অনির্বাণ ঘোষ
ফের পকেটে চাপ সাধারণ মানুষের। নতুন অর্থবর্ষ শুরু হওয়ার পরেই সাধারণ মানুষের উপর আরও এক দফা মূল্যবৃদ্ধির কোপ পড়তে চলেছে। এ বার বাড়তে চলেছে নিত্যপ্রয়োজনীয়, অত্যাবশ্যকীয়, জরুরি ও জীবনদায়ী ওষুধের দাম। কেন্দ্রীয় ওষুধ মূল্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা ন্যাশনাল ফার্মাসিউটিক্যাল প্রাইসিং অথরিটি (এনপিপিএ) ২০২৫-এর পাইকারি মূল্য সূচক বা হোলসেল প্রাইস ইনডেক্স (ডবলিউপিআই)-এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ওষুধের সর্বোচ্চ খুচরো মূল্য বা ম্যাক্সিমাম রিটেল প্রাইস (এমআরপি) ০.৬৫% পর্যন্ত বাড়ানোর অনুমতি দিয়েছে। ফলে আজ, বুধবার থেকে প্রায় ৯০০ ফরমুলেশনের ওষুধের এই দাম বৃদ্ধি হওয়া একপ্রকার অনিবার্য।
এনপিপিএ সূত্রের দাবি, ২০২৪-এর তুলনায় ২০২৫-এ গড় হিসেবে পাইকারি মূল্য সূচক যেহেতু ০.৬৪৯৫৬% বেড়েছে, তাই সর্বোচ্চ সেই হারে ন্যাশনাল লিস্ট অফ এসেনশিয়াল মেডিসিনস (এনএলইএম) তালিকার অন্তর্ভুক্ত প্রায় ৯০০ ধরনের ওষুধের দাম বাড়াতে পারবে উৎপাদক সংস্থাগুলি। এই মর্মে সোমবার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে এনপিপিএ। এর অর্থ, এই পরিমাণ মূল্যবৃদ্ধির জন্য ওষুধ উৎপাদক সংস্থাগুলিকে আলাদা করে সরকারের অনুমতি নিতে হবে না। ২০১৩-র ড্রাগ প্রাইস কন্ট্রোল অর্ডারে (ডিপিসিও) বলা হয়েছে, ডবলিউপিআই পরিমার্জন অনুযায়ী বার্ষিক এমআরপি সংশোধন স্বয়ংক্রিয় ভাবেই প্রযোজ্য হয়। ফলে, বাজারে ওষুধের দাম বৃদ্ধি এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, দাম বৃদ্ধির হার এ বছর তুলনামূলক ভাবে কম হলেও এর প্রভাব পড়বে বিরাট। কারণ এতে ব্যথানাশক, অ্যান্টিবায়োটিক, অ্যান্টাসিড, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবিটিস থেকে শুরু করে প্রায় সব ধরনের ওষুধই অন্তর্ভুক্ত। ফলে বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের চিকিৎসা খরচে এই বাড়তি চাপ আরও প্রকট হয়ে উঠবে, সন্দেহ নেই। তবে গত বছরের (১.৭৪%) তুলনায় এই মূল্যবৃদ্ধির হার অপেক্ষাকৃত কম। সাম্প্রতিক অতীতে এই মূল্যবৃদ্ধির বহর ২০২৩-এ (১২%) সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছিল। ২০২৪-এ আবার খাতায় কলমে ডবলিউপিআই বাড়লেও (০.০০৫%) মূল্যবৃদ্ধিতে তার কোনও প্রভাব পড়েনি।
এই ইঙ্গিতে অসন্তোষ দানা বাঁধছে। চিকিৎসক স্বপন জানা বলেন, 'অত্যাবশ্যকীয় ও জীবনদায়ী ওষুধে যে সব ছাড় থাকা উচিত, আমাদের দেশে সেগুলোও নেই। এর উপর আবার মূল্যবৃদ্ধিতে খোলা ছুট দিচ্ছে সরকার! এর অর্থ, কেন্দ্র রোগীদের চেয়ে ওষুধ উৎপাদক সংস্থার স্বার্থ নিয়ে বেশি ভাবিত।' একই সুর খুচরো ও পাইকারি ওষুধ বিক্রেতাদের সংগঠন বেঙ্গল কেমিস্টস অ্যান্ড ড্রাগিস্টস অ্যাসোসিয়েশন (বিসিডিএ)-এর মুখপাত্র শঙ্খ রায়চৌধুরীর গলায়। তাঁর কথায়, 'এই সরকারি সিদ্ধান্তে ক্ষতিগ্রস্ত হবে সাধারণ মানুষ। আমরা ওষুধে কর ছাড়ের পক্ষে বহু দিন ধরে সরব। কিন্তু সেই ছাড় তো কেন্দ্রীয় সরকার দেয় না। উপরন্তু দাম বৃদ্ধিতে সঙ্গত করে চলে!'
ওষুধ বিক্রেতাদের আর এক সংগঠন অল ইন্ডিয়া কেমিস্টস অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউটরস ফেডারেশন (এআইসিডিএফ)-এর সাধারণ সম্পাদক জয়দীপ সরকার মনে করেন, ওষুধের দামে এই সামান্য (১%-এর কম) বৃদ্ধিকে সরকার 'স্বাভাবিক' বললেও, তা রোগীদের উপর যে বাড়তি বোঝা চাপায়, তা নিয়ে কোনও সংশয় নেই। তিনি বলেন, 'বাস্তবে এনএলইএম তালিকাভুক্ত ওষুধে নির্মাতাদের গড় মুনাফা ৫০০-৬০০% বা তার কম নয়। দামে সরকারি ঊর্ধ্বসীমা বসানো থাকলেও তাতে উৎপাদকদের মুনাফা কমে না। বরং বঞ্চিত হয় পাইকারি ও খুচরো বিক্রেতারা, ভোগান্তি পোহাতে হয় রোগীদেরও। সরকার যে ভাবে এই মূল্যবৃদ্ধিকে স্বাভাবিক বলে প্রচার করে, তা শিল্প মহলের পক্ষেই সহায়ক।'