাগত গোষ্ঠীগুলির (যেমন গুরু-চেলা প্রথা) বাইরে থাকেন, তাঁদের আইনি স্বীকৃতি হারানোর আশঙ্কা রয়েছে। আবার এলজিবিটিকিউএপ্লাস আন্দোলনকারীরা মনে করছেন, এই ধারাগুলি ট্রান্স-নেতৃত্বাধীন সম্প্রদায় বা এমন পরিবারগুলির বিরুদ্ধে ব্যবহার হতে পারে, যারা সেল্ফ–ডিটারমিনেশনকে মেনে লিঙ্গ পরিবর্তনকে সমর্থন করে বা মেনে নেন।
যদিও বিল সংসদে পাশ করানোর সময়ে সরকার দাবি করেছিল, এর আগে অনেক সময়েই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বসবাসকারী রূপান্তরকামীরা সামাজিক বৈষম্য এবং বর্ণ বৈষম্যের শিকার হয়েছেন৷ এই আইনের মাধ্যমে সেই সব ঘটনা বন্ধ করা হবে এবং প্রত্যেককে সার্বিক নিরাপত্তা প্রদান করা হবে৷ ফলে শাস্তিমূলক বিধান যোগ করা হয়েছে৷ সামাজিক বৈষম্য রদ করার লক্ষ্যে রূপান্তরকামীদের যথাযথ আইনি সংজ্ঞা এবং সুরক্ষা দেওয়া প্রয়োজন৷
যদিও ট্রান্সজেন্ডারদের নিয়ে কাজ করা ও সমাজকর্মীদের বড় অংশই বলছেন, ২০১৪–এ সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায়ের প্রেক্ষিতে তৈরি ২০১৮–এ যে আইন আনা হয়েছিল, তা নিখুঁত না হলেও রূপান্তরকামীদের অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ও আত্মপরিচয়ে নির্ধারণে সাহায্য করেছিল। তাঁদের বক্তব্যের সারমর্ম, ‘আমাদের এত দিনের সব লড়াই এক ঝটকায় ব্যর্থ হয়ে গেল। যতটা এগনো গিয়েছিল তার থেকেও বহুগুণ পিছিয়ে দেওয়া হলো।’