• দেওয়ালে বাড়ছে তুলির টান, স্লোগানের ভিড়ে হারাচ্ছে ছড়ার ঝাঁজ
    এই সময় | ০১ এপ্রিল ২০২৬
  • এই সময়, পুরুলিয়া ও কাটোয়া: ভোটের মরশুম এলেই একসময়ে গ্রাম-শহরের দেওয়াল জুড়ে ফুটে উঠত মজার ছড়া, তির্যক খোঁচা আর রাজনৈতিক ব্যঙ্গ। কিন্তু সময়ের স্রোতে সেই 'ভোটের ছড়া' এখন প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে। দেওয়াল লিখন এখনও রয়েছে, কিন্তু তার রস, তার সৃজনশীলতা যেন অনেকটাই ফিকে এমনই আক্ষেপ রাজনৈতিক মহলের একাংশের।

    ভোটের ঢাকে কাঠি পড়েছে। আগেই। প্রার্থী থেকে কর্মী-সমর্থক-সবাই ব্যস্ত প্রচারে। হাতে রংয়ের কৌটো, তুলিতে স্লোগান- এই ছবিই এখন ভরাচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়া। কোথাও প্রার্থী নিজেই নিজের নামে দেওয়ালে রং তুলছেন, আবার কোথাও কর্মী-সমর্থকদের ভিড়ে জমে উঠছে প্রচারের আবহ।

    কিন্তু সেই পুরোনো দিনের ছড়ার লড়াই? তা যেন আর চোখে পড়ে না। পুরুলিয়ার কাশীপুর মধুসুদন মহাবিদ্যালয়ের শিক্ষক দেবীলাল মাহাতো বলছেন, 'শুধু এ বারের ভোট নয়, গত কয়েক বছর ধরেই এই পরিবর্তন চোখে পড়ছে। আগে পঞ্চায়েত ভোট হোক বা বিধানসভা স্থানীয় ইস্যুকে কেন্দ্র। করে দেওয়ালে মজার ছড়ার লড়াই চলত। এখন সেই সংস্কৃতিটাই হারিয়ে যাচ্ছে।"

    বর্তমানে দেওয়াল লিখনে বেশি চোখে পড়ে চেনা স্লোগান- 'যতই করো হামলা, আবার জিতবে বাংলা' কিংবা 'পরিবর্তন দরকার, এ বার চাই বিজেপি সরকার।' রাজনৈতিক কর্মীদের কথায়, নেতাদের তরফে এর বাইরে নতুন কিন্তু খুব একটা পাওয়া যাচ্ছে না।

    তবে বাম শিবিরের দাবি, এখনও ছড়ার চর্চা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। সিপিএমের পুরুলিয়া জেলা কমিটির সদস্য সোমনাথ দূবে জানান, সমকালীন নানা বিষয় তাঁদের দেওয়াল লিখনে উঠে আসছে। রঘুনাথপুর মহকুমার বিভিন্ন এলাকায় এখনও দেখা মিলছে তির্যক ও ব্যঙ্গাত্মক ছড়ার, যেখানে ধর্ম থেকে কর্মসংস্থান সবই জায়গা পাচ্ছে ভোট-সংস্কৃতির এই বদল নিয়ে আক্ষেপ করছেন তৃণমূলের বর্ষীয়ান নেতা, ছয় ব্যারের বিধায়ক শান্তিরাম মাহাতো। তাঁর কথায়, 'সত্তরের দশক থেকে রাজনীতিতে আছি। তখন ভোটের সময়ে দেওয়াল জুড়ে থাকত মজার ছড়া। এখন আর সে সব তেমন দেখা যায় না। সচেতন রাজনৈতিক কর্মীর অভাবই এর প্রধান কারণ।'

    এই মতের সঙ্গে সহমত পোষণ করছেন বিজেপির রাজ্য নেতা বিদ্যাসাগর চক্রবর্তী। তাঁর মতে, 'এই ধরনের ছড়া লিখতে হলে রাজনৈতিক চর্চা, পড়াশোনা এবং সমকালীন বিষয় সম্পর্কে আন থাকা দরকার। সেই চর্চাতেই ভাটা পড়েছে।'

    একই সুর শোনা গেল ফরওয়ার্ড রকের নেতা অসীম সিংহর কথায়। তিনি বলেন, 'একসময়ে আমরাই দেওয়ালে ছড়া লিখে কংগ্রেসকে আক্রমণ করতাম। এখন সেই ছবি আর নেই।' শুধু ছড়া নয়, রাজনৈতিক কার্টুনও হারিয়ে যাচ্ছে বলে মনে করছেন সিপিএমের জেলা সম্পাদক প্রদীপ রায়। তাঁর কথায়, 'একটা কার্টুনেই সময়ের রাজনৈতিক ছবি ফুটে। উঠত। এখন সেই পরিবেশ নেই। কার্টুন আঁকলেই নানা ঝামেলার আশঙ্কা থাকে।'

    তরুণ প্রজন্মের একাংশ আবার মনে করছে, এই জায়গাটা দখল করে নিচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া বিভিন্ন এআই-নির্ভর ছবি এখন নতুন ট্রেন্ড। রামনবমী উপলক্ষে তৃণমূলের দুই নেতা সুজয় বন্দ্যোপাধ্যায় ও সৌমেন বেলঘরিয়ার 'রামভক্ত' রূপে ছবি তারই উদাহরণ।

    অন্য দিকে, পূর্ব বর্ধমানের কাটোয়া অঞ্চলে দেখা যাচ্ছে আর এক ভিন্ন চিত্র। গত কয়েক বছরে যেখানে ফ্রেন্স ও ব্যানারের আধিক্য ছিল, সেখানে এ বার যেন ফিরে আসছে দেওয়াল। লিখনের পুরোনো ধারা। শহর থেকে গ্রাম- সব জায়গাতেই জোরকদমে চলছে দেওয়াল লিখন। তৃণমূল ও সিপিএম ইতিমধ্যেই মাঠে নেমেছে। এমনকী বিজেপিও প্রার্থীর নাম ঘোষণার আগেই প্রতীক ও স্লোগান লিখতে শুরু করেছে।

    ফ্লেক্স ব্যবসায়ীদের কথায়, এ বার অভরি অনেকটাই কম। কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি ও আমদানি কমে যাওয়াও এর একটি কারণ। অন্য দিকে, রং ব্যবসায়ীদের দাবি দেওয়াল লিখনের জন্য রংয়ের চাহিদা বেড়েছে উল্লেখযোগ্য ভাবে। কাটোয়ার দেওয়াল লিখন শিল্পী গোপাল দত্ত বলছেন, 'দেওয়ালে ছড়া লিখে প্রচার অনেক বেশি আকর্ষণীয় করা যায়। ফ্লেক্সে সেই সুযোগ নেই। আবার কালবৈশাখীর সময়ে ফ্লেক্স সহজেই নষ্ট হয়ে যায়, কিন্তু দেওয়াল লিখন টিকে থাকে।

    সব মিলিয়ে, এক দিকে হারিয়ে যাওয়া ভোটের ছড়ার নস্টালজিয়া, অন্য দিকে দেওয়াল লিখনের নতুন করে ফিরে আসা এই দুইয়ের টানাপড়েনে বদলে যাচ্ছে বাংলার ভোট-সংস্কৃতির চেনা ছবি।

  • Link to this news (এই সময়)