• তিস্তা নদীর পাড়ে ‘পদ্মবন’ সাফ করতে বাঁশিতে সুর তুলছেন কৃষ্ণ
    বর্তমান | ০১ এপ্রিল ২০২৬
  • ব্রতীন দাস, জলপাইগুড়ি: শ্রীকৃষ্ণের বাঁশিতে রাধার মনে জেগেছিল গভীর প্রেম ও ব্যাকুলতা। জলপাইগুড়ির ভোট ময়দানে ‘বাঁশি’ হাতে ঘুরছেন আর এক কৃষ্ণ। ভোটারদের মন গলাতেই বাঁশিতে ‘সুর’ তুলছেন তিনি। পদ্মবন সাফ করে ঘাসের উপর জোড়াফুল ফোটাতে চক্কর কাটছেন এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। 

    শহর যার, তার হাতেই জয়ের চাবিকাঠি। এই মুহূর্তে এটাই জলপাইগুড়ি বিধানসভা আসনের ভোট-সমীকরণ। আর তাই শহরের ২৫টি ওয়ার্ড চষে ফেলতে মরিয়া যুযুধান সব পক্ষ। হাফ ডজন প্রার্থী থাকলেও মূল লড়াই তৃণমূল বনাম বিজেপির।

    একুশের নির্বাচনে ৯৪১ ভোটে এখানে জয়ী হন তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী ডাঃ প্রদীপকুমার বর্মা। সজ্জন মানুষ। কাজ করেছেন। ভোটের ময়দানে নিজে থেকেই সরে দাঁড়িয়েছেন এবার। তাঁর পরিবর্তে দলের এসসি,ওবিসি সেলের জেলা সভাপতি কৃষ্ণ দাসকে টিকিট দিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। রাজ্য সরকারের উন্নয়ন, দলীয় সংগঠন আর কৃষ্ণের বাঁশির জাদু-ত্রিমুখী ফলায় ভোটযুদ্ধে জলপাইগুড়িতে পদ্ম শিবিরকে ঘায়েল করতে চেষ্টার কসুর রাখছেন না তৃণমূল কর্মীরা। বিজেপির অবশ্য দাবি, শহরের আনাচে-কানাচে শুধুই পদ্ম। কৃষ্ণের বাঁশিতে জোড়াফুলের ভোটবাক্স ভরবে না।

    বরাবর ফরওয়ার্ড ব্লক প্রার্থী দিয়ে এলেও এবার এখানে থেমে গিয়েছে সিংহের গর্জন। ময়দানে ফ্রন্টের বড় শরিক। ৩৭ বছরের স্কুলশিক্ষক দেবরাজ বর্মনকে সামনে রেখে রামে যাওয়া ভোট এবার ফেরানোই মূল লক্ষ্য সিপিএমের। ঢাল-তলোয়ার না থাকলেও গুটিকয়েক দেওয়ালে আর কিছু ঝান্ডায় রয়েছে কংগ্রেসও। তবে তৃণমূলের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বিজেপির আর এক কাঁটা দলের বিক্ষুব্ধ একটি অংশ। সনাতন হিন্দু মঞ্চের ব্যানারে নির্দল প্রার্থীকে ভোট-বাজারে ঘোরাচ্ছে তারা। সবমিলিয়ে ভোট কাটাকুটির অংকটা বেশ কঠিন।

    জলপাইগুড়ি বিধানসভার অধীন পঞ্চায়েত এলাকায় তৃণমূল অনেকটাই ফুরফুরে। সেসব এলাকায় আবার প্রচার করতে গিয়ে বিজেপি প্রার্থী অনন্তদেব অধিকারীকে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে। সংখ্যালঘু অধ্যুষিত গড়ালবাড়ি পঞ্চায়েত এলাকায় গো-ব্যাক স্লোগানের পাশাপাশি বিক্ষোভের মুখে পড়ায় পদ্ম প্রার্থী ভালোমতোই বুঝতে পেরেছেন, গ্রামে তাঁর ‘বিপদ’ আছে। ফলে শহরেই পদ্মের চাষ বাড়াতে নজর দিয়েছেন তিনি। এক্ষেত্রে কিছুটা হলেও তাঁকে বাড়তি অক্সিজেন জোগাচ্ছে গত লোকসভা নির্বাচনের ফল।

    চব্বিশের ভোটে জলপাইগুড়ি পুর এলাকা থেকে ১৭ হাজারের কিছু ভোটে এগিয়ে ছিল বিজেপি। বিধানসভা আসন জিততে শহরে এগিয়ে থাকার এই ব্যবধানে ‘ভরসা’ রেখেই ‘হ্যাপি হরমোন’ ঝরাচ্ছে পদ্ম শিবির। তৃণমূল অবশ্য বলছে, ‘সে গুড়ে বালি’। খেলাটা মোটেই এত সহজ নয়। লোকসভা আর বিধানসভা ভোটের প্রেক্ষিত যে এক নয়, এটা ভুলে যাচ্ছে বিজেপি। জলপাইগুড়ি শহরে এবার জোড়া ফুলের বাগানে ঢেউ খেলবে।

    শহর থেকে বেশ কিছুটা দূরে বারোপেটিয়ার বাড়িতে নির্বাচনি ওয়ার রুম খুলেছেন তৃণমূল প্রার্থী কৃষ্ণ দাস। ভোট-যুদ্ধের কৌশল ঠিক হচ্ছে সেখানেই। কর্মীরা রোজ সকাল থেকে ভিড় জমাচ্ছেন প্রার্থীর বাড়িতে। বৈঠক শেষে খাওয়াদাওয়া করে ফিরতে কর্মীদের জন্য খোলা হয়েছে হেঁশেল। টিম নিয়ে শহর সামলাচ্ছেন জলপাইগুড়ি পুরসভার চেয়ারম্যান সৈকত চট্টোপাধ্যায়। অন্যদিকে, শহরের দিশারী মোড় এলাকায় বাড়ি বিজেপি প্রার্থীর। প্রাতঃভ্রমণ থেকে চায়ের ঠেক, মঠ-মন্দির, থলি হাতে বাজারে-প্রচারে কিছুই বাদ দিচ্ছেন না তিনি। প্রচারের ফাঁকে অনন্তদেব বলেন, কৃষ্ণর বাঁশিতে কারো মন গলবে না। জলপাইগুড়িতে এবার পদ্মফুল ফুটবে। প্রতিপক্ষের কথা শুনে অবশ্য মুচকি হাসছেন তৃণমূল প্রার্থী। তাঁর কথায়, সময় হলেই ‘খেলা’ দেখাবে কৃষ্ণ। সিপিএম প্রার্থী  দেবরাজের মন্তব্য, দুই ফুলকে উপড়ে ফেলতে আসরে আছি আমরা। ভোটবাক্সে উপস্থিতির প্রমাণ দেব।
  • Link to this news (বর্তমান)