• ভারতীয় পরিচয় অটুট রাখতে প্রশাসনের দোরে ঘুরছেন ক্যানসার আক্রান্ত রোগী
    বর্তমান | ০১ এপ্রিল ২০২৬
  • নিজস্ব প্রতিনিধি, আসানসোল: আসানসোল জেলাশাসক অফিসে মানসিকভাবে বিধ্বস্ত অবস্থায় ঘোরাঘুরি করছিলেন রূপনারায়ণপুরের অশোককুমার ঘোষ। কারো কাছে সদুত্তর না পেয়ে হাজির হন জেলাশাসকের সিএ সেকশনে। সেখান থেকে গেলেন জেলাশাসক অফিসের হেল্প ডেক্সে। চোখে মুখে আতঙ্কের  ছাপ। প্রশ্ন করতেই কেঁদে ফেললেন অশোকবাবু। তিনি বলেন, আমার নাম ভোটার তালিকা থেকে ডিলিট করা হয়েছে। জানি না আমার কী ভবিষ্যৎ।

    ধীরে ধীরে বললেন, নিজের জীবনের একের পর এক বিপর্যয়ের ঘটনা। ২০১৯ সালে ধরা পড়ে তাঁর মূত্রনালিতে চর্বি জমছে। পরে জানা যায়, কিডনি অকেজো হয়ে গিয়েছে। ২০২২ সালে ডানদিকে কিডনি অপারেশন করে বাদ দেওয়া হয়। তারপর তিনি জানতে পারেন তাঁর ক্যান্সার হয়েছে। এহেন মারণরোগে আক্রান্ত মানুষ প্রশাসনের দরজা দরজায় ঘুরছেন নিজের ভারতীয় পরিচয় অটুট রাখার জন্য। তাঁর সঙ্গে রয়েছে ১৯৭১ সালের ভোটার তালিকা। যেখানে তাঁর বাবা কালীপদ ঘোষের নাম রয়েছে। 

    কেন নাম বাদ গেল অশোকবাবুর? তিনি বলেন, ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় আমার নাম ছিল না। সেই সময়ে তিনি ভিনরাজ্যে কাজ করতেন। সেজন্য এখানে ভোটার কার্ড হয়নি। ২০০৭ সালে তিনি বাড়ি ফিরে আসেন। তারপর থেকে রূপনারায়ণপুরেই ভোট দিয়ে আসছেন। ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় নাম না থাকায় শুনানিতে ডাকা হয়েছিল। ভোটার তালিকায় বাবার নাম থাকার নথি জমা দেন। তারপরও তাঁর নাম বাদ দিয়েছে। তিনি বলেন, আমি মাধ্যমিক পাশ করিনি। কী করে মাধ্যমিকের অ্যাডমিট কার্ড দেখাব। একথা বলতে বলতে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন,  ক্যানসার আক্রান্ত রোগীকে হয়রানি করে ভোটে কার ভোটে লাভ হবে!

    নাম বাদ যাওয়া অশোকবাবুর মতো অনেকেই ট্রাইব্যুনালে আবেদন করতে প্রতিদিন জেলাশাসক অফিসে লম্বা লাইনে দাঁড়াচ্ছেন। সকলের অভিযোগ, যোগ্য ভোটার হয়েও নির্বাচন কমিশন তাঁদের নাম বাদ দিয়েছে। সবচেয়ে বেশি ভিড় দেখা যাচ্ছে সংখ্যালঘু মহিলাদের। 

    তৃণমূল কংগ্রেস নেতাদের অভিযোগ, যাদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে তাঁদের সিংহভাগই তৃণমূল কংগ্রেসের ভোটার। পরিকল্পনা করে তৃণমূলকে বিপাকে ফেলতেই নির্বাচন কমিশন তাঁদের নাম বাদ দিয়েছে। রানিগঞ্জের তৃণমূল কংগ্রেসের শহর সভাপতি জ্যোতি সিং বলেন, সংখ্যালঘু এলাকায় যোগ্য ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে। এদিনই বারাবনির বিধানসভার তৃণমূল প্রার্থী বিধান উপাধ্যায় রূপনারায়নপুরের সীমান্তপল্লিতে প্রচার করছিলেন। সেই সময় দুর্গা রায় নামে এক বৃদ্ধা তাঁর কাছে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন, তাঁর একমাত্র ছেলে মারা গিয়েছে। দু‌ই মেয়ের বিয়ে হয়ে গিয়েছে। তিনি একা থাকেন। তাঁর নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। প্রার্থী দলীয় কর্মীদের নির্দেশ দেন ওই বৃদ্ধার নাম তোলার ব্যবস্থা করতে। এবিষয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের জেলা কোষাধ্যক্ষ অধীর গুপ্ত বলেন, নির্বাচন কমিশনের হোয়াটস অ্যাপ গ্রুপে বারবার কত বিচারাধীনের নিষ্পত্তি হল। কাদের নাম বাদ পড়ল আর কাদের যুক্ত হল তার তালিকা দেওয়ার জন্য। কমিশন নিযুক্ত জেলা প্রশাসনের আধিকারিকরা কোনো তথ্যই দিচ্ছেন না। তাই আধিকারিকদের জানিয়েছি আমরা এবার আন্দোলনের রাস্তায় হাঁটব। তিনি বলেন, বহু যোগ্য ভোটারের নাম বাদ পড়েছে। বেশিরভাগ মানুষ জানেন না নাম বাদ পড়লে কোথায় আবেদন করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলিকে জানানো হচ্ছে না কাদের নাম বাদ গিয়েছে। যাতে আমরা তাঁদের নাম তোলার জন্য ট্রাইব্যুনালে আবেদনে সাহায্য করতে না পারি। বিজেপি জেলা সাধারণ সম্পাদক অপূর্ব হাজরা বলেন, রাজ্য সরকার কমিশনকে পর্যাপ্ত ডেটা এন্ট্রি আপরেটর দিচ্ছে না । পর্যাপ্ত নথি দিয়ে সাহায্য করছে না। তাই সমস্যা হচ্ছে।  আসানসোল জেলাশাসকের অফিসে ভোটার লিস্টে নাম তোলার জন্য দীর্ঘ লাইন।-নিজস্ব চিত্র
  • Link to this news (বর্তমান)