নিজস্ব প্রতিনিধি, বারাসত: দেগঙ্গায় ভোটের লড়াই এবার আর নিছক দল বনাম দলের লড়াইয়ে আটকে নেই! পুরোটাই কার্যত দুই বিবদমান প্রার্থীর ব্যক্তিগত লড়াই বা তাঁদের নিজস্ব ‘প্রেস্টিজ ফাইট’-এ পরিণত হয়েছে। কারণ, এই কেন্দ্রে শাসক দল তৃণমূলকে লড়তে হচ্ছে সদ্য দলত্যাগ করে আইএসএফে যোগ দেওয়া এক নেতার বিরুদ্ধে। এই কেন্দ্রে তৃণমূলের প্রার্থী হয়েছেন আনিসুর রহমান ওরফে বিদেশ। বামফ্রন্ট সমর্থিত আইএসএফ প্রার্থী হয়েছেন মফিদুল হক সাহাজি ওরফে মিন্টু। তৃণমূলের টিকিট না পেয়ে তিনি মাত্র কয়েকদিন আগে আইএসএফে যোগ দেন। তারপরই তাঁকে দেগঙ্গায় লড়ার জন্য মনোনীত করে নৌশাদ সিদ্দিকির দল। এই অবস্থায় প্রচারের ময়দানে দুই প্রার্থী একে অপরকে সরাসরি নাম ধরে আক্রমণ করছেন। আক্রমণের তীব্রতায় ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠছে বিধানসভা এলাকার রাজনৈতিক হাওয়া।
শুরুটা হয়েছিল স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রচার দিয়েই। কিন্তু দিন যত গড়িয়েছে, ততই চড়েছে সংঘাত। এখন পরিস্থিতি এমন যে, এক পক্ষ সভা ডাকলে অন্যপক্ষ প্রায় একই সময়ে বা পরের দিনই পালটা কর্মসূচি ঘোষণা করছে। নিছক প্রচার নয়, প্রকাশ্য শক্তি প্রদর্শনের প্রতিযোগিতা চলছে। কোথাও বিশাল মিছিল, কোথাও জনসভা, কোথাও আবার দোরে দোরে গিয়ে সমর্থনের হাল বোঝার চেষ্টা—সব ক্ষেত্রেই এই দুই প্রার্থীর সমানে সমানে টক্কর চলছে। কদম্বগাছি, কোটরা, দেগঙ্গা বাজার থেকে গ্রাম পঞ্চায়েতের বিভিন্ন গ্রামে পতাকা, ব্যানার আর মাইকের লড়াই।
দিনের শেষে হিসাব কষা হচ্ছে, কার সভায় বেশি জমায়েত হল। সভা থেকে দুই প্রার্থী কার্যত একে অপরের বিরুদ্ধে আগুন ছড়াচ্ছেন। মিন্টু বলছেন, ‘তৃণমূল প্রার্থী মানুষের থেকে বিচ্ছিন্ন, ক্ষমতার অপব্যবহারে দক্ষ।’ পালটা বিদেশ বলছেন, ‘রাজনৈতিক সুযোগসন্ধান, অস্থিরতা তৈরি ছাড়া মিণ্টু আর কিছু করেননি।’ নাম ধরে এই আক্রমণ এখন আর শুধু নেতাদের মঞ্চে সীমাবদ্ধ নেই। নেমে এসেছে কর্মী-সমর্থকের স্তরে। রাজনৈতিক মহলের মতে, এরকম ব্যক্তিকেন্দ্রিক লড়াই অনেক সময় দলীয় সমীকরণ ওলটপালট করে দিতে পারে।
তাঁদের যুক্তি, এখানে ভোট পড়ে শুধু প্রতীকে নয়, ব্যক্তির গ্রহণযোগ্যতায়। দেগঙ্গায় এখন সেটাই বড় ফ্যাক্টর। মিন্টু নিজের সাংগঠনিক ভিত্তি ও জনসংযোগ সামনে রেখে লড়াই চালাচ্ছেন। অন্যদিকে বিদেশ প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা ও দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক উপস্থিতির উপর নির্ভর করছেন। ভিড় হচ্ছে দু’জনের সভাতেই। এক পক্ষ অন্য পক্ষের ভিড়কে ‘ভাড়া করা’ বলে কটাক্ষ করছে।ভোটারদের মনেও এই লড়াইয়ের ছাপ পড়ছে। বেড়াচাঁপার প্রবীণ বাসিন্দা রমেন দাস, রিয়াজুল দফাদারের কথায়, ‘এবার এখানে দল নয়, লড়াইটা দুই মানুষে।’ মফিদুল হক সাহাজি ওরফে মিন্টু বলেন, ‘আমি দেগঙ্গাকে স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত করতে চাইছি। আসলে মানুষকে দীর্ঘদিন ধরে ভুল বোঝানো হচ্ছিল। আমি তৃণমূলে ছিলাম এটা ঠিক। তবে দল যাঁকে প্রার্থী করেছে, তাঁকে মানুষ ভোট দেবে না।’
পালটা আনিসুর রহমান ওরফে বিদেশের কথায়, ‘আসলে ওঁরা ক্ষমতা ভোগ করতে ভালোবাসেন। দলে থাকাকালীন কী করেছেন, তা সবার জানা। সরকার থেকে দলের নানা স্তরে একাধিক পদে রয়েছেন মিণ্টুর পরিবারের লোকজন। এখন নিজের দোষ ঢাকতে তৎপর হয়েছেন।’ সব মিলিয়ে দেগঙ্গায় এবার ভোটের হাওয়া ব্যক্তিগত সংঘাতের আঁচে আরও গরম এবার। মঞ্চের ভাষণ, রাস্তায় মিছিল, দেওয়ালে পোস্টার—সর্বত্র একটাই প্রশ্ন, মিন্টু না বিদেশ?