দিব্যেন্দু সরকার, আরামবাগ
মাঠে গাদার পর গাদা আলু ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে রয়েছে খড়চাপা দিয়ে। এখনও বিক্রি হয়নি বটে, তবে সে জন্য বিন্দুমাত্র চিন্তিত নন এলাকার আলুচাষিরা। এই ছবি পুরশুড়ার তোকিপুর, পশ্চিমপাড়া, কেশবপুর, জঙ্গলপাড়া, কেলেপাড়া, তালপুর-সহ আশপাশের কয়েকটি গ্রামের।
কিন্তু আলু মাঠেই পড়ে কেন? হিমঘরে রাখার জায়গা হয়নি, না কি অন্য কোনও কারণ? পুরশুড়া বালিমাটির জায়গা। এখানে প্রতি বছরই চাষিরা উৎকৃষ্ট মানের আলু চাষ করে থাকেন। আর সেই আলুও বিক্রি হয় যথাযথ সামেই। এ বারে এখনও পর্যন্ত সেই আলুর দাম নেই। জানা গিয়েছে, মঙ্গলবার পর্যন্ত শেষ দাম উঠেছে জ্যোতি ২০০ টাকা বস্তা ও চন্দ্রমুখী ৩০০ টাকা বস্তা। ক্রমশই এই দাম ঊর্ধ্বমুখী। এলাকার আলুচাষিদের বক্তব্য, এই এলাকার একটা ট্র্যাডিশন আছে। এখানকার চাষিরা হিমঘরে আলু রাখেন না। কারণ, হিমঘরে মজুত করতে বাড়তি অনেকটাই খরচ পড়ে যায়। তাই, সেই খরচ বাঁচাতে ও লাভের মুখ দেখতে এই এলাকার চাষিরা এই ভাবেই মাঠে খড় চাপা দিয়ে আলু রেখে দেন। আপাতত বৈশাখ মাসের প্রথম সপ্তাহ ও চৈত্র মাসের শেষ পর্যন্ত আলু পড়েই থাকে চাষিদের। তাঁদের যুক্তি, এই এলাকার আলু উৎকৃষ্ট মানের। তাই এখানকার আলুর স্থায়ীত্ব কিছুটা বেশি। সহজে খারাপ হয় না। বৈশাখ মাসে চাষিরা আলুর দাম পান জ্যোতি ৫০০ বা তার বেশি, আবার চন্দ্রমুখী ১০০ বা তারও বেশি। সেই আশায় চাষিরা আলু এই ভাবেই খড় দিয়ে রেখে দেন। অন্য কোনও কারণে নয়। বেশির ভাগ আলুই তাঁরা মাঠেই রেখে দেন এবং দামও পান। অন্যান্য বছরের অভিজ্ঞতা থেকে এটাই তাঁদের ধারণা। যদিও কয়েকদিন আগেও তারকেশ্বর থেকে চার দিনে ১ লক্ষ ৬৮ হাজার বস্তা আলু বাইরে গিয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীও মেদিনীপুরের চন্দ্রকোনায় বলেছেন যে, 'আলু তো ভিন রাজ্যে পাঠানো হচ্ছে। আবারও হবে।' রাজ্য সরকারের এই ইতিবাচক ভূমিকায় চাষিরা কিছুটা হলেও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন।
কিন্তু পুরশুড়ার এই সব এলাকার এটাই চরিত্র। তাঁরা মাঠেই নিশ্চিন্তে আলু ফেলে রাখেন। পুরশুড়ার তোকিপুরের আলুচাষি কৃষ্ণ সামন্ত এ বারে প্রায় ১ বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছেন। আবার কেশবপুরের তাপস সামন্ত চাষ করেছেন ৬ বিঘা। সবই চন্দ্রমুখী। কৃষ্ণ সামন্তের কথায়, 'আমরা অপেক্ষা করে থাকি। বৈশাখ পর্যন্ত মাঠে পড়ে থাকে আলু। পচে না। আমরা আলুর দাম পেয়ে যাই। এখন দাম অনেকটাই কম। আবার হিমঘরে রাখার খরচটাও পড়ে যায়। সেই জন্যই এখানে অনেক চাষিই এই ভাবে আলু খড়চাপা দিয়ে রেখে দেন। শুনেছি, ভিন রাজ্যে আলু যাচ্ছে। তা হলে বেশি দিন মাঠে আলু পড়ে থাকবে না। আমরা আগেই দাম পেয়ে যাব। তাপস সামন্ত বলেন, 'এখানকার মাটি অন্য রকম। বেলে মাটি। খড়চাপা দেওয়া থাকলে আলু নষ্ট হয় না। তাই ভালো দামের আশায় মাঠেই রেখে দেওয়া হয়।' এলাকার অন্য এক আলুচাষি তথা তৃণমূল নেতা গোপাল রায় বলেন, 'পুরশুড়ার এই তোকিপুর, কেশবপুর, তারকেশ্বরের তালপুর, নিমডিপ্তি-সহ এই সমস্ত এলাকার চরিত্রই এ রকম। মাঠেই আলু রেখে দেওয়া হয়। আর চৈত্রের শেষ বা বৈশাখের শুরুতে দাম উঠে যায়। তাতেই লাভের মুখ দেখেন আলুচাষিরা। কারণ, এই এলাকার আলু উৎকৃষ্ট মানের। তার উপরে আমাদের নেত্রী আলুর ছাড়পত্র তো দিয়েই দিয়েছেন। আলু যাচ্ছেও ভিন রাজ্যে। গত সপ্তাহেই চারটি রেকে লক্ষাধিক প্যাকেট আলু গিয়েছে। সুতরাং, ভয় পাওয়ার কিছু নেই। দেখুন না, আমাদের জনদরদি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় চাষিদের জন্য কী করেন। এর আগেও তো বহু বার মুখ্যমন্ত্রী একাধিক পদক্ষেপ করেছেন। এ বারেও করবেন।'
রাজ্য প্রগতিশীল আলু ব্যবসায়ী সমিতির সম্পাদক লালু মুখোপাধ্যায় বলেন, 'হিমঘরে আর বেশি জায়গা নেই। যা ঢোকার ঢুকে গিয়েছে। যখন খোলে, তখন মোটামুটি দাম হয়ে যায়। আর পুরশুড়ার ওই সব এলাকার আলুচাষিরা এই ভাবেই কিছু আলু খোলা মাঠে রেখে দেন। মহাজনদের বিক্রি করে দেন। দাম পেয়ে যান ওরা। এটা শুধু ওই এলাকাতেই হয় বলে জানি।'